'ফাঁসি যত পাবলিক হবে, সমাজ তত নৈতিক হবে, এই ধারণার কোনো প্রামানিক ভিত্তি নেই' ছবি: সংগৃহীত
লুবনা ফেরদৌসী
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১১:১০ এএম
'মধ্যযুগীয়’ শব্দটি শুনে জামায়াত এবং তার সাথীরা আহত হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। কী আর বলবো! ইতিহাসের জ্ঞান নেই, অপরাধবিজ্ঞানের ধারণা নেই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বোঝাপড়া নেই, কিন্তু দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে বসে আছে।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো বলেন, প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড ছিল ক্ষমতার প্রদর্শনী। রাজা জনগণকে দেখাতে চাইত, তোমার শরীর, জীবন, মৃত্যু সব আমার নিয়ন্ত্রণে। তাই মধ্যযুগীয় ইউরোপে মানুষ ফাঁসি দেখতে উৎসবের মতো জড়ো হতো। জনসম্মুখের শিরচ্ছেদ ছিল বিনোদন। মানুষের মৃত্যু ছিল রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ। যদি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড সভ্যতার চিহ্ন হতো, তাহলে মধ্যযুগীয় ইউরোপ পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক সমাজ হতো। তালেবান স্টেডিয়ামে মানুষ হত্যা করেছে, আইএসআইএস প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদের ভিডিও বানিয়েছে, সৌদি আরব বছরের পর বছর জনসম্মুখে শিরচ্ছেদ করেছে। তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ, মানবিক রাষ্ট্রগুলো কোথায় তৈরি হয়েছে? কাবুলে? নাকি ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, ডেনমার্কের মতো আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে?
আবার যখন তাদের নিজেদের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ধর্ষণে সহযোগিতা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়, তখন তারাই হঠাৎ আন্তর্জাতিক আইন, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া, ন্যায় বিচার ইত্যাদির সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তায় পরিণত হন।
তখন ফরেনসিক এভিডেন্স লাগে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড লাগে, স্বাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা লাগে, আপিল লাগে, রিভিউ লাগে, দশ বছরের মামলা লাগে। তখন তারা বলেন, “সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়নি”, “বিচার রাজনৈতিক”, “আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়নি।”মানে নিজেদের জন্য জেনেভা কনভেনশন, আর বাকিদের জন্য গ্রাম্য সালিস, এই সিলেক্টিভ নৈতিকতার একটা লিমিট থাকা উচিত।
ক্রিমিনোলজি বলে, শাস্তির নৃশংসতা দিয়ে অপরাধ কমে না, অপরাধ কমে শাস্তির নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে। শক্তিশালী ফরেনসিক সিস্টেম , দ্রুত বিচার, স্বাক্ষীর সুরক্ষা, ভুক্ত ভোগির সুরক্ষা, জেন্ডার সমতা, পুলিশের দক্ষতা এসবই সমাজকে নিরাপদ করে। টাউন স্কয়ারে মানুষ ঝুলিয়ে কিংবা কতল করে এটা হয় না।
বাংলাদেশের ট্রাজেডি হলো, আমরা এখনো বিচারব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে প্রতিশোধের মঞ্চ হিসেবে দেখি। যেন ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য জনতার রাগ শান্ত করা।
আর ভয়ংকর দ্বিচারিতা হলো, জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল- অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবতন্ত্রকে সাধারণ সহনীয় বিষয়ে পরিনত করা হয়েছে। জামায়াতের রাজনৈতিক- বাণিজ্যিক মডেল বহুদিন ধরেই একই। প্রথমে যেকোনো রাজনৈতিক বিতর্ককে ধর্মীয় অবমাননার প্রশ্ন বানাও। তারপর জনগণের আবেগ মোবিলাইজ করো। তারপর নিজেকে ঈমানের পাহারাদার, মুসলিম আইডেন্টিটির একমাত্র অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করো। দারুন রাজনৈতিক ব্যবসা!
যারা মধ্যযুগীয়কে ইসলামীকরণ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনুভূতি আহত হওয়ার কথা বলছেন, তারা কি কখনো মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন, বা রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় একই তীব্রতা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন । তখন কোথায় যায় এই জনসম্মুখে শিরচ্ছেদের আবেগ? তখন কেন হঠাৎ করে-’ডিএনএ টেস্ট হয়েছে’?, ’হুজুরকে ফাঁসানো হচ্ছে’,’ষড়যন্ত্র হতে পারে’, এসব ন্যারেটিভ বের হয়?
তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সপ্তম শতকের আরবের সামাজিক বাস্তবতা, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার, অপরাধবিজ্ঞান, ফরেনসিক বিচার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সবকিছুকে ব্লেন্ডার এ ঢুকিয়ে এক ধরনের আবেগীয় স্যুপ বানিয়ে ফেলেছে। প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন না করলেই কীভাবে সেটা রাসূল (সা.) এর প্রতি অবমাননা হয়ে যায়? মানে ক্রিমিনাল জাস্টিস পলিসি নিয়ে ডিবেট করার অধিকারও এখন ধর্মীয় অবমাননার ক্যাটাগরিতে ঢুকে গেছে?
এই যুক্তি অনুযায়ী তাহলে আধুনিক রাষ্ট্রের অর্ধেক জিনিসই ইসলাম অবমাননা হওয়ার কথা। কারণ সপ্তম শতকের আরবে সংসদীয় গণতন্ত্র ছিল না, পার্লামেন্ট ছিল না, পাসপোর্ট সিস্টেম ছিল না, ফরেনসিক ডিএনএ এভিডেন্স ছিল না, digital surveillance ছিল না, আন্তর্জাতিক মানব অধিকার কাঠামো তথা জাতিসংঘ ছিল না। তাহলে এগুলো ব্যবহার করাও কি অবমাননা?
আর ইসলামের ইতিহাসকে অপরিবর্তিত জাদুঘর বানিয়ে ফেলাও এক ধরনের অবমাননা। কারণ সভ্যতা পরিবর্তনশীল। সপ্তম শতকের আরবের ট্রাইবাল কনটেক্সট , পানিশমেন্ট স্ট্রাকচার, পলিটিকাল অথোরিটি, সোশ্যাল অর্ডার , এসব আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রর বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু এখানে সেই জটিল ঐতিহাসিক আলোচনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করা হয়। কারণ সেটা পলিটিক্স এর জন্য বিপজ্জনক, বরং স্লোগান লাভজনক।
আবার এই ইসলামের নাম ব্যবহার করে মধ্যযুগীয় শাস্তির দাবিদারদের অনেকেই নিজেরা আধুনিক রাষ্ট্রের সব সুবিধা ভোগ করেন। আইফোন ব্যবহার করবেন, এমআরআই স্ক্যান করবেন, ইংল্যান্ড আমেরিকার ভিসা চাইবেন, , কিন্তু অপরাধের বিচারের জায়গায় হঠাৎ টাইম মেশিন চালু হয়ে যাবে। সত্যিই মনোমুগ্ধকর! যদি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড সমাজকে নৈতিক করে তুলত, তাহলে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও মানবিক সমাজ হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবতা কি তাই? আফগানিস্তানে কি নারী নিরাপদ? ইরানে কি ভিন্নমত নিরাপদ? পাকিস্তানে কি গনপিটুনি হত্যা বন্ধ হয়েছে? সৌদি আরবে মাইগ্রেন্ট শ্রমিকরা কি পূর্ণ মানবিক মর্যাদা পায়?
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক অস্ত্র এখন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত।আপনি কোনো আইন নিয়ে প্রশ্ন তুললেন,ধর্ম অবমাননা। আপনি শাস্তির দর্শন নিয়ে ডিবেট করলেন, ধর্ম অবমাননা। আপনি ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা দিলেন, ধর্ম অবমাননা। Once you wrap an issue inside sacred immunity, critical thinking বন্ধ।
একজন মন্ত্রী জনসম্মুখে হত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আপনি ভিন্ন যুক্তি দিতে পারেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে “রাসূল (সা.) এর অবমাননা” কার্ড বের করে ফেলা যুক্তির দুর্বলতা, ছুতো। কারণ যুক্তিতে জেতা কঠিন। আবেগে আগুন লাগানো সহজ।
দক্ষিণ এশিয়ার ট্রাজেডি এখানেই। আমরা এখনো ক্রিমিনাল জাস্টিস রিফর্ম কে ক্রিমিনোলজির বদলে মব মনস্তত্ত্ব দিয়ে চিন্তা করি। যেন জাস্টিস এর উদ্দেশ্য সত্য না; জনতার আবেগের সন্তুষ্টি। ফাঁসি যত পাবলিক হবে, সমাজ তত নৈতিক হবে, এই ধারণার কোনো প্রামানিক ভিত্তি নেই। সেটা হলে তালিবান পৃথিবীর সবচেয়ে নৈতিক সিভিলাইজেশন হতো।
ভয়ভিত্তিক সমাজ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ না। আর প্রকাশ্য শাস্তিতে অনেক সময় ন্যায়বিচারের চেয়ে দেখানোটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
লুবনা ফেরদৌসী: শিক্ষক ও গবেষক
মন্তব্য করুন

