রাজনীতি ছাড়া যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো, কিংবা জনঅধিকারের পথ থাকে রুদ্ধ, ছবি: রায়হান আহমেদ
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১২:৪৪ এএম
পাঁজরের ক্ষতগুলোর সম্মিলিত নামকরণ কী করা যায়? এগুলোর রংই বা কী? ক্ষতের উৎসগুলো কি অচেনা-অজানা? প্রশ্নের পাহাড়, তবে এসবের উত্তরও গণ্ডিবদ্ধ নয়। ক্ষতগুলোর মিলিত নাম বেদনা। রং বহুমাত্রিক বটে, তবে সবশেষে রূপ নেয় এক রঙে; আর তার নাম হলো বিবর্ণতা। অচেনা-অজানা কিনা, এ প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট। ‘সময়ের উবাচ’ বলতে বর্তমান সময়ের সংকট, পরিবর্তন বা সমাজের প্রতিচ্ছবিকে বোঝায়, যা সাধারণত আমাদের চলমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরে—যেমন ধ্বংস, জীবনের গলিতে যৌবনের অপচয় কিংবা রাষ্ট্র-সমাজের অদ্ভুত পরিস্থিতি, যা বহুমাত্রিক নেতিবাচক বার্তা দেয়।
একটা কঠিন সময় আমরা অতিক্রম করে এসেছি। এই রকম পরিস্থিতিতে পথ খুঁজে নেওয়াটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর সেই পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে কিংবা অতিক্রম করে এসে কিছু কথা বারবার মনে করতে হয়, ফিরে যেতে হয় এমন মানুষ আর তাঁদের বক্তব্যের কাছে।
সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ? এ প্রশ্নের উত্তর অন্তহীন নয়। সময় সব ধরনের ক্রিয়া, বয়স ও কারণ-ফল সম্পর্ক নির্ধারণ করে। এটি বিভিন্ন পরিমাপের একটি মৌলিক উপাদান, যা ঘটনাবলিকে ক্রমবিন্যাস করতে, ঘটনাগুলোর স্থায়িত্বকাল (বা তাদের মধ্যে ব্যবধান) তুলনা করতে এবং পরিবর্তনের হারকে ভৌত বাস্তবতা অথবা চেতনার অভিজ্ঞতার মধ্যে নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়।
‘অন্ধকার কখনো চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু যে আলোর জন্য অপেক্ষা করে—তারই জয় হয় শেষ পর্যন্ত’—এই কথাগুলো যেন বিদ্যুতের মতো ভেতরকার অন্ধকারে আলো ফেলে। উপলব্ধিতে আসে—হয়তো আজকের সংকটই ভবিষ্যতের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করছে। তখন থেকেই অনুপ্রেরণার সন্ধান, নিজের সঙ্গে কথোপকথন আর এক পা এক পা করে সামনে এগিয়ে যাওয়া—এই সহজ অভ্যাসগুলো মানুষকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখায়। ভাঙতে ভাঙতেই একদিন মানুষ বুঝে নেয়, নতুনভাবে গড়ার জন্য আগে একটু গুঁড়িয়ে যেতে হয়। সবকিছু ছারখার না হলে নতুন করে সাজানো যায় না—এটা জগৎখ্যাত এক দার্শনিকের পুরোনো, অনেক পুরোনো ভাষ্য।
অনেকেই কখনো কখনো কান্না লুকান। কিন্তু কষ্ট গিলে রাখলে সেটা বিষ হয়। বাইরে বের করলে সেটা আস্তে আস্তে ফুরিয়ে যায়। সময় এই শিক্ষাও দেয়—কঠিন সময় কারও জন্য থামে না, সান্ত্বনা দেয় না, দয়া করে না। শুধু পরীক্ষা নেয়—তুমি নিজের পাশে দাঁড়াতে পারো কি না, যখন আর কেউ নেই। দুঃসময়ে অনেকেই চান কিংবা অপেক্ষা করেন, কেউ এসে তাঁদের টেনে দাঁড় করাক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কিংবা অনেকের অভিজ্ঞতায় আছে, জীবন এমনভাবে তৈরি, যেখানে নিজেকেই হাত বাড়াতে হয় নিজের দিকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কবি-নাট্যকার Robert Frost-এর কবিতায় আগুন ও বরফ দিয়ে পৃথিবীর ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। আবার কোনো কোনো আধ্যাত্মিক লেখায় নিজের ভেতরের মন্দ স্বভাবের ক্ষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই যে মন্দ স্বভাবের ক্ষয় ঘটছে না, বলেই শুভবোধসম্পন্নদের হৃদপিণ্ডে ক্ষতের ওপর ক্ষত তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বিসর্জিত বলেই কি অনাচার-দুরাচারের ভূমি ক্রমেই উর্বর হয়েছে? এই ভূখণ্ডের রাজনীতির অর্জন তো কম নয়। খুব আগে না হয় নাই-বা গেলাম, কিন্তু বায়ান্ন থেকে একাত্তর, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও তো রাজনীতির অর্জনের খতিয়ান দীর্ঘ। কিন্তু এই অর্জনের বিসর্জন ঘটেছে, এবং তা একদিনে ঘটেনি, থামেওনি। তাতে দুর্ভাবনার দাগ ক্রমেই মোটা হয়ে চলেছে।
রাজনীতির ক্ষত রাজনীতি দিয়েই উপশম করতে হবে এবং সেই রাজনীতি হতে হবে শুদ্ধাচারের রাজনীতি। যে রাজনীতির লক্ষ্য জীবন বদলে দেওয়া, জীবনমানের উন্নয়ন, একই সঙ্গে দেশ-জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি—আমাদের দেশে সেই রাজনীতির অনুষঙ্গ কেন হয়ে পড়ল দুর্বৃত্তায়ন? না, শুধু আমাদের দেশেই নয়; এই উপমহাদেশের আরও কয়েকটি দেশেও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান অনুষঙ্গ হয়ে আছে। কিন্তু আমাদের এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। তারপরও কেন তা হলো, এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় বর্তায় রাজনীতিকদের ওপর।
উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো অর্জনই সম্ভব নয়, যদি তা ধারণ করে এগোনো না যায়। সমাজ-রাষ্ট্রে অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত যেসব ঘটনা ক্ষত ও বেদনার গাঢ় ছায়া দীর্ঘ করছে, এর উপশম ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু কীভাবে হবে উপশম, কিংবা কে বা কারা করবেন উপশম? নিশ্চয়ই এর দায় স্পষ্টত বর্তায় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রশক্তির ওপর, যা উপেক্ষা করার অবকাশ নেই উল্লেখিত কোনো পক্ষেরই।
জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে মানবাধিকারে আঘাত লাগে—তা অনস্বীকার্য, এটা নিখাদ সত্য। এ সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থাৎ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো স্থিতিশীল সমাজের অন্যতম শর্ত জননিরাপত্তা। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও জননিরাপত্তার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জননিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা ইত্যাদি জরুরি বিষয় হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সব কিছুর শেষ আছে, কিন্তু মানুষের অধিকারের শেষ নেই—এই সত্যটুকু শাসক কিংবা রাষ্ট্রপরিচালকেরা ভুলে যান! স্বাধীনতা-উত্তর প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারের শাসনামলেই জনঅধিকার কম-বেশি শাসকদের পদদলিত হয়েছে। কোনো কোনো অরাজনৈতিক সরকারের শাসনামলও এর বাইরে নয়। বিগত অন্তর্বর্তী কিংবা রূপান্তরকালীন সরকারের শাসনামলও এর বাইরে নয়। আমাদের সামনে আরও উদাহরণ রয়েছে। অসংখ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দ্বিচারিতা, হীনস্বার্থবাদিতা, স্বেচ্ছাচারিতা, লুণ্ঠনসহ অজস্র নেতিবাচক কর্মকাণ্ডই তো দেশের সাধারণ মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু যেসব অরাজনৈতিক সরকার ইতিমধ্যে দেশ শাসন করেছে, তাঁদের কারও কারও শাসনামলও কম ক্ষত তৈরি করেনি। বিগত রূপান্তরকালীন সরকার বহু ক্ষেত্রেই এর নজির তৈরি করেছে। সর্বজনের রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জনগুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়টি বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিছক রাজনৈতিক কথার কথা ছাড়া যে আর কিছু নয়, এর নজিরও আছে অনেক। এই বাস্তবতায় সঙ্গতই প্রশ্ন দাঁড়ায়—অধিকারের সমতল ভূমি নিশ্চিত করা কি এত সহজ?
এই সত্য অনস্বীকার্য যে, রাজনীতির ভুল সংশোধিত হতে হবে রাজনৈতিক পন্থাতেই। আমরা এমন কোনো রাজনীতি আর চাই না, যে রাজনীতি কিংবা নির্বাচনের কারণে রাষ্ট্রের মালিক জনগণকে পোহাতে হবে খাণ্ডবদাহন। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, আমাদের রাজনীতি সবচেয়ে বেশি পরাজিত হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবং ব্যবস্থায় বহুবিধ ক্ষত জিইয়ে রাখার কারণে। রাজনীতি ছাড়া যেকোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজ বদ্ধ জলাশয়ের মতো, কিংবা জনঅধিকারের পথ থাকে রুদ্ধ—এ সত্য ভুলে যাওয়াও রাজনীতিকদের অনুচিত।
রাজনীতিতে যদি শিষ্টাচারের যথাযথ অনুশীলন না হয়, তাহলে রাজনীতির শ্রী পুনরুদ্ধার দুরূহ। শিষ্টাচারের অনুশীলন শুরু হোক, আর সময়ক্ষেপণ না করে; এবং জাতীয় কিংবা স্থানীয় সব পর্যায়ের নির্বাচনের পাশাপাশি মানুষের অধিকারের জমিন সমতল করাসহ রাষ্ট্র ও সমাজে সাম্যের আলো ছড়ানোর জরুরি প্রয়োজনে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রশক্তি, রাজনীতির নীতিনির্ধারকসহ সমাজসচেতন সবারই কর্তব্য রয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ অনাচার-দুরাচারের যে উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও এর অন্যতম অনুষঙ্গ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এর উপশমে গর্জন নয়, চাই বর্ষণ। অবস্থা ভালোর আশা ততক্ষণ পর্যন্ত দুরাশার নামান্তর, যতক্ষণ না ব্যবস্থা ভালো হবে।
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন

