Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

সার নিয়ে রাজনীতি ও ক্ষমতার অদৃশ্য সিন্ডিকেট

স্বাধীনতার পর থেকেই সার বিতরণ ব্যবস্থা এক ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, ছবি: সংগৃহীত

মত-দ্বিমত

সার নিয়ে রাজনীতি ও ক্ষমতার অদৃশ্য সিন্ডিকেট

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২:০৫ এএম

বাংলাদেশে সার কখনোই শুধু একটি কৃষি উপকরণ ছিল না। এটি ধানক্ষেতের মাটিতে যেমন মিশে থাকে, তেমনি মিশে আছে রাজনীতি, প্রশাসন আর ক্ষমতার অদৃশ্য সমীকরণে। ইউরিয়া, টিএসপি বা ডিএপি—এই নামগুলো কৃষকের কাছে যতটা না রাসায়নিক, তার চেয়ে বেশি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাস্তবতা। কারণ সময়মতো সার না পেলে ফসল নষ্ট হয়, আর ফসল নষ্ট হলে নষ্ট হয় একটি পরিবারের সারা বছরের স্বপ্ন।
এই দেশের সার ব্যবস্থাপনার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এটি কখনোই নিরপেক্ষ একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। স্বাধীনতার পর থেকেই সার বিতরণ ব্যবস্থা এক ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকার বদলালে ডিলার বদলায়, নীতিমালা বদলায়, আবার অনেক সময় পুরো বিতরণ কাঠামোই নতুন করে সাজানো হয়। কিন্তু বদলায় না একটি জিনিস—কৃষকের অনিশ্চয়তা।
গ্রামবাংলার বাস্তবতা হলো, সার পৌঁছায় ডিলারের হাত ঘুরে। সেই ডিলারের পেছনে থাকে সাব-ডিলার, পরিবেশক, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং অনেক সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া। এই বহুস্তরীয় কাঠামোর ভেতরে স্বচ্ছতা যত কম, সংকটের অভিযোগ তত বেশি। ফলে বাজারে যখন সার সংকট দেখা দেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এটি কি সত্যিকারের ঘাটতি, নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা এক ধরনের চাপ?
অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বলা হয়ে আসছে, কিছু ডিলার ও সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে দাম বাড়িয়ে দেন। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কৃষককে সার কিনতে হয় অনেক জায়গায়। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, আর লাভ কমে যায়। এই চাপে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো কৃষি অর্থনীতি।
বাংলাদেশের কৃষি ইতিহাসে সার সংকট কোনো নতুন ঘটনা নয়। বিশেষত বিএনপি সরকারের সঙ্গে সার সংকটের একটা ঐতিহাসিক যোগ আছে। ১৯৯৫ সালের ইরি-বোরো মৌসুমে সার সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সে সময় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। তখন ন্যায্যমূল্যে সার ও কৃষি উপকরণের দাবিতে কৃষকরা আন্দোলনে নামেন। টাঙ্গাইল ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে ১৮ জন কৃষকের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আন্দোলন দমনের প্রয়াস ছিল না, বরং কৃষকের জীবিকার দাবিকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় শক্তির এক ভয়াবহ অপব্যবহারের উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে রয়ে গেছে। সেই সময় থেকে সার ইস্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর ও আবেগঘন বিষয় হয়ে ওঠে।
কিন্তু তিন দশক পরেও চিত্র খুব একটা বদলায়নি। সময়ের সঙ্গে সরকার বদলালেও কৃষকের অভিযোগ প্রায় একই রকম—সার পাওয়া যাচ্ছে না, অথবা সরকারি দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সংকটের আশঙ্কা নেই। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন চিত্র দেখায়। কোথাও কোথাও কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আবার কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিতে বাধ্য হতে হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সার বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। একসময় রাষ্ট্রীয় সংস্থা সরাসরি সার বিতরণ করত। পরে ধীরে ধীরে তা বিকেন্দ্রীকরণ করে ডিলারশিপ ব্যবস্থার মাধ্যমে বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক চাপ কমানো। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাই অনেক জায়গায় নতুন ধরনের প্রভাব ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
স্থানীয় পর্যায়ে ডিলার নিয়োগ অনেক সময় যোগ্যতা বা দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে—এমন অভিযোগ বহু পুরনো। ফলে একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অংশে পরিণত হয়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ডিলাররা শুধু ব্যবসায়ী নন, অনেক ক্ষেত্রে তারা হয়ে ওঠেন স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্র।
সম্প্রতি সরকার নতুন “সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ নীতিমালা–২০২৫” চালু করেছে। এই নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব নয়, বরং স্বচ্ছতা, স্থানীয়তা ও আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে এক পরিবারে একাধিক ডিলারশিপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, গুদাম ও ব্যাংক সলভেন্সির মতো শর্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, এবং খুচরা সাব-ডিলার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বাতিল করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নীতিগতভাবে এসব পদক্ষেপকে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট রোধ করা সম্ভব হবে এবং কৃষক সরাসরি ন্যায্যমূল্যে সার পাবেন। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন কি সত্যিই মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হবে, নাকি নতুন করে অন্য ধরনের জটিলতা তৈরি করবে?
কারণ খুচরা বিক্রেতারা ইতোমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, সাব-ডিলার ব্যবস্থা বাদ দিলে গ্রামীণ পর্যায়ে সরবরাহ ব্যাহত হবে। প্রায় হাজার হাজার ছোট ব্যবসায়ী এই খাতে জড়িত, যারা ব্যাংক ঋণ ও স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভর করে ব্যবসা চালান। এই কাঠামো ভেঙে দিলে একদিকে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থায় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে কৃষি প্রশাসন বলছে, আগের ডিলাররাই আপাতত দায়িত্বে আছেন এবং দেশে বড় কোনো সংকট নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং আমদানিও চলমান। তবে মাঠ পর্যায়ের কৃষকের অভিজ্ঞতা অনেক সময় এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে না। অনেক এলাকায় সার পেতে দেরি, কোথাও আবার বেশি দাম—এই অভিযোগ নিয়মিত শোনা যায়।
এখানেই মূল সমস্যা স্পষ্ট হয়। কাগজে থাকা সরবরাহ ব্যবস্থা আর বাস্তব বাজারের মধ্যে একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ব্যবধান পূরণ করে স্থানীয় বিতরণ নেটওয়ার্ক, যেখানে অনিয়ম বা অতিরিক্ত লাভের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সরকার বলছে মজুত আছে, আর কৃষক বলছে সার পাওয়া যাচ্ছে না।
এই দ্বৈত বাস্তবতা শুধু প্রশাসনিক নয়, এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। কারণ সার বিতরণ ব্যবস্থায় একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে রয়েছে স্থানীয় বাস্তবতা। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে যেকোনো নীতিমালা কাগজে ভালো হলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে উৎপাদন বাড়লেও অনিশ্চয়তা কমছে না। জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজার অস্থিরতা—সব মিলিয়ে কৃষকের জীবন ক্রমশ চাপের মধ্যে পড়ছে। তার ওপর যদি সার নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে, তবে পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সার ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রে আসলে কে আছে? কৃষক, নাকি মধ্যস্বত্বভোগী কাঠামো? নীতিনির্ধারকরা বলছেন কৃষককে কেন্দ্র করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে কৃষকের অভিজ্ঞতা অনেক সময় ভিন্ন কথা বলে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি। সার বিতরণ ব্যবস্থা যত বেশি রাজনৈতিক প্রভাবাধীন হয়, তত বেশি সেখানে আস্থার সংকট তৈরি হয়। এই আস্থার সংকটই শেষ পর্যন্ত বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে এবং কৃষককে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাই সার নিয়ে আলোচনা কেবল একটি কৃষি নীতির বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং গ্রামীণ সমাজের ক্ষমতার সম্পর্কের একটি প্রতিফলন। এই সম্পর্ক যতদিন স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ না হবে, ততদিন সার সংকট নিয়ে বিতর্কও শেষ হবে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ কিন্তু গভীর—সার কি সত্যিই কৃষকের জন্য, নাকি এটি হয়ে গেছে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের আরেকটি ক্ষেত্র?
এই প্রশ্নের উত্তর যতদিন স্পষ্ট না হবে, ততদিন প্রতি মৌসুমেই সার শুধু মাটিতে নয়, রাজনীতির মাঠেও নতুন করে অঙ্কুরিত হতে থাকবে।

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট ও উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন

Logo