Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

মাতৃদোষের রাজনীতি এবং হামের মহামারী

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১, ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

মাতৃদোষের রাজনীতি এবং হামের মহামারী

নাহিদ আক্তার

Icon

নাহিদ আক্তার

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম

বাংলাদেশে চলমান হাম মহামারীতে শত শত শিশুর মৃত্যু শুধু একটি জনস্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও নির্মম প্রতিচ্ছবি। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকার সংকট কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে জবাবদিহির বদলে দায় চাপানো হচ্ছে মায়েদের ওপর। বলা হচ্ছে, “মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না”, ফলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং তারা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। এই বক্তব্য শুধু তথ্যগতভাবে দুর্বল নয়, এটি রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনকও।

ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্র যখন নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে চায়, তখন সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে নারী। সমাজের দীর্ঘদিনের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা সেই কাজটিকে আরও সহজ করে দেয়। ফলে একটি জটিল জনস্বাস্থ্য সংকটকে হঠাৎ করেই কয়েকজন মায়ের ব্যক্তিগত আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়। এতে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে চলে যায়, আর নারীরা হয়ে ওঠেন জনরোষের কেন্দ্রবিন্দু।

বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতেই বুকের দুধ খাওয়ানোর হার সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্র মায়েদের অধিকাংশই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান এবং জন্মের পরপরই তা শুরু করেন। কারণ বুকের দুধই তাদের শিশুর সবচেয়ে সহজলভ্য এবং নির্ভরযোগ্য পুষ্টির উৎস। তাহলে প্রশ্ন হলো, যেসব পরিবারের শিশুরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, সেই পরিবারগুলোর মায়েদের ওপর “দুধ না খাওয়ানোর” অভিযোগ কতটা যৌক্তিক?

আরেকটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষণীয়। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো নারী শরীর “ফিট” রাখলে বুঝি তিনি সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াননি। এই ধারণা বিজ্ঞানসম্মত নয়, বরং এটি নারীর শরীর নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণেরই একটি রূপ। মাতৃত্বকে এখানে এমনভাবে বিচার করা হয়, যেন একজন নারীর শরীর তার “ভালো মা” হওয়ার প্রমাণপত্র। অথচ বাস্তবতা হলো, বুকের দুধ খাওয়ানো একটি জৈবিক ও জটিল শারীরিক প্রক্রিয়া। দীর্ঘক্ষণ দুধ না খাওয়ালে মায়ের শরীরেই তীব্র ব্যথা ও শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলোকে অস্বীকার করে নারীদের দায়ী করাই যেন সহজ পথ।

এখন প্রশ্ন হলো, শিশু মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী? জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার ঘাটতি, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অসম স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। ২০২৫ সালে টিকা কাভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ইউনিসেফও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কতা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। ফলে আজ তার ভয়াবহ পরিণতি দেখতে হচ্ছে।

এমন বাস্তবতায় “মাতৃদোষ” তত্ত্ব সামনে আনা নিছক কাকতালীয় নয়। এটি আসলে দায় এড়ানোর রাজনৈতিক কৌশল। রাষ্ট্র যখন নিজের ব্যর্থতার জবাব দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সংকটের দায় জনগণের দুর্বল অংশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। আর আমাদের সমাজে সেই দুর্বলতম লক্ষ্য প্রায়শই নারী।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এই ধরনের বক্তব্য অসংখ্য মায়ের মধ্যে অপরাধবোধ ও মানসিক চাপ তৈরি করছে। একটি শিশুর মৃত্যু কোনো মায়ের একার ব্যর্থতা নয়। এটি স্বাস্থ্যনীতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি বিষয়।

তাই এখন প্রয়োজন দায় চাপানোর রাজনীতি নয়, বরং সত্যিকারের জবাবদিহি। কারণ একটি রাষ্ট্র যদি নিজের ব্যর্থতা স্বীকার না করে নারীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়, তাহলে তা শুধু অন্যায় নয়, গভীরভাবে অমানবিকও।

নাহিদ আক্তার: শিক্ষক ও গবেষক

মন্তব্য করুন

Logo