Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

একরৈখিক শক্তির চোখ রাঙানি

দশদিগন্ত

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য ঘোষণা

একরৈখিক শক্তির চোখ রাঙানি

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ১১:১৪ এএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে এমন এক ঘোষণা দিয়েছেন যাকে কেউ কেউ ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলার চেষ্টা করছেন— যা মধ্যপ্রাচ্যের পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসই বদলে দিতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্পকে যারা জানেন বা মার্কিন নীতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন, তাদের কাছে এটি তার ধারাবাহিক দমন নীতির প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এই ঘোষণায় কূটনৈতিক উদ্যোগের চেয়ে বরং এক ধরনের প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শন, ভয় প্রদানের কৌশল এবং বৈশ্বিক আধিপত্যের নতুন ভাষাই প্রতিভাত হয়েছে। তার বক্তব্যের শব্দচয়ন, উপস্থাপনা এবং হুমকির ধরন এমন ছিল যেন এটি কোনো শান্তি সম্মেলনের আহ্বান নয়, বরং যুদ্ধ ও সমঝোতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে দেওয়া একটি আল্টিমেটাম। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন— মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যোগ দিতেই হবে, অন্যথায় অঞ্চলটিকে আরও ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ফিরে যেতে হবে। ‘হয় চুক্তি কর, নয় বড় যুদ্ধ’— ট্রাম্পের এই ভাষা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং সেটি এমন এক কৌশল যার মাধ্যমে তিনি পুরো অঞ্চলকে ভয় ও চাপের রাজনীতির ভেতরে নিয়ে যেতে চাইছেন।
 
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ২০২০ সালে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করে একাধিক কূটনৈতিক চুক্তি সম্পন্ন করে। এটাকেই বল হয়ে থাকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ড’। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরে মরক্কো ও সুদানও এতে যুক্ত হয়। চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল— মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানো। ট্রাম্প বা যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শান্তি উদ্যোগ’ হিসেবে তুলে ধরে থাকে।
 
বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্পের পরিচয় বরাবরই এমন এক নেতার, যিনি প্রচলিত কূটনৈতিক শিষ্টাচার বা সংযমের ধার ধারেন না। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রায়ই ব্যবসায়িক দরকষাকষির মতো করে দেখেন। তার কাছে সম্পর্ক মানে চাপ সৃষ্টি, ভয় দেখানো, অর্থনৈতিক প্রলোভন দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত নিজের শর্তে সমঝোতায় পৌঁছানো। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তার সাম্প্রতিক ঘোষণাতেও সেই একই মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট। তিনি এমন একটি বার্তা দিয়েছেন, যেখানে কূটনীতির চেয়ে যুদ্ধের সম্ভাবনাকেই বেশি জোরালোভাবে সামনে আনা হয়েছে।
এই ঘোষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ট্রাম্প মূলত একটি অতি জটিল এবং বিস্ফোরণপ্রবণ অঞ্চলকে ‘হয় আমাদের সঙ্গে থাকো, নয়তো ধ্বংসের জন্য প্রস্তুত হও’ ধরনের মানসিকতায় পরিচালনা করতে চাইছেন। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা কোনো করপোরেট বোর্ডরুমের হিসাব নয়। এখানে ধর্মীয় বিভাজন আছে, শত বছরের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আছে, সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ আছে, প্রক্সি সংঘাত আছে, দখলদারিত্বের ইতিহাস আছে, আর আছে কোটি কোটি মানুষের বঞ্চনা ও ক্ষোভ। সেই বাস্তবতায় ট্রাম্পের ঘোষণাকে অনেকেই শান্তির প্রস্তাব নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে তিনি যখন বলেন ‘ডিল না হলে যুদ্ধ আরও বড় হবে’, তখন সেটি আর কূটনীতির ভাষা থাকে না, বরং হয়ে ওঠে সামরিক চাপ প্রয়োগের প্রকাশ্য ইঙ্গিত। এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এটাই বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নতুন বলয়ের বাইরে থাকা মানেই সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকা। অর্থাৎ শান্তি নয়, বরং ভয়কেই তিনি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
 
বাস্তবে আব্রাহাম অ্যাকর্ড শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল। কারণ এই প্রোটোকলের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় সংকট ফিলিস্তিন প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সেটিকে বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা তখনই বলেছিলেন, এটি আসলে অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে কৌশলগত স্বার্থের জোট তৈরি করার প্রচেষ্টা।
এখন ট্রাম্প যখন সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান এমনকি ইরানকে একই কাঠামোয় আনার কথা বলছেন, তখন সেটি বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পরিকল্পনার চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে এক ধরনের ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির নাটকীয় প্রচারণা। কারণ এই দেশগুলোর পারস্পরিক অবস্থানই একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সৌদি আরব এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে প্রকাশ্য অবস্থান ধরে রেখেছে। কাতার হামাস ইস্যুতে পশ্চিমা অবস্থানের বাইরে গিয়ে আলাদা ভূমিকা নিয়ে থাকে। তুরস্ক নিজেকে মুসলিম বিশ্বের স্বাধীন শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। পাকিস্তানের জন্য ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্পর্শকাতর বিস্ফোরকে খোঁচা দেওয়ার মতো ঘটনা। আর ইরান তো বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি।
 
এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের বক্তব্য অনেকটা এমন যে, তিনি পুরো অঞ্চলকে একরকম জোর করেই নতুন কৌশলগত বলয়ের মধ্যে ঠেলে দিতে চাইছেন। এতে বোঝা যায়, তার লক্ষ্য শুধু কূটনৈতিক সমঝোতা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত হয়ে উঠবে।
এই ঘোষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামরিক ইঙ্গিত। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সময় ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। এমনকি ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। ফলে তার বর্তমান ঘোষণার মধ্যেও নতুন করে সামরিক চাপ ও সম্ভাব্য সংঘাতের পূর্বাভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ধরন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আড়ালে তিনি মূলত এক ধরনের আধিপত্যবাদী বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছেন। বাণিজ্য যুদ্ধ, শুল্ক আরোপ, অর্থনৈতিক চাপ, সামরিক হুমকি—সবকিছু মিলিয়ে তার কৌশল যেন একটাই: যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নাও, নয়তো কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হও।
চীন, কানাডা, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে তার বাণিজ্যনীতি ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানিও চাপের মুখে পড়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যেও একই ধরনের চাপের রাজনীতি চালু হলে তার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক থাকবে না; বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
 
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ট্রাম্পের ভাষা। তার ভাষা প্রায়ই যুদ্ধকে কূটনীতির বিকল্প নয়, বরং কূটনীতির অংশ হিসেবেই উপস্থাপন করে। তার বক্তব্যে এমন ধারণা স্পষ্ট যে, যুদ্ধের ভয় দেখিয়েই তিনি সমঝোতা আদায় করবেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনাও বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা, ইয়েমেন সংকট, সিরিয়া যুদ্ধ, গাজা পরিস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে অঞ্চলটি এমনিতেই বিস্ফোরণপ্রবণ অবস্থায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘বড় চুক্তি না হলে বড় যুদ্ধ’ ধরনের বক্তব্য অঞ্চলটিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এমন ভাষা কখনো কূটনৈতিক আস্থা তৈরি করে না; বরং সন্দেহ, আতঙ্ক এবং প্রতিরোধের মনোভাব বাড়ায়। ট্রাম্প মূলত ভয়কে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি জানেন, সংঘাতের আশঙ্কা যত বাড়বে, ততই তিনি নিজেকে ‘একমাত্র শক্তিশালী সমাধানদাতা’ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
 
এখানে আরেকটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের এই ঘোষণার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের বাস্তব সংকট প্রায় অনুপস্থিত। গাজায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রহীনতা, দখলদারিত্ব, শরণার্থী সংকট—এসব প্রশ্নের কোনো সুস্পষ্ট সমাধান তার বক্তব্যে নেই। বরং মনে হয় পুরো অঞ্চলকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জোটের মাধ্যমে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে চাওয়া হচ্ছে, যেখানে মানবিক ও রাজনৈতিক অধিকারের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থই প্রধান হয়ে উঠবে।
ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে এমন এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছেন যেখানে ভয়, সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক চাপ হবে প্রধান নিয়ন্ত্রক উপাদান। অর্থাৎ শান্তি নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত স্থিতিশীলতা; সমতা নয়, ক্ষমতার ভারসাম্যহীন আধিপত্য। আলোচনার পরিবেশ তৈরির চেয়ে প্রতিপক্ষকে স্থায়ী চাপের মধ্যে রাখাই যেন তার কৌশলের মূল ভিত্তি।
এই কারণেই তার ঘোষণাকে অনেকেই ‘কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত আতঙ্কের রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প এমন এক বিশ্বব্যবস্থার বার্তা দিচ্ছেন, যেখানে বড় শক্তিগুলো সিদ্ধান্ত নেবে কোন দেশ কোন বলয়ে থাকবে, কে মিত্র হবে, কে শত্রু হবে এবং কে যুদ্ধের ঝুঁকিতে থাকবে।
 
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ থেকে শুরু করে মার্কিন সামরিক অভিযান পর্যন্ত বহুবার অঞ্চলটি বৈশ্বিক শক্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণা সেই পুরোনো রাজনীতিকে আরও নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে শান্তির ভাষার আড়ালে যুদ্ধের ছায়া স্পষ্ট, কূটনীতির টেবিলের নিচে দৃশ্যমান সামরিক চাপ, আর প্রতিটি সমঝোতার ভেতর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার নির্মম অঙ্ক।
ফলে ট্রাম্পের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য সত্যিকার শান্তির বার্তা হয়ে উঠবে, নাকি আরও বড় অস্থিরতার সূচনা করবে—সেটি এখন সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট: এই ঘোষণায় আশা বা আস্থার চেয়ে ভয়, চাপ, শক্তি প্রদর্শন এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের অশনি সংকেতই বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে।

মন্তব্য করুন

Logo