Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

চুয়াডাঙ্গার ঘটনা ও সমাজের নির্মম মুখ

মত-দ্বিমত

মৃত্যুর পরও নারীর বিচার

চুয়াডাঙ্গার ঘটনা ও সমাজের নির্মম মুখ

Icon

শাকিলা জেরিন

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

যে সমাজ একদিন গঠিত হয়েছিল মানুষের নিরাপত্তা, সহমর্মিতা আর যৌথ কল্যাণের তাগিদে, আজ সেই সমাজই হয়ে উঠেছে এক নির্মম বিচারক, যা মৃত্যুর ওপারেও একজন মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়।
সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গার শহরতলির দৌলতদিয়াড় এলাকায় ঘটেছে এমন এক ঘটনা, যা মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গায় ৩৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ এলাকার কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি স্থানীয় কিছু বাসিন্দার বাধার মুখে। দাফন করতে না দেওয়ার কারণ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে টিকটকে ভিডিও বানানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচ-গানে অংশগ্রহণ করা এবং তথাকথিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গ। সংবাদমাধ্যমের সূত্রে যে দৃশ্য সবাই দেখেছে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। এলাকার কিছু মানুষ কোনো রকম সংকোচ বা দ্বিধা ছাড়াই অত্যন্ত বুক ফুলিয়ে টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে একজন মৃত নারীর চারিত্রিক ব্যবচ্ছেদ করছে। তাদের চোখে-মুখে কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই কোনো শোকের ছায়া, নেই মানবিকতা ও সহমর্মিতা। বরং এক ধরনের পাশবিক আত্মতৃপ্তি নিয়ে তারা খতিয়ান তুলে ধরছে সেই নারী কীভাবে চলতেন, কী পোশাক পরতেন, কেমন টিকটক করতেন।
ঘটনাটি কেবল একটি আঞ্চলিক সংবাদ নয়; বরং এটি আমাদের সমসাময়িক সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক চরম অবক্ষয় এবং গভীর অন্ধকারের দলিল। টিকটক ভিডিও বানানোর ‘অপরাধে’ একজন মৃত মানুষের শেষ বিদায়ের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই উন্মাদনা প্রমাণ করে, আমরা এক ভয়াবহ ‘মানবিকতার বিপর্যয়’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
একজন মানুষ বেঁচে থাকতে সমাজ তাকে নানাভাবে কোণঠাসা করতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পর যখন তাঁর নিথর দেহটি ফিরে আসে, তখন সমস্ত পার্থিব হিসাব-নিকাশ চুকে যাওয়ার কথা। অথচ আমাদের বর্তমান সমাজ এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে যে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জনসমক্ষে একজন নারীর চরিত্রহনন করাকে তারা তাদের তথাকথিত নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করছে। এই নির্ভীক বর্বরতা এবং সম্মিলিত মব-সাইকোলজি আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক বিপজ্জনক বাঁককে নির্দেশ করে।
 
অশ্লীলতা ও শ্লীলতার মাপকাঠি নির্ধারণ করবে কে?
স্থানীয় বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল, ওই নারী নাচ-গান করতেন এবং টিকটক ভিডিও বানাতেন, যা তাদের ভাষায় ‘অশ্লীল’। প্রশ্ন হলো, এই সমাজে শ্লীল আর অশ্লীলতার চূড়ান্ত মাপকাঠি নির্ধারণ করার আইনি বা নৈতিক অধিকার কাকে দেওয়া হয়েছে? কিছু মানুষের ব্যক্তিগত রুচি বা নৈতিকতাবোধ কি কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করার হাতিয়ার হতে পারে?
টিকটক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করা বর্তমান বিশ্বে একটি অত্যন্ত সাধারণ বিষয়। সেখানে কোনো অপরাধমূলক কিছু ঘটলে তা দেখার জন্য দেশের প্রচলিত আইন ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সমাজ যখন নিজেই পুলিশ, নিজেই বিচারক এবং নিজেই জল্লাদের ভূমিকা পালন করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে আইনের শাসনের চেয়ে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ হিংস্রতা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আজ যিনি টিকটক করছেন, তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না; কাল হয়তো যিনি গান শোনেন বা সিনেমা দেখেন, তাকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই নৈতিক খবরদারির শেষ কোথায়?
 
কবরস্থানের মালিকানার নিয়ম ও আইনি বাস্তবতা
এই ঘটনায় আরও একটি অদ্ভুত অজুহাত দাঁড় করানো হয়েছে—কবরস্থানের মালিকানা। বলা হয়েছে, ‘এটি আমাদের নিজস্ব কবরস্থান, তারা এই কবরস্থানের সদস্য নয়।’ বাংলাদেশের ভূমি আইন এবং ধর্মীয় বিধানের আলোকে কবরস্থানের মালিকানার নিয়মগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি নিয়ে সামাজিকভাবে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পত্তি বা কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের অন্তর্ভুক্ত কবরস্থান সাধারণত একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হলেও, তা কোনোভাবেই নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত জায়গির নয়। জনকল্যাণ এবং ধর্মীয় আচার পালনের উদ্দেশ্যে যে ভূমি উৎসর্গ করা হয়, সেখানে একজন মুসলিম নাগরিকের দাফনের অধিকার আইনত ও নীতিগতভাবে স্বীকৃত। তাছাড়া, ওই পরিবারের দাবি অনুযায়ী এর আগে তাদের অন্য এক সদস্যকে একই কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। হঠাৎ করে এই ‘সদস্যপদ’-এর দোহাই দেওয়া আসলে মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করার একটি ঢাল মাত্র। মূলত নৈতিক বিদ্বেষকে বৈধতা দিতেই কবরস্থানের মালিকানাকে সামনে আনা হয়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার আওতাধীন সরকারি কবরস্থান রয়েছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কবরস্থানের অগ্রিম কবর সংরক্ষণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও স্থানপ্রাপ্যতা সাপেক্ষে বিভিন্ন মেয়াদে কবর সংরক্ষণের সীমিত ব্যবস্থা রয়েছে। নির্ধারিত ফি পরিশোধপূর্বক ১৫ বা ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দাফনের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তালিকায় নাম থাকা এবং যথাযথ মুক্তিযোদ্ধা সনদ দাখিল সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে ১০ বছর বিনা মূল্যে কবর সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়া হয়।
তাছাড়া কবরে সমাহিতকরণের জন্য বাঁশ ও চাটাইয়ের মূল্য নির্ধারিত রয়েছে এবং দাফন ফি বাবদ নির্ধারিত অর্থ নেওয়া হয়ে থাকে। এই নীতিমালার বাইরে সরকারি বা ওয়াকফ সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত কবরস্থান কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনো মৃত ব্যক্তির দাফনে আইনত বাধা দিতে পারে না।
 
রাষ্ট্রের দায় ও নাগরিকের জন্য সরকারি ব্যবস্থা
এই পুরো ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং দায়বদ্ধতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ সম্মানজনকভাবে সমাহিত বা সৎকার করার অধিকারও সংবিধানস্বীকৃত। রাষ্ট্রের দায় কেবল অপরাধ দমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষা করাও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ।
এই ঘটনায় পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং হয়তো শেষ পর্যন্ত সরকারি হস্তক্ষেপে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ পেল কেন? নাগরিকের জন্য কেন সুরক্ষিত ও সার্বজনীন সরকারি ব্যবস্থার অভাব থাকবে?
স্থানীয় এক নারীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, সেই এলাকায় সরকারি কোনো কবরস্থান নেই। প্রতিটি পৌরসভা বা স্থানীয় সরকার কাঠামোর অধীনে এমন সরকারি সাধারণ কবরস্থান থাকা প্রয়োজন, যেখানে কোনো কমিটির অনুমোদন বা সামাজিক ছাড়পত্রের প্রয়োজন হবে না। একজন মানুষ শুধু নাগরিক পরিচয়েই সেখানে সমাহিত হতে পারবেন। রাষ্ট্র যদি এই ন্যূনতম নিরাপত্তা ও অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকের অসহায়ত্ব ঘোচানোর কোনো পথ থাকে না।
 
নারী-পুরুষের চিরন্তন বৈষম্য ও লিঙ্গভিত্তিক মনস্তত্ত্ব
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা এবং মৃতের পরিবারের বক্তব্যে জানা যায়, এর আগে একটি ছেলেও মারা গেছে এবং তাঁর দাফন নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি। এখানেই লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আমাদের সমাজের গভীর পুরুষতান্ত্রিক ভণ্ডামি এবং নারী-পুরুষের তীব্র বৈষম্য এখানে নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সমাজ নামের এই বিচারালয়টি নারীর বেলায় যতটা কঠোর, পুরুষের বেলায় ঠিক ততটাই অন্ধ এবং ক্ষমাশীল। আমাদের সমাজে কত পুরুষ মাদক ব্যবসা, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি বা অর্থ পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তাদের মৃত্যুর পর কি কখনো কোনো সমাজকে এভাবে দলবদ্ধ হয়ে দাফনে বাধা দিতে দেখা গেছে? কোনো দুর্নীতিবাজ বা অপরাধী পুরুষের মরদেহ দাফনের সময় কি সমাজ এভাবে নীতিবাগীশ হয়ে ওঠে?
কিন্তু একজন নারী যখনই প্রচলিত সামাজিক ছকের বাইরে গিয়ে নিজের মতো বাঁচতে চান, নিজের ইচ্ছায় নাচ, গান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হন, তখনই পুরো সমাজ তাঁর ‘চরিত্র’ রক্ষার নামে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে যায়। এটি নারীর প্রতি সামাজিক মনস্তত্ত্বের এক চরম নিয়ন্ত্রণমূলক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ রূপ।
 
সমাজ আসলে কী? কেন সৃষ্টি হয়েছিল এবং আজ তার ভূমিকা কী?
মানবসভ্যতার ইতিহাসে ‘সমাজ’ নামক ধারণার উৎপত্তি হয়েছিল মূলত মানুষের আদিম একাকীত্ব দূর করতে এবং একে অপরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদে। ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ জ্যাঁক রুশোরর সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ নিজের কিছু অধিকার ত্যাগ করে একটি সামষ্টিক সমাজ গঠন করেছিল, যাতে বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে এবং মৃত্যুতে কেউ একা না হয়ে পড়ে। সমাজের মূল ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মানবিকতা।
কিন্তু আজ চুয়াডাঙ্গার ঘটনা আমাদের দেখাচ্ছে, সমাজ তার মূল লক্ষ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে একটি নেতিবাচক, দমনমূলক এবং হিংস্র কাঠামোয় পরিণত হয়েছে। আজকের সমাজ মানুষকে নিরাপত্তা দেয় না, বরং মানুষের ব্যক্তিজীবনের ওপর নজরদারি করে। আজকের সমাজ বিপদে পাশে দাঁড়ায় না; বরং মানুষের সামান্যতম বিচ্যুতি বা দুর্বলতা পেলেই তাকে কোণঠাসা করে ফেলে।
যে সমাজ একজন মৃত মানুষের দাফনে বাধা দেয়, যে সমাজ একটি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে আরও বেশি আতঙ্কিত করে তোলে, সেই সমাজ আসলে এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি ছাড়া আর কিছুই নয়।
চুয়াডাঙ্গার এই ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা। আজ যদি আমরা এই ‘মব কালচার’ এবং নৈতিক খবরদারির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী দিনে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পূর্ণভাবে কট্টরপন্থী এবং উগ্র মনস্তত্ত্বের দখলে চলে যাবে। মানবিকতার এই চরম বিপর্যয় থেকে বাঁচতে হলে কিছু বিষয়ে দ্রুত কাজ করতে হবে।
প্রথমত, আইনের কঠোর প্রয়োগ। যারা দাফনে বাধা দিয়েছে বা জনসমক্ষে ক্যামেরার সামনে এসে মৃত ব্যক্তির চরিত্রহনন করেছে, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে কেউ ভবিষ্যতে ‘মব জাস্টিস’-এর সাহস না পায়।
দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্থানীয় সরকারের অধীনে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সার্বজনীন সরকারি কবরস্থান বা দাফনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সামাজিক মোড়ল বা কোনো কমিটির অনুমোদন কিংবা হস্তক্ষেপ থাকবে না।
তৃতীয়ত, মূল্যবোধের সংস্কার। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও গণমাধ্যমে সহনশীলতা, মানবিকতা এবং লিঙ্গসমতার সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন।
সমাজকে মানুষের কল্যাণে গড়তে হলে আমাদের ভেতরের এই ‘বিচারক’ হওয়ার হিংস্র মানসিকতা বর্জন করতে হবে। মৃতদেহ কোনো রাজনীতি বা নৈতিকতার যুদ্ধক্ষেত্র নয়; মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষের প্রাপ্য—একটু মাটি এবং শান্তিতে শেষ বিদায়।

মন্তব্য করুন

Logo