বনচণ্ডাল বা বনচাড়াল বা Telegraph plant
শব্দে নড়ে ওঠা এক বিস্ময়কর গাছ বনচণ্ডাল
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম
প্রকৃতির সৃষ্টিতে এমন কিছু প্রজাতি আছে, যাদের আচরণে অবাক হতে হয়। তেমনই এক রহস্যময় উদ্ভিদ হলো বনচণ্ডাল বা বনচাড়াল (ইংরেজি: Telegraph plant)। বৈজ্ঞানিক নাম Codariocalyx motorius বা Desmodium gyrans। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মানো এই গাছকে ঘিরে বিজ্ঞান ও লোকবিশ্বাস—দুটিই বিস্ময়ে ভরা।
বনচণ্ডালের যে বৈশিষ্ট্যর জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হলো এর পাতার নড়াচড়া। আশ্চর্যের বিষয়, সামান্য শব্দ বা তুড়ির প্রতিক্রিয়াতেও এর পাতা দুলে ওঠে। এই কারণে স্থানীয়ভাবে একে তুড়ি চণ্ডাল বা তুরুক চণ্ডাল নামেও ডাকা হয়। ভোরের নরম আলোয়, সূর্য প্রখর হওয়ার আগেই এই নড়াচড়া সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। তবে তীব্র রোদে এর এই গতিশীলতা অনেকটাই কমে আসে।
গাছের তো কান নেই—তবুও কি সে শব্দ শোনে? বিজ্ঞান বলছে, এটি সরাসরি শব্দ শোনা নয়, বরং উদ্ভিদের ভেতরের এক ধরনের স্পর্শ ও কম্পন-সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া। এই ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যই বনচণ্ডালকে গবেষকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এই গাছ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। তিনি বনচণ্ডালের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে উদ্ভিদের স্পন্দন ও প্রতিক্রিয়া বিষয়ে যুগান্তকারী ব্যাখ্যা দেন। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ বনচণ্ডালের মৃত্যু-তে তিনি উদ্ভিদের স্পন্দনশীলতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন।
জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর গবেষণায় দেখান—বনচণ্ডালের পাতার নড়াচড়া কোনো অতিপ্রাকৃত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভেতরের শক্তির সঞ্চয় ও নির্গমনের ফল। তিনি লেখেন, উদ্ভিদ বাহ্যিক শক্তি (আলো, তাপ, আঘাত) সঞ্চয় করে রাখে এবং নির্দিষ্ট পর্যায়ে সেই শক্তি বহির্মুখী প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রকাশ পায়। তাপমাত্রা, রাসায়নিক পদার্থ এমনকি শীতলতা বা উষ্ণতার পরিবর্তনেও এই স্পন্দন কমে বা থেমে যেতে পারে।
উদ্ভিদ গবেষণার ইতিহাসে আরেক দিকপাল বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন তাঁর The Power of Movement in Plants গ্রন্থে বনচণ্ডালের নড়াচড়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি উদ্ভিদের এই চলনকে জীববিজ্ঞানের বিবর্তনীয় আচরণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
বনচণ্ডালের জন্মভূমি বিস্তৃত—বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, চীন, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা অঞ্চল। ফলে এটি আমাদের অঞ্চলের একটি স্বদেশী উদ্ভিদ হিসেবেই বিবেচিত। বাংলাদেশের বনে-বাদারে এই গাছ এক সময় হর-হামেশা পাওয়া গেলেও বর্তমানে বনচন্ডল বা বনচাড়াল গাছ বিলুপ্ত প্রায়।
এই প্রজাতিরও রয়েছে নানা রূপভেদ—রাহু চণ্ডাল, গুরু চণ্ডাল, তুরুক চণ্ডাল, রক্ত চণ্ডাল, উলট চণ্ডাল, ব্রহ্ম চণ্ডাল ইত্যাদি। এসব প্রজাতির অনেকগুলোরই রয়েছে ঔষধি গুণ। লোকজ চিকিৎসায় এর পাতা চর্মরোগ, পাইলস ও নারীদের কিছু শারীরিক সমস্যায় ব্যবহার করা হয় বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞান ও লোকবিশ্বাসের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে বনচণ্ডাল আজও এক রহস্যময় উদ্ভিদ। একদিকে গবেষণাগারের কঠিন ব্যাখ্যা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বিস্ময়—এই দুইয়ের মাঝখানে গাছটি যেন প্রকৃতির নীরব ভাষায় কথা বলে চলেছে।
মন্তব্য করুন

