Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

হালদায় ডিম ছাড়ছে মা মাছ

হালদা নদীতে ডিম সংগ্রহ করছেন জেলেরা

কাভার স্টোরি

নমুনা ডিমে শুরু, প্রত্যাশার ঢেউ

হালদায় ডিম ছাড়ছে মা মাছ

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

হালদায় ডিম ছাড়েছে মা মাছ

হালদা নদী—বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র—এ বছর প্রজনন মৌসুমের শুরুতেই দেখিয়েছে একসঙ্গে আশা, উৎকণ্ঠা ও বিস্ময়ের বিরল মিশেল। নমুনা ডিম ছাড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হলেও, একই দিনে পূর্ণমাত্রায় ডিম ছাড়ার ঘটনাও ঘটেছে—যা স্থানীয়দের ভাষায় প্রায় দুই দশক পর দেখা এক অসাধারণ দৃশ্য।


নমুনা ডিমে শুরু, প্রত্যাশার ঢেউ

এপ্রিলের শেষ দিকে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে—হাটহাজারীর গড়দোয়ারা ইউনিয়নের নয়াহাট, রাউজানের পশ্চিম গুজরার আজিমের ঘাট, নাপিতের ঘাটসহ কয়েকটি স্থানে কার্পজাতীয় মাছ—রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ নমুনা ডিম ছাড়তে শুরু করে।

সকাল থেকে জোয়ার-ভাটার সময়ভেদে ডিমের উপস্থিতি ধরা পড়ে। কেউ পেয়েছেন ১০০-২০০ গ্রাম, কেউ আবার কয়েক দফায় এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটি নৌকায় ২০০-৩০০ গ্রাম করে ডিম পাওয়া গেছে—যা প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে।

ডিম সংগ্রহকারী কামাল সওদাগর, মো. মুন্না ও রোশাঙ্গীর আলম জানান, কয়েকদিনের বজ্রসহ বৃষ্টি, দমকা হাওয়া এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষায়, “এই পরিবেশ থাকলে পূর্ণিমার জোতে পুরোদমে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা থাকে।”


গবেষকদের বিশ্লেষণ: ‘এটা আগাম সংকেত’

হালদা গবেষক ড. মনজুরুল কিবরিয়া ব্যা খ্যা করেন, পূর্ণমাত্রায় ডিম ছাড়ার আগে মা মাছ কিছু নমুনা ডিম ছেড়ে দেয়—যা মূলত পরিবেশগত চাপ বা বজ্রপাতের প্রভাবে ঘটে। এই নমুনা ডিমই ইঙ্গিত দেয়, বড় আকারে ডিম ছাড়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে গবেষক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পূর্ণিমার জো (২৯ এপ্রিল থেকে ৩ মে) চলাকালীন ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল নামায় ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। “রাতে বৃষ্টি হলে পুরোদমে ডিম ছাড়ার সম্ভাবনা বেশি,”—বলেন তিনি।


মৎস্য কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ

রাউজান উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম জানান, বৃষ্টি হওয়ায় নদীতে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “নমুনা ডিম পাওয়া গেছে, পরিবেশ ঠিক থাকলে পূর্ণিমার জোতে বড় আকারে ডিম ছাড়বে মা মাছ।”

অন্যদিকে উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ তফজ্জল হোসাইন বলেন, “আমরা মাঠে আছি, সংগ্রহকারীদের সহায়তা করছি। ডিম ছাড়ার বিষয়টি পুরোপুরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।”

প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদীতে টিম মোতায়েন, হ্যাচারি প্রস্তুত রাখা এবং সংগ্রহকারীদের সহায়তার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।


বিরল দৃশ্য: একই দিনে নমুনা ও পূর্ণ ডিম

এবারের মৌসুমে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—একই দিনে ভোরে নমুনা ডিম এবং পরে জোয়ারে পূর্ণমাত্রায় ডিম ছাড়ার ঘটনা।

৮০ বছর বয়সি অভিজ্ঞ সংগ্রাহক মো. আবদুল মান্নান বলেন, “২০ বছর আগে এমন দৃশ্য দেখেছিলাম। এবার আবার দেখলাম।”

স্থানীয়দের মুখে পুরোনো প্রবাদও ফিরে এসেছে—

“চৈত্রের আণ্ডা, বৈশাখের চা”—যা ইঙ্গিত করে প্রাকৃতিক ছন্দের ফিরে আসা।

এই বিরল ঘটনার ফলে নদীপাড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। তবে অনেক সংগ্রাহক প্রস্তুত না থাকায় সম্ভাব্য সব ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।


জেলেদের অভিজ্ঞতা: আনন্দ, হতাশা ও অপেক্ষা

ডিম সংগ্রহকারীরা বলছেন, হঠাৎ ডিম ছাড়ার কারণে অনেকেই প্রস্তুত ছিলেন না। তবুও কয়েক দফায় ডিম সংগ্রহ করতে পেরে তারা আনন্দিত।

রোশাঙ্গীর আলম জানান, “জোয়ারে এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত ডিম পেয়েছি। সামনে আরও পাওয়ার আশা আছে।”

প্রবীণ সংগ্রাহক কামাল উদ্দিন বলেন, “এখনো অল্প ডিম পাওয়া যাচ্ছে, আমরা অপেক্ষা করছি পূর্ণ ডিম ছাড়ার।”

হালদা নদীতে সাধারণত ৫০০ থেকে ৭০০ জন ডিম সংগ্রহকারী মৌসুমে সক্রিয় থাকেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিমের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে।


প্রস্তুতি: হ্যাচারি ও মাটির কুয়া

রাউজান ও হাটহাজারীতে চারটি সরকারি হ্যাচারি এবং শতাধিক মাটির কুয়া রেণু ফোটানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হ্যাচারিতে কয়েক ডজন বালতি ডিম সংগ্রহের খবর পাওয়া গেছে।


উৎপাদনের চিত্র ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—২০২০ সালে রেকর্ড ২৫ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল; সর্বশেষ বছরে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৪ হাজার কেজিতে। এই প্রেক্ষাপটে এবারের মৌসুমকে ঘিরে আশাবাদ ও সতর্কতা—দুটোই রয়েছে।

হালদা বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী দূষণমুক্ত রাখা গেলে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক থাকলে আবারও আগের মতো সমৃদ্ধ প্রজনন ফিরে আসতে পারে।


প্রত্যাশা পুরনের অপেক্ষা

হালদা নদীর বুকজুড়ে এখন প্রত্যাশা পূরনের অপেক্ষা। বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল আর পূর্ণিমার জো—এই তিনের মিলনেই নির্ধারিত হবে এ বছরের ভাগ্য। নমুনা ডিম ইতিমধ্যে সংকেত দিয়েছে—

প্রকৃতি দরজা খুলতে যাচ্ছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা— কখন পূর্ণ জীবন নিয়ে জেগে উঠবে হালদা।

মন্তব্য করুন

Logo