Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

রামিসাই যেন এই দেশের শেষ রামিসা হয়

কাভার স্টোরি

রামিসাই যেন এই দেশের শেষ রামিসা হয়

Icon

নিশাত সুলতানা

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম

মিরপুরের পল্লবীতে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর নারকীয় হত্যাকান্ডের শিকার হওয়া শিশু রামিসার বাবা একটি কথাই বলেছেন ‘ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোড়  ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।‘ শোকস্তব্ধ রামিসার বাবার  এই উক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে শিশু ধর্ষণ আর নির্যাতন বন্ধে পুরোপুরি ব্যর্থ একটি রাষ্ট্রের হেরে যাওয়ার বাস্তবতা। 

এদেশে একের পর এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তাদের হত্যা করা হয়, বিক্ষোভে উত্তাল হয় দেশ, নতুন হ্যাশট্যাগ আসে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাতা ছেয়ে যায় মাতমে।  এরপর ধীরে ধীরে সবাই সবকিছু ভুলে যায়। এরপর আরেকটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত  হয়। সরকার দায়সারা বিবৃতি দেয়।  বিবৃতির মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ তাদের কার্যক্রম। ভাগ্য প্রসন্ন হলে কখনো কখনো অপরাধী ধরাও পরে। এরপর দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, কখনো কখনো যুগের পর যুগ পেরিয়ে যায়। কিন্তু বিচার মিলে না। সব স্বপ্ন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া পরিবারগুলো তাদের সন্তানের হত্যাকারী কিংবা ধর্ষণকারীর সাজা দেখে যেতে পারে না। কে বলবে এইদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড? 

মনে পড়ে, মাগুরাতে আছিয়ার ধর্ষণের ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল দেশ। মাগুরায় ধর্ষণের শিকার হয়ে নিহত আট বছর বয়সী শিশু আছিয়ার দাফনে হেলিকপ্টারে করে নেতারা অংশ নিয়েছিল, বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ৯০ দিনের মধ্যে বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তৎকালীন আইন উপদেষ্টা।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো ভরে গিয়েছিল শোক, নিন্দা আর বিচারের দাবীতে। কিন্তু থেমে থাকেনি কিছুই। আছিয়ার ঘটনার কয়েকমাস পর কাটা গলা নিয়ে সাত বছরের ছোট্ট ইরা একাকী হাঁটছিল সীতাকুন্ডের জঙ্গলে। ধর্ষণ চেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরার গলায় ছুরি চালায় ঘাতক। সেই  ইরাকেও বাঁচানো যায়নি। মিরপুরের রামিসা নিজের বাসায় মায়ের খুব কাছে থাকার পরও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরপর তাকে হত্যা করা হয়েছে, তার ছোট্ট দেহটি খন্ড বিখন্ড করা হয়েছে।  কোথায় নিরাপদ আমাদের শিশুরা! 

মনে প্রশ্ন জাগে, ধর্ষণ কী সত্যিই প্রতিরোধযোগ্য নয় এই দেশে? যেন শিশু ধর্ষণের মহোৎসবে মেতেছে পুরো দেশ। কোনো সরকার, কোনো শক্তি কেউই যেন থামাতে পরছে না শিশু ধর্ষণের মতো জঘণ্য অপরাধগুলো। জাতীয় কন্যা শিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫০৮টি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮৫-এ।  ২০২৪ সালে ৩৩৭ টি এবং ২০২৫ সালে ৬২৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই অন্তত ৪৭৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ১৫৩ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। মনে রাখতে হবে এই সংখ্যাগুলো কেবল নিছক একেকটি সংখ্যা নয়। কারণ প্রতিটি সংখ্যার সঙ্গে মিশে আছে একেকটি পরিবারের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার গল্প।  

বাংলাদেশ শিশু অধিকার লঙ্ঘনের এক উর্বর ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। শিশুর বিশেষত কন্যাশিশুর জন্ম নেওয়াটাই যেন আজন্ম অপরাধ এখানে। শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সরকারকেই আপসহীন হতে দেখিনি। সরকার বদলায়, শাসনের ভাষা বদলায়, স্লোগান বদলায়; কিন্তু বদলায় না শিশুদের ভাগ্য। প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনার পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হয় সাময়িক, বিচ্ছিন্ন ও দায়সারা। ধর্ষণের মতো সহিংসতা বন্ধে এখনো কোনো সরকারের কঠোর অবস্থান আমরা দেখিনি, যা অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে ‘শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়।‘ তাই মনে প্রশ্ন জাগে ধর্ষকরা কী রাষ্ট্রের চেয়েও বেশী শক্তিশালী? 

আছিয়ার ধর্ষণকারীর মৃত্যুদন্ডের রায় গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছে। সেই রায়ের বাস্তবায়ন আজও হয়নি। অথচ তৎকালীন আইন উপদেষ্টা বলেছিলেন ৯০ দিনের মধ্যে সাজা কার্যকর করা হবে। তনু থেকে নুসরাত, পূজা থেকে আছিয়া,  ইরা থেকে রামিসা একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটতেই থাকে। কিন্তু বিচার মেলে না। সাজার অপেক্ষায় যুগের পর যুগ কাটিয়ে দেয়া পরিবারগুলো একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, সাক্ষী হারিয়ে যায়। ২০২০ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ১১ বছরে মাত্র পাঁচজন ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।  

আরেকটি ভয়ংকর প্রবণতার কথা না বললেই নয় সেটি হলো ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের সংবাদকে ঘিরে কিছু গণমাধ্যমের নির্মম বাণিজ্য। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো রক্ত হিম করা ঘটনাও আজ অনেকের কাছে মানবিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং ‘কনটেন্ট’। মৃত শিশুর আর্তনাদ, মায়ের কান্না, একটি পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন এসবকেও ভিউ, রিচ আর ট্রাফিক বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। প্রতিবাদের ভাষার আড়ালে অনেক সময় এমন চটকদার ও উত্তেজক শিরোনাম তৈরি করা হয়, যা মানুষকে সচেতন করার চেয়ে বরং বীভৎসতার প্রতি কৌতূহলী করে তোলে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা নিজেরাও অজান্তে সেই নিষ্ঠুরতার অংশ হয়ে উঠছি। অবিবেচকের মতো সেইসব ভিডিও, ছবি, রক্তাক্ত বর্ণনা আর বিকৃত কনটেন্ট শেয়ার করছি একের পর এক। যেন একটি শিশুর মৃত্যুও এখন ডিজিটাল বিনোদনের উপাদান। অথচ প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি অসংবেদনশীল মন্তব্য, প্রতিটি উত্তেজক শিরোনাম শিশুটির মর্যাদাকে বার বার আঘাত  করে।

সে সমাজে অপরাধের সাজা হয় না, সেই সমাজে সহিংসতা ও অপরাধই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এদেশে আইন আছে, কিন্তু বিচার নেই। নীতি আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই। শোক আছে, কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই। খুব জানতে ইচ্ছে করে, আর কত শিশুর লাশ হলে ঘুম ভাঙবে এই রাষ্ট্রের ? আর কত রামিসা, আছিয়া, ইরা হারিয়ে গেলে এই রাষ্ট্র বুঝবে যে শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি নেই, কোনো উন্নয়ন নেই, কোনো ক্ষমতা নেই। পরিশেষে বলতে চাই, ‘ আমরা আর কোনো রামিসার মতো সম্ভাবনাকে অকালে হারিয়ে ফেলতে চাই না। রামিসাই যেন এই দেশের শেষ রামিসা হয়।‘ 

নিশাত সুলতানা: লেখক ও উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন

Logo