এসআর কেমিক্যালস কারখানা মাটির নিচ দিয়ে সুরঙ্গ করে পাইপলাইন বসিয়ে করতোয়া নদীতে বর্জ্য ফেলছে। ছবি: সংগৃহীত
সানজিদা খান রিপা
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬, ০৯:২৬ এএম
“নদীতে নামলেই হাঁস মইরা যায়, মাছ মইরা ভাইসা উঠে, নদীর পানি খাইয়া গরুও মইরা গেছে। আমরা গরিব মানুষ, এই হাঁস-মাছেই আমগো সংসার চলে। এখন খুব দুশ্চিন্তায় আছি ।” -সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের শিমলা মধ্যপাড়া গ্রামের এক নারী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে এভাবেই তাঁর দুঃখ প্রকাশ করলেন।
২২ এপ্রিল ফুলজোড় নদীর তীরে গিয়ে আমরা দেখেছি, নারী, পুরুষ, এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও চর্মরোগে আক্রান্ত। স্থানীয়রা জানালেন, চাপকল থেকে বেশিরভাগ সময়ই পানি ওঠে না। মাঝে মাঝে পানি পাওয়া গেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে গোসল ও দৈনন্দিন কাজে তারা বাধ্য হয়ে নদীর পানি ব্যবহার করেন।
এক নারী তাঁর কোলের শিশুকে আমাদের সামনে এনে দেখালেন- বাচ্চাটির দুই হাত, পা ও পেটে কালো কালো গোটা গোটা দাগ। তিনি বললেন, নদী থেকে বালতিতে পানি এনে শিশুকে গোসল করানোর পর থেকেই শরীরে এই চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়ানোর পর কিছুটা কমেছে, কিন্তু নদীতে নামলেই আবার বেড়ে যায়।
আমরা কয়েকটি এনজিওর প্রতিনিধি মিলে সরেজমিনে ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর দূষণ পরিস্থিতি দেখতে গিয়েছিলাম। চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখেছি এবং নদী তীরবর্তী এলাকার অর্ধশতাধিক মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। তাদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ আর কষ্টের গল্পগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেছে নদী দূষণের ভয়াবহ বাস্তবতা।
এস আর কেমিক্যালস-এর বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে
বগুরার শেরপুরে মির্জাপুর ইউনিয়নের কুনিঘাট এলাকায় গিয়ে আমরা দেখতে পাই, এসআর কেমিক্যালস কারখানা মাটির নিচ দিয়ে সুরঙ্গ করে পাইপলাইন বসিয়ে করতোয়া নদীতে বর্জ্য ফেলছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সেই পাইপলাইন দিয়ে যখন তরল কেমিক্যাল ছাড়া হয়, তখন নদীর পানি কালো হয়ে যায়, পাশের মাটির রংও বদলে যায়, ফেনা ওঠে এবং তীব্র গন্ধ ছড়ায়। আমরা কুনিঘাট এলাকায় করতোয়া নদীর সেই পয়েন্টে গিয়ে ক্লোরিনের মতো গন্ধ পেয়েছি। তখন আমাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ বোধ করেছে। স্থানীয়দের ভাষায় “আফা, এই ময়লা পানি ছাড়লে আমরা দৌড়াইয়া পালাইতে থাকি। কেমিক্যালের গন্ধে শ্বাসকষ্ট হয়, কাশি শুরু হয়। আগে কখনও হাপাঁনি ছিলো না, পাইপ বসানোর পর থেকে এমুন হইতাছে।”
একইভাবে, শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের জোড়গাছা সেতু এলাকা থেকেও মাঝে মাঝে রাসায়নিক বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ট্রাকে করে এসব বর্জ্য আনা হয় এবং সেতুর ওপর থেকে সরাসরি নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। ফলে নদীর পানি মুহূর্তেই কালো হয়ে যায়, তীব্র গন্ধ ছড়ায় এবং আশপাশের মানুষের শ্বাসকষ্ট হয়। আর চোমরপাথালিয়া এলাকায় মজুমদার প্রডাক্টস লিমিটেড ফুলজোড় নদীতে দিনরাত বিষাক্ত পানি ছাড়ছে- আমরা সেই পাইপলাইন সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি।
শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগে ভুগছে মানুষ, মারা যাচ্ছে পশুপাখি, গাছপালা
এসআর কেমিক্যালস কারখানার ঠিক পাশেই রাজাপুর গ্রাম। এই গ্রামে কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসে মানুষ প্রতিনিয়ত শ্বাসকষ্ট ও চর্মরোগে ভুগছে। আমরা সেখানে গিয়ে দেখেছি, প্রতিটি বাড়ির টিনের চাল ও জানালা কেমন ক্ষয়ে যাচ্ছে, ধাতব অংশগুলোতে মরিচা ধরেছে, পাতলা হয়ে গেছে। স্থানীয়রা বললেন, এই গ্যাসের প্রভাবে তাদের ঘরের টিন কয়েক বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, পুরো গ্রামে বড় কোনো গাছ চোখে পড়েনি। বাসিন্দারা জানালেন, কারখানার গ্যাসে গাছপালা মরে যায়। গাছের অভাব শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনযাত্রাকেও বিপন্ন করছে। ছায়াহীন গ্রামে গরমে হাঁসফাঁস করতে হয়, আর বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে হয়।
আমরা ওই গ্রাম পরিদর্শনকালে কারখানা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেছি। সেই সময় ব্লিচিং পাউডারের মতো তীব্র গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমাদের অনেকেই অসুস্থ বোধ করেছি, মাথা ঘুরছিল, চোখে জ্বালা করছিল। স্থানীয়রা বললেন “এই গন্ধে আমরা প্রতিদিন বাঁচি, শরীর নষ্ট হয়, ঘর নষ্ট হয়, গাছ নেই, বাতাস নেই।”
এই দৃশ্য আমাদের সামনে স্পষ্ট করেছে, শিল্পকারখানার দূষণ শুধু নদী নয়, আশপাশের গ্রাম ও মানুষের জীবনকেও ধ্বংস করছে। রাজাপুরের মানুষরা যেন প্রতিদিন বিষের মধ্যে বাস করছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
এই দূষণ শুধু নদীর প্রাণহানি ঘটাচ্ছে না, বরং মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে আঘাত করছে। হাঁস-মুরগি, মাছ, গরু-ছাগল মারা যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। যারা মাছ ধরে সংসার চালাতেন, তারা এখন নদীতে মাছ পান না। কৃষি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে, ফলে ধান ও শাকসবজির ফলন কমে যাচ্ছে। সার্বিক এই পরিস্থিতি অত্র অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
আমাদের সরেজমিন পরিদর্শনে স্পষ্ট হয়েছে- ফুলজোড় ও করতোয়া নদীর দূষণ জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নারীরা ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, জেলেরা জীবিকা হারাচ্ছেন, কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
স্থানীয় লোকজন এই দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে এর আর কেমিক্যালস মিথ্যা চাঁদা বাজির মামলা দিয়েছে। তাদের মামলায় ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তৌহিদুর রহমান ও আলি রেজা বিশ্বাসকে পুলিশ আটক করে। পরে তারা জামিনে মুক্ত হন। কিন্ত মামলা চলমান রয়েছে। গ্রামবাসী ঢাকায় এসে এই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সমাবেশ করেছে। কিন্তু মামলা প্রত্যাহার হয়নি।
আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, এস আর কেমিক্যালস পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করছে এবং যথাযথ ছাড়পত্র ও নবায়ন প্রক্রিয়া মানছে না। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করতে হবে। কারখানাগুলোর বর্জ্য নিঃসরণ বন্ধে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, বিকল্প পানির উৎস ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে নারীরা ও শিশুরা নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে পারেন। উল্লেখ্য যে এস আর কেমিক্যালস এর মালিকানা বগুড়া-৫ এর বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ-এর পরিবারের।
কর্তৃপক্ষ এই দূষণ রোধ ব্যবস্থা কেন গ্রহন করেনি তা জানতে চেয়ে ইতিমধ্যেই হাইকর্টের একটি বেঞ্চ রুল জারি করেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) -এর দায়ের করা এক রিটের প্রেক্ষিতে বিচারপতি বাসুদের চক্রবর্তী এবং বিচারপতি আব্দুর রহমানের একটি দ্বৈত বেঞ্চ গত ৩ মে ২০২৬ এই রুল জারি করে।
ফুলজোড় বা করতোয়া নদী শুধু একটি জলধারা নয়, এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকার অংশ। নদী বাঁচানো মানে মানুষের অস্তিত্বকে বাঁচানো। আর নদী মরলে শুধু মানুষ নয় পুরো প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রকৃতির এই ভারসাম্য ভেঙে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা ও পরিবেশ সবকিছুই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
সানজিদা খান রিপা, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, এএলআরডি।
মন্তব্য করুন

