Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বচ্ছতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

মত-দ্বিমত

অন্তর্বর্তী সরকারের অস্বচ্ছতা ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

ড. লুবনা ফেরদৌসী

Icon

ড. লুবনা ফেরদৌসী

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৯:১১ এএম

একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ হওয়ার কথা ছিল নির্বাচন আয়োজন, প্রশাসনিক স্থিতি বজায় রাখা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ পরিষ্কার করা।
কিন্তু সাবেক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সাক্ষাৎকার থেকে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা হলো—একটি আনুষ্ঠানিক সরকার ছিল, আর তার ভেতরে ছিল আরেকটি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্র—সাত সদস্যের তথাকথিত “কিচেন কেবিনেট”। যাকে আমরা ছায়া সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামো বলি। যেখানে ক্ষমতা আছে, কিন্তু জবাবদিহি নেই; প্রভাব আছে, কিন্তু সাংবিধানিক স্বচ্ছতা নেই।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই জিনিস নতুন কিছু নয়। প্রতিষ্ঠান থাকে একদিকে, সিদ্ধান্ত হয় আরেকদিকে। মন্ত্রিসভা থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্ত আসে “উচ্চপর্যায়” থেকে। সংসদ থাকে, কিন্তু নীতি তৈরি হয় বাইরে। দল থাকে, কিন্তু ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে ছোট একটি বলয়ের হাতে। অন্তর্বর্তী সরকারও সেই পুরোনো রোগ থেকে মুক্ত ছিল না। বরং প্রযুক্তিগত নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে একই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা-সংস্কৃতিকে আরও অস্বচ্ছভাবে পুনরুৎপাদন করেছে।
সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজেই বলছেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ে একাধিক উপদেষ্টার প্রভাব ছিল। তাঁদের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট ছিল না, তবু তাঁদের মতামত গুরুত্ব পেত, কারণ “উচ্চপর্যায়ে” তা গুরুত্ব পেত। এর অর্থ খুবই সাধারণ—প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্র চলছিল স্বজনপ্রীতি দিয়ে, অথচ চলার কথা ছিল দক্ষতা দিয়ে। এটা কার্যত শাসনক্ষমতা দখল।
তাঁর বক্তব্যে আমার সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের জায়গা যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে। ভোটের মাত্র তিন দিন আগে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সই হলো, যার প্রভাব কৃষি, ওষুধশিল্প, ডিজিটাল নীতি, জ্বালানি এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত স্বাধীনতার ওপর পড়তে পারে। অথচ তিনি সেই সময়ের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হয়ে বলছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এতে সামান্যতমও যুক্ত ছিল না; যুক্ত ছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এও কি সত্য?
একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যচুক্তি, যার ভূরাজনৈতিক প্রভাব এত গভীর, সেটিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যত অনুপস্থিত?
তাহলে এটা কি বাণিজ্যিক দর-কষাকষি ছিল, নাকি ছিল নিরাপত্তা উপদেষ্টার ব্যবস্থাপনায় ভূরাজনৈতিক সমন্বয়? যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাদ থাকে, যদি নির্বাচিত সংসদ না থাকে, যদি জনপরামর্শ না থাকে, যদি খাতভিত্তিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রকাশ না হয়, তাহলে এই চুক্তির গণতান্ত্রিক বৈধতা কোথায়?
তৌহিদ হোসেনের “কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল”—এই বক্তব্যটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই বাক্যের ভেতরেই স্বীকারোক্তি আছে। বাধ্যবাধকতা কী ছিল? অর্থনৈতিক? কূটনৈতিক? নাকি ভূরাজনৈতিক? কেন এত তাড়া ছিল? কার চাপ ছিল? কেন এমন একটি চুক্তি নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে সই করতে হলো?
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক সিদ্ধান্তগুলো কেন “প্রয়োজনীয়তা” শব্দের আড়ালে নেওয়া হয়? এই প্রয়োজনীয়তা তখন আর বাস্তবতা থাকে না; জবাবদিহিতা এড়ানোর ভাষা হয়ে যায়।


এবার আসি “ডিপ স্টেট”-এ। তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ডিপ স্টেট পৃথিবীর সব ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত থাকে; স্রোতের বিপক্ষে নয়, স্রোতের সঙ্গে গিয়ে পরে সেটাকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই কথা। কারণ গণআন্দোলন জনগণের শক্তি দিয়ে শুরু হলেও, ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে তা কে পূরণ করবে—এই প্রশ্ন সবসময় খোলা থাকে। জনগণ রাস্তায় থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্তের টেবিলে বসে কারা? আন্দোলনের ভাষা থাকে মুক্তির, কিন্তু রূপান্তরের ব্যবস্থাপনা চলে ক্ষমতার পুরোনো এবং নতুন মধ্যস্থতাকারীদের হাতে।
এবং সম্ভবত এখানেই অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা জনগণের নামে বৈধতা নিয়েছিল, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছে সীমিত ও অস্বচ্ছ বলয়ে। তারা সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করেছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি করেনি। তারা পুরোনো কর্তৃত্ববাদের সমালোচনা করেছে, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙেনি।
আওয়ামী লীগ নিয়ে তৌহিদ হোসেনের মন্তব্যটি সম্ভবত তাঁর পুরো সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী অংশ। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাবে—এমন ভাবার কারণ নেই; মানুষের স্মৃতি দীর্ঘ নয়। তাঁর ধারণা, দলটি পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নেবে।
অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও বাস্তবতা হলো, ৭০ বছরের বেশি পুরোনো একটি রাজনৈতিক দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করা যায়, কিন্তু ঐতিহাসিক স্মৃতি বা রাজনৈতিক পরিচয় আইন দিয়ে নিষিদ্ধ করা যায় না। একটি দলকে প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করলেই তার সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে—এই ধারণা রাজনৈতিকভাবে শিশুসুলভ।
কেননা আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং স্বাধীনতার রাজনৈতিক কল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারা। আপনি একটি সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারেন, অফিস বন্ধ করতে পারেন, প্রতীক সরাতে পারেন; কিন্তু মতাদর্শ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং একটি রাজনৈতিক পরিচয়কে আইন দিয়ে অকেজো করা যায় না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—কার্যক্রম এবং অন্তরে ধারণের মধ্যে। কোনো দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু মানুষ যদি সেই রাজনৈতিক ধারণা অন্তরে ধারণ করে ফেলে, সেটাকে পুলিশি ব্যবস্থায় মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসে এই ধরনের বহু উদাহরণ আছে—দল নিষিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু মতাদর্শ বেঁচে থেকেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
বাংলাদেশেও একই বাস্তবতা কাজ করবে। এখানে আরও বড় সত্য হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার চেয়ে স্মৃতিভ্রম অনেক বেশি শক্তিশালী। দুর্নীতি, গুম, ভোটচুরি, দমন-পীড়ন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা—ক্ষমতায় যাওয়া প্রায় সব বড় রাজনৈতিক শক্তিই কোনো না কোনোভাবে এই সংস্কৃতির অংশ হয়েছে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার ধারাবাহিক চর্চা তৈরি হয়নি। দলগুলো রাষ্ট্রকে নিজেদের পরিবর্ধন হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের দায়বদ্ধ মনে করেনি।
আর জনগণ? জনগণের কাছেও বাস্তবিক অর্থে টেকসই রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হয়নি। এই সমাজই একসময় স্বৈরশাসক এরশাদকে ভোট দিয়েছে। এই সমাজই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনৈতিক শক্তিকেও সংসদে পাঠিয়েছে। কারণ সময়ের সঙ্গে সবকিছু ভুলে যায় না ঠিকই, কিন্তু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈতিক ক্ষোভেরও মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় আছে।
আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির পালাবদলের ইতিহাস সেটাই বলে। যদি দেশে ধারাবাহিকভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হতো, তাহলে সম্ভবত আমরা আরও স্পষ্টভাবে দেখতাম—বাংলাদেশের ভোটাররা সাধারণত দীর্ঘ সময় একই দলের প্রতি আস্থা ধরে রাখে না। একপর্যায়ে তারা ক্লান্ত হয়, ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রতিপক্ষকে সুযোগ দেয়। কারণ বড় দুই দলই ক্ষমতার অপব্যবহার, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি এবং প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
এখানে মূল সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা ব্যবহারের ধরণ খুব কম বদলায়। সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু কেন্দ্রীকরণ, পৃষ্ঠপোষকতা, রাজনীতিকরণ এবং দায়মুক্তি—এই চারটি জিনিস প্রায় একই থাকে।
গণতন্ত্র তো শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র হলো জবাবদিহিতার সংস্কৃতি। এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে কোনো দলই এত শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে যে রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে শুরু করে। নিয়মিত, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ শুধু সরকার গঠনের জন্য নয়; ক্ষমতাকে তার সীমার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যও। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছায় গণতান্ত্রিক হয় না; তাদের গণতান্ত্রিক থাকতে বাধ্য করতে হয়।
আর বাংলাদেশে সেই বাধ্য করার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি দুর্বল বলেই দলগুলো প্রায়ই জনগণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে অপেক্ষা করে মানুষের ক্ষোভের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট নেতৃত্বের অভাব নয়; প্রতিষ্ঠানহীন নেতৃত্বের আধিপত্য। এখানে ব্যক্তি বড়, প্রতিষ্ঠান ছোট। বলয় শক্তিশালী, প্রক্রিয়া দুর্বল। সিদ্ধান্ত দ্রুত, জবাবদিহি ধীর। আর জনগণ? জনগণকে বলা হয়, সবই জাতীয় স্বার্থে হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ কখনও গোপন বৈঠকে সংজ্ঞায়িত হয় না। জাতীয় স্বার্থের জন্য লাগে স্বচ্ছতা, বিতর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ এবং জনগণের জানার অধিকার।
তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রচর্চার এক গভীর রোগের উপসর্গ। আর সেই রোগের নাম—অস্বচ্ছ ক্ষমতা।
লুবনা ফেরদৌসী: শিক্ষক ও গবেষক
ইউনিভার্সিটি অব হাল, ইংল্যান্ড

মন্তব্য করুন

Logo