স্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছে শ্রমিক, কৃষক, পথচারীরা। গত তিন দিনে শুধুমাত্র দুই রাজ্যেই প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ২২৩ জন, ছবি: ইন্ডিয়া টুডে
এল নিনোর প্রভাবে বাড়ছে তাপপ্রবাহ, ঝুঁকিতে বাংলাদেশও
সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১২:২০ এএম
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার হাসপাতালগুলোতে এখন একের পর এক মানুষ ভর্তি হচ্ছে সানস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে। রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছে শ্রমিক, কৃষক, পথচারীরা। গত তিন দিনে শুধুমাত্র দুই রাজ্যেই প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ২২৩ জন। তাপমাত্রা পৌঁছে গেছে প্রায় ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে। ওড়িশা, পাঞ্জাব, হরিয়ানাতেও একই পরিস্থিতি। কোথাও শত শত বাদুড় গাছ থেকে পড়ে মারা যাচ্ছে, কোথাও অতিরিক্ত গরমে গবাদি পশু টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন খামারিরা। বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ট্রান্সফরমারের গায়ে পানি ঢেলে ঠান্ডা রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে।
স্থানীয় প্রশাসন মানুষকে দিনের বেলায় ঘর থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। খোলা হয়েছে অস্থায়ী হিট শেল্টার। হাসপাতালগুলোতে বাড়ানো হয়েছে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। এখন প্রশ্ন হলো— এ কি কেবল যেকোনো গরম মৌসুমের প্রভাব, নাকি পৃথিবী আরও বড় কোনো জলবায়ু সংকটের দিকে এগোচ্ছে?
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহকে শুধু স্থানীয় আবহাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে, ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এমন এক পরিবর্তন যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে। সমুদ্রের নিচে এগিয়ে চলেছে প্রায় ৯ হাজার মাইল দীর্ঘ অস্বাভাবিক উষ্ণ পানির বিশাল স্রোত— যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন “কেলভিন ওয়েভ”। এই স্রোত ঘিরেই আবার সামনে এসেছে “সুপার এল নিনো”-র আশঙ্কা।
মার্কিন আবহাওয়া সংস্থা NOAA-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে সমুদ্রের নিচের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের কাছে সংখ্যাটি খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু আবহাওয়াবিদদের কাছে এটি একটি অস্বাভাবিক এবং বিপজ্জনক সংকেত। কারণ সমুদ্রের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও বদলে দিতে পারে বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বর্ষা, ঝড়, খরা এবং তাপপ্রবাহের ধরন।
“এল নিনো” নামটি এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। কিন্তু এর প্রকৃত প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা এখনও অনেকের অজানা। সাধারণ সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে— অর্থাৎ এশিয়ার কাছাকাছি এলাকায়— গরম পানি জমা থাকে এবং পূর্বাংশ তুলনামূলক ঠান্ডা থাকে। এই ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে বায়ুপ্রবাহ ও মৌসুমি বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দ। কিন্তু কোনো কোনো বছরে সেই ভারসাম্য ভেঙে যায়। উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে সরে গিয়ে সমুদ্রের বিশাল অঞ্চলকে অস্বাভাবিক গরম করে তোলে। তখনই তৈরি হয় এল নিনো পরিস্থিতি।
এর প্রভাব শুধু সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে ভূ-ভাগেও। ভারতীয় উপমহাদেশে বৃষ্টি-বাদলে প্রভাব ফেলতে পারে, আফ্রিকায় দেখা দিতে পারে দীর্ঘ খরা, অস্ট্রেলিয়ায় দাবানল বাড়তে পারে, আবার দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে হতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা। খাদ্য উৎপাদন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতিও এর প্রভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারে বিশ্ব।
১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোকে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয় হিসেবে ধরা হয়। সে সময় বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, পেরুতে বন্যা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করে ছিল। পৃথিবীর বহু অঞ্চল হয়ে পড়েছিল বিপর্যস্ত। অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই এল নিনোর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল।
সেই সময়ের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের অস্বস্তিকর মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ব্রিটিশ আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম স্কেইফসহ অনেক গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৬ সালের শেষ দিকে যদি শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়, তাহলে ২০২৭ সাল হতে পারে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলোর একটি। পৃথিবী এখন এমনিতেই আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবাশ্মজালানীর ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ ভয়াবহভাবে বাড়িয়েছে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
এই শঙ্কা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অন্যদিকে নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার মতো দুর্যোগের চাপ একসঙ্গে বহন করতে হচ্ছে আমাদের। তার ওপর যদি এল নিনোর প্রভাবে বর্ষাকাল স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। আমন ধান, পাট, সবজি, ভুট্টা— অনেক ফসলের উৎপাদন নির্ভর করে সময়মতো বৃষ্টি হওয়ার ওপর। কিন্তু শক্তিশালী এল নিনোর বছরে দেখা যায়, কখনো দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হয় না, আবার কখনো স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়। এতে কৃষি পরিকল্পনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা যেতে পারে। প্রথমত, তাপপ্রবাহ আরও দীর্ঘ ও তীব্র হতে পারে। রাজশাহী, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, পাবনা, দিনাজপুর এবং ঢাকা অঞ্চলে তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক উচ্চতায় থাকতে পারে। শহরাঞ্চলে কংক্রিটের কারণে “হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট” তৈরি হয়ে গরম আরও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশেও বাড়ছে তাপমাত্রা, প্রচণ্ড তাপে খেটে খাওয়া মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে, ছবি: সংগৃহীতদ্বিতীয়ত, পানিসংকট বাড়তে পারে। উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক আগেই নিচে নেমে গেছে। বৃষ্টি কম হলে সেচের জন্য আরও বেশি পানি তুলতে হবে। এতে পানির স্তর যেমন আরও নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি কৃষি ব্যয়ও বাড়বে। ছোট কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহভাবে বাড়তে পারে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। টিনের ছাউনি ঘরে বসবাসকারী মানুষের জন্য গরম পৌঁছতে পারে অসহনীয় পর্যায়ে।
চতুর্থত, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। তীব্র গরমে ফ্যান, এসি ও পানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। ফলে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো ঘটনাও বাড়বে; যার প্রভাব গিয়ে পড়বে শিল্প উৎপাদনে।
তবে বিজ্ঞানীরা শুধু খরার আশঙ্কাই দেখছেন না। তারা বলছেন, ভবিষ্যতের এল নিনো আরও নানা রকম অনিয়মিত আচরণ করতে পারে। অর্থাৎ কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও আকস্মিক অতিবৃষ্টি— একই মৌসুমে দুই বিপরীত চিত্র দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে, একদিকে উত্তরাঞ্চলে খরা, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপপ্রবাহ এখন ধীরে ধীরে “নীরব ঘাতক”-এ পরিণত হচ্ছে। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান ধ্বংস না হলেও, দীর্ঘস্থায়ী গরম মানুষের শরীর, অর্থনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। কর্মঘণ্টা কমে যায়, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, দরিদ্র মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই এর কিছুটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে দেশে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব বেড়েছে। হাসপাতালগুলোতে বেড়েছে গরমজনিত রোগীর সংখ্যা। প্রবীণ কৃষক তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানাচ্ছেন, ঋতুচক্র আর আগের মতো নেই। কখন বৃষ্টি হবে, কখন খরা পড়বে— তা অনুমান করা তার পক্ষে দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
সুপার এল নিনোর প্রভাব অবশ্যই আমাদের জন্য শঙ্কার। এর জন্য প্রয়োজন আগাম আবহাওয়া পূর্বাভাস, পানি সংরক্ষণ, খরা সহনশীল ফসল, নগর এলাকায় সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর কর্মসূচি নেওয়া। তাহলে হয়তো ক্ষতি খানিকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় আমরা বিশ্বেজুড়ে একটি প্রশংসিত মডেল তৈরি করেছি, তেমনি তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু অভিযোজনেও এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
চলমান তাপপ্রবাহকে আর শুধুমাত্র ঋতুর বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি, কৃষি ও মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া এক বৈশ্বিক সংকট। আর সেই কারণেই প্রশান্ত মহাসাগরের হাজার মাইল দূরের উষ্ণ পানির স্রোত এখন বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক কিংবা শহুরে মানুষ— সবার ভবিষ্যতের জন্য গভীর ভাবনার কারণ হয়ে উঠছে।
মন্তব্য করুন

