ব্রাত্য রাইসু ও জাহিদ হোসেন
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬, ০৭:০৪ এএম
সম্প্রতি কবি, ভাবুক ও সম্পাদক ব্রাত্য রাইসু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে একজন পুরুষের কণ্ঠে নারীর যৌনাঙ্গ নিয়ে ব্যবহৃত সহিংস ও অবমাননাকর ভাষাকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ এবং ‘সাম্যের ভাষা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় লেখক ও গবেষক জাহিদ হোসেন নিজের ফেসবুক পোস্টে ব্রাত্য রাইসুর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে ভাষা, পুরুষতন্ত্র, রুচি ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে বিশদ মত প্রকাশ করেন।
‘দ্যা কাভার স্টোরি’-এর পাঠকদের জন্য ব্রাত্য রাইসুর মত এবং জাহিদ হোসেনের দ্বিমত হুবহু তুলে ধরা হলো।
ব্রাত্য রাইসু
শরীফ ওসমান বিন হাদি নারী বিরোধী কিছু করেন নাই। তিনি "শা-উয়া" নামক নারীর গোপন অঙ্গকে নরমালাইজ কইরা নারী অধিকারকে সামনে আনছেন।
শা-উয়া আছে তো নারীর, যেমন সো-না আছে পুরুষের।
কেবলই পুরুষদের গোপন অঙ্গ তথা "সো-না"কে যে আপনি অবলীলায় উচ্চারণ করেন, শা-উয়া বলতে গিয়া কেন আপনার তাইলে দ্বিধা হয়?
খুলনায় দেখবেন অবলীলায় মানুষ শাউও বলতেছে, তাতে সে অঞ্চলের মানুষ খারাপ হইয়া যায় নাই, বরং নারীকে ছাড় না দেওয়ার মাধ্যমে একটা সাম্য ভিত্তিক সমাজের দিকে তারা যাত্রা করছেন।
সেইটা সকলেই জানেন যে কেবল গালাগালির সাম্য আসল সাম্য দেয় না। কিন্তু শুরু বা আরম্ভের গুরুত্ব আছে। হাদি তা করছেন।
বরং নারীর প্রতি আলাদা শ্রদ্ধাই নারী-পরাধীনতার স্পেস তৈরি করে।
জাহিদ হোসেন
মানুষ যা পড়েছে, যা দেখেছে, যা শুনেছে, যা ভেবেছে তার সবকিছুর যোগফল হলো তার কথা। কথার মধ্যেই সে প্রকাশিত হয়। কথার ভিতর দিয়েই তার অন্তর একটু একটু করে বেরিয়ে আসে। কথা হলো অভিজ্ঞতা আর অনুভবের নির্যাস। মানুষ যদি খেজুরের গাছ হয়, কথা তার রস। সে কারণে, জনাব Bratya Raisu, আপনার কথার প্রেক্ষিতে আমার কথা বলতে এলাম।
আপনি যে আর্গুমেন্ট দাঁড় করাচ্ছেন, তা সত্যি হলে তিনি জেন্ডার নিউট্রাল থাকতেন। কেবল ‘শাউয়া’ ছিঁড়তে না চেয়ে তিনি “সোনা-মোনা, শাউয়া-মাউয়া ছিড়্যা ফালাইতে' চাইতেন। তা না করে তিনি, সামাজিক বা রাষ্ট্রিক অব্যবস্থাকে বিলীন করতে অথবা একটি দলকে নিশ্চিহ্ন করতে, উদাহরণ হিসাবে, কেবল নারীর যৌনাঙ্গকে ঘৃণার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করলেন। মুখভঙ্গি, বাচনশৈলি, দেহভাষা এবং সর্বোপরি শব্দচয়ন মিলিয়ে তিনি বলতে চাইলেন, ‘শাউয়া’ যেমন সহজে ছেঁড়া যায়, বিদ্যমান অনিয়মকেও অমন ‘ছিইড়্যা’ ফেলতে হবে।
দূর্বাঘাস ছেঁড়া বা পাটের চারা উপড়ানোর মত কোন উদাহরণ না দিয়ে কেন নারীর যোনীকে উদাহরণ হিসাবে টানতে হলো?
মানুষ যখন ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে অনর্গল কথা বলে তখন, পূর্বপ্রস্তুতিহীন উপস্থিতমত (extempore) শব্দচয়ন ও উচ্চারণবৈশিষ্ট্য তাঁর মানসিক অবস্থার পরিচয় প্রকাশ করে দেয়। লোকে বলে না, রাগের মাথায় বলে ফেলেছি কিছু মনে করো না। এটা একটা ভুল কথা কথা। মানুষ আসলে রাগের মাথায় যা বলে সেটাই তাঁর সত্য পরিচয়, সেটাই তাঁর আসল জ্ঞান, ধৈর্য আর রুচির প্রকাশ।
‘শাউয়া’ বা যোনীকে ছিঁড়ে ফেলার মতো নৃশংস উদাহরণ হাজির করার মধ্যে একটা প্রবল পুরুষতন্ত্র আছে। নারীর প্রতি অসম্মান আছে। পুরুষতন্ত্রে যোনীকে যেমন তুচ্ছার্থে উদাহরণ হিসাবে হাজির করা যায়, পুরুষাঙ্গকে তেমন যায় না।
পুরুষতন্ত্রে , পুরুষ পুরুষাঙ্গকেই পৌরুষের প্রতীক হিসাবে মনে করে। সে গাভীর দুধ খায়, গাভীর সন্তান বাছুরকে পেলে পুষে বড় করে চাষবাসে লাগায়, কিন্তু নিজেকে ষাঁড়ের সাথে তুলনা করে আত্মশ্লাঘা বোধ করে। নারীর যোনীকে সে শুধু নিজের আরামের জন্যে ব্যবহার করে। যোনীটি উপযুক্ত কি না, প্রস্তুত কি না, ইচ্ছুক কি না এই বিবেচনার ধার সে ধারে না। যোনী তাঁর কাছে কুৎসিত, অসুন্দর, চাওয়া-পাওয়াহীন এক জড়বস্তু ছাড়া আর কিছু না। তাই ব্যক্তির উপর, সমাজের উপর, এমনকি রাষ্ট্রের উপর রাগ হলেও সে নারীর যৌনাঙ্গকে ‘ছিইড়্যা’ ফেলতে চায়। এটাই সহজ, এটাই সর্বজনগ্রাহ্য ঘৃণ্য উপকরণ হিসাবে সহজে তাঁর মনে পড়ে যায়। তাই সে extempore এই শব্দগুলোকেই ক্রোধ প্রকাশে ব্যবহার করে।
শব্দের এহেন ব্যবহার কেবল ক্রোধের প্রকাশ নয়, মনোভাবেরও প্রকাশ। আমার শঙ্কা এখানেই। আমার মনে হয়, যারা আমাদের নেতা, আমাদের বেপথু জীবনকে পথে আনার ব্রত যারা নিয়েছেন, তাঁদের কথায় শব্দ ব্যবহারে আরো সতর্ক হওয়া উচিত। ভাষা ছুরির মতো। আবার ভাষা সুরের মতও। ব্যবহার করতে জানলে ভাষা দিয়ে যেমন সুরসষ্টি করা যায়, ব্যবহারদোষে তেমন ভাষায় সর্বনাশ ঘটে যায়।
আমার আরেকটা কথাও মনে হয়। যারা কথায় ভাষায় শব্দে এমন উত্তেজনা ঘৃণা বা অপমান ছড়ান, তাঁদের চেয়েও, যাঁরা তাঁদের সমর্থনে দার্শনিক ভিত্তি দাঁড় করান, ন্যারেটিভ তৈরি করেন, তাঁরাই হয়ত এই দেশের সুনীতি সুবুদ্ধি আর শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা।
মন্তব্য করুন

