Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

তৌহিদের স্বীকারোক্তি: নীরব সাক্ষীরও কি দায় নেই?

মত-দ্বিমত

তৌহিদের স্বীকারোক্তি: নীরব সাক্ষীরও কি দায় নেই?

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এমন এক সময়ে মুখ খুলেছেন, যখন তিনি আর ক্ষমতার ভেতরে নেই। আর ঠিক সেখানেই তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক ও নৈতিক তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। তিনি দাবি করেছেন, সরকারের ভেতরে সাত সদস্যের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল, যারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিত। তিনি আরও বলেছেন, এই পরিস্থিতিতে তিনি তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করেননি। তাঁর এই বক্তব্য শুধু একটি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার বিবরণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্দরমহলের এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার ইঙ্গিত। তবে একই সঙ্গে এটি তাঁর নিজের ভূমিকাকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
কারণ প্রশ্নটি খুব সরল—যদি সবকিছু এতটাই ভুল ছিল, তাহলে তিনি তখন কী করেছিলেন?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিচেন কেবিনেট’ নতুন কোনো শব্দ নয়। ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে, সরকারপ্রধানের আশপাশে গড়ে ওঠা একদল অনানুষ্ঠানিক ব্যক্তি বহু দেশেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেই বলয় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোকে ছাপিয়ে যায়। মন্ত্রণালয়, উপদেষ্টা পরিষদ কিংবা প্রশাসনিক চ্যানেলকে পাশ কাটিয়ে যদি একটি অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণ করে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক বিচ্যুতি নয়; সেটি রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জন্য সরাসরি হুমকি।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য সত্য হলে পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের দৃশ্যমান কাঠামো একদিকে ছিল, আর প্রকৃত ক্ষমতা পরিচালিত হচ্ছিল অন্যত্র। জনগণ যাদের দেখে সরকার ভাবছিল, সিদ্ধান্ত নিচ্ছিল হয়তো অন্য কেউ। গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক সংকেত খুব কমই আছে।
কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি। একজন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে তৌহিদ হোসেনের ভূমিকা কী ছিল? তিনি কি কেবল একজন অসহায় দর্শক ছিলেন? নাকি তিনি সবকিছু বুঝেও সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে ছিলেন?
তিনি বলেছেন, তিনবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস ‘চাইছিলাম’ শব্দ দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় ‘করেছিলাম’ দিয়ে। কেউ পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন কি না, সেটি রাজনৈতিক গল্প হতে পারে; কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেছেন কি না, সেটিই ইতিহাসের প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে—না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় মৌলিক দ্বিমত থাকলে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ হলো পদত্যাগ। যদি মনে হয় রাষ্ট্র ভুল পথে যাচ্ছে, যদি বিশ্বাস হয় সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে অন্য কোথাও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যদি দেখা যায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে গোপন বলয়ে—তাহলে পদে বহাল থাকা মানে সেই ব্যবস্থার বৈধতাকে নীরবে মেনে নেওয়া। তৌহিদ হোসেন শেষ পর্যন্ত সেটাই করেছেন। ফলে এখন তিনি যতই দাবি করুন যে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তা তাঁর নৈতিক দায়কে পুরোপুরি মুছে দেয় না।
বরং তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, তিনি এমন এক রাষ্ট্রচিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় পর্যন্ত অন্ধকারে ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেষ সময়ে সম্পাদিত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তাঁর মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যত এই প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল। প্রশ্ন হলো—তাহলে তিনি সেখানে কী করছিলেন?
একজন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যদি দেশের আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পর্কে কার্যত অন্ধকারে থাকেন, তাহলে সেটি তাঁর দায়মুক্তির প্রমাণ নয়; বরং তাঁর অকার্যকারিতার স্বীকারোক্তি। রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘আমাকে জানানো হয়নি’ কোনো সম্মানের বাক্য নয়। এটি হয় প্রমাণ করে যে তিনি নিজের অবস্থানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি, অথবা সব জেনেও চুপ ছিলেন। উভয় ক্ষেত্রেই দায় এড়ানোর সুযোগ সীমিত।
আর এখানেই তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক সংকট। কারণ ক্ষমতায় থাকাকালে নীরব থাকা এবং ক্ষমতা ছাড়ার পর সত্য বলা সবসময় একই মূল্য পায় না। যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল, তখন আপত্তি কোথায় ছিল? যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ হচ্ছিল, তখন জনগণকে সতর্ক করার প্রয়োজন কেন অনুভূত হয়নি? যখন মনে হয়েছে ‘কিচেন কেবিনেট’ সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া হলো না কেন?
রাজনীতিতে নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়। অনেক সময় নীরবতা নিজেই একটি অবস্থান।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, শেখ হাসিনা-কে ফেরত আনার কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে না, এটি তিনি জানতেন। তবুও প্রথার খাতিরে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্য বাস্তববাদী কূটনীতির উদাহরণ হতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে এটিও দেখায় যে তিনি সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অর্থাৎ তিনি পরিস্থিতি বুঝতেন, কিন্তু তবুও সেই ব্যবস্থার অংশ ছিলেন।
এখানে আরও বড় একটি নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব সবসময় যৌথ। কোনো সরকারের সাফল্যের কৃতিত্ব যদি মন্ত্রিসভার সদস্যরা নিতে পারেন, তাহলে ব্যর্থতা বা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের দায় থেকেও তাঁরা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন না। ‘আমি জানতাম না’, ‘আমাকে জানানো হয়নি’, ‘আমি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলাম’—এসব বক্তব্য রাজনৈতিক আলোচনার খোরাক হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে দায়মুক্তির সনদ নয়।
কারণ ইতিহাস খুব নির্মম। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই করে—আপনি তখন কী করেছিলেন?
আজ তাই শুধু ‘কিচেন কেবিনেট’-এর সদস্য কারা ছিলেন, সেই প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—যারা জানতেন যে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে ক্ষমতার আরেকটি বলয় সক্রিয়, তারা কেন তখন নীরব ছিলেন? কেন তাঁরা জনগণকে সতর্ক করেননি? কেন তাঁরা শেষ দিন পর্যন্ত সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে রইলেন?
তৌহিদ হোসেন হয়তো ভেবেছেন, ক্ষমতা ছাড়ার পর সত্য বললে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারবেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য উল্টো আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় নীরব সাক্ষী হওয়াও অনেক সময় অংশীদার হওয়ার সমান। আপনি যদি জানেন সিদ্ধান্ত ভুল পথে যাচ্ছে, অথচ পদে থেকে সেই ব্যবস্থাকে চলতে দেন, তাহলে ইতিহাস আপনাকে কেবল ‘দর্শক’ হিসেবে দেখে না; বরং সেই ব্যবস্থারই অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় শক্তি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যখন প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে অনানুষ্ঠানিক বলয় শক্তিশালী হয়, তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে অস্বচ্ছ ক্ষমতার বন্দি হয়ে পড়ে। আর সেই সময় যারা ভেতরে থেকেও নীরব থাকে, ইতিহাসের বিচারে তাদের দায়ও কম নয়।
তৌহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু অজানা বাস্তবতা সামনে এনেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি নির্মম সত্যও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—ক্ষমতার ভেতরে থেকে নীরব থাকা মানুষরা পরে যতই নিজেদের আলাদা প্রমাণ করতে চান না কেন, ইতিহাস তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন রাখে: ‘আপনি তখন কোথায় ছিলেন?’

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন

Logo