নাট্য সারথি আতাউর রহমান
শাহেদ কায়েস
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম
বাংলা নাট্যাঙ্গনের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের উপস্থিতি কেবল শিল্পচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের সাংস্কৃতিক চেতনা, মানবিকতা এবং শিল্পরুচির প্রতীক। বরেণ্য নাট্যজন ও মঞ্চরাজ অভিনেতা আতাউর রহমান ছিলেন তেমনই এক বিরল শিল্পী। তাঁর অভিনয়, মঞ্চনির্মাণ, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ তাঁকে বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর প্রয়াণ শুধু একজন অভিনেতার মৃত্যু নয়, এটি যেন বাংলা নাট্যাঙ্গনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
একটা সময় ছিল, টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের জন্য এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। তাঁর অভিনয়ে কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না, ছিল না কৃত্রিম আবেগের চাপ। তিনি চরিত্রকে শুধুই অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতেন না—নিজেই চরিত্র হয়ে উঠতেন। তাঁর সংলাপ উচ্চারণে ছিল এক অদ্ভুত স্বাভাবিকতা, চোখের ভাষায় ছিল গভীর মানবিক অনুভব, আর তাঁর মুখের সেই সরল হাসি দর্শকের মনে তৈরি করত এক আত্মীয়তার অনুভূতি। এ কারণেই তিনি শুধু অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের ঘরের মানুষ।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাসে যে কয়েকজন মানুষ মঞ্চনাটককে প্রাতিষ্ঠানিক ও শৈল্পিক ভিত্তি দিয়েছেন, আতাউর রহমান তাঁদের অন্যতম। নাটকের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল আজীবনের। তিনি বিশ্বাস করতেন, নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চেতনা নির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার। সমাজ, রাজনীতি, মানবিক সংকট, প্রেম, বেদনা—সবকিছুই তিনি নাটকের ভাষায় প্রকাশ করতে চেয়েছেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলোর ভেতর দিয়ে আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজ, আমাদের মানুষ, আমাদের সময়কে। শিল্পী হিসেবে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর স্বাভাবিকতা। অনেক অভিনেতা আছেন, যাঁরা চরিত্রকে বড় করে তুলতে গিয়ে অভিনয়কে অতিনাটকীয় করে ফেলেন। কিন্তু আতাউর রহমান ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি জানতেন, মানুষের সত্যিকারের আবেগ অনেক সময় খুব নীরব হয়। তাই তাঁর অভিনয়ে চিৎকারের বদলে ছিল গভীরতা, অতিরঞ্জনের বদলে ছিল সংযম। তাঁর চোখের একটিমাত্র দৃষ্টি কিংবা সামান্য বিরতিও কখনও কখনও দীর্ঘ সংলাপের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠত।
বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের সোনালি সময়ের কথা উঠলেই তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। যে সময়ে নাটক ছিল মানুষের জীবনের অংশ, পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে নাটক দেখত, চরিত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করত—সেই সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন আতাউর রহমান। তিনি এমন এক অভিনয়ভাষা নির্মাণ করেছিলেন, যা একই সঙ্গে শিল্পসম্মত এবং সহজবোধ্য। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শহরের সংস্কৃতিমনা দর্শক—সবাই তাঁকে নিজেদের মানুষ বলে মনে করতেন।
তাঁর অভিনয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল মানবিকতা। তিনি যখন কোনো দরিদ্র মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তখন সেই চরিত্রের কষ্ট সত্যি মনে হয়েছে। যখন তিনি একজন পিতার চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তখন তাঁর চোখে আমরা দেখেছি সন্তানের প্রতি গভীর মমতা। আবার কোনো প্রতিবাদী চরিত্রে তিনি হয়ে উঠেছেন অত্যন্ত দৃঢ় ও সাহসী। তাঁর অভিনয়ের এই বহুমাত্রিকতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
আতাউর রহমানের অবদান কেবল অভিনয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নাট্যনির্মাতা, নির্দেশক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের নানা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন। তিনি নতুন শিল্পীদের উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছেন নাট্যচর্চার দায়িত্ব। তাঁর কাছে শিল্প কোনো ব্যক্তিগত অহংকারের বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চা। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তিনি ছিলেন এক জীবন্ত শিক্ষালয়। তাঁর সঙ্গে কাজ করা অনেক অভিনেতা ও নাট্যকর্মী বারবার বলেছেন, তিনি কখনও কাউকে ছোট করতেন না। বরং ধৈর্যের সঙ্গে বুঝিয়ে দিতেন অভিনয়ের সূক্ষ্মতা। একজন চরিত্র কীভাবে হাঁটে, কীভাবে কথা বলে, কীভাবে নীরব থাকে—এসব ছোট ছোট বিষয়েও তাঁর ছিল গভীর মনোযোগ। তিনি জানতেন, বড় শিল্পী হতে হলে প্রথমে বড় মানুষ হতে হয়।
বাংলা নাটকের ইতিহাসে মঞ্চনাটকের গুরুত্ব অপরিসীম। আর মঞ্চে আতাউর রহমান ছিলেন সত্যিকার অর্থেই “মঞ্চরাজ”। মঞ্চে তাঁর প্রবেশ, সংলাপ উচ্চারণ, দেহভঙ্গি—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের রাজসিক আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস কখনও অহংকারে পরিণত হয়নি। বরং তিনি মঞ্চকে দেখতেন এক পবিত্র জায়গা হিসেবে। তাঁর কাছে মঞ্চ ছিল মানুষের আত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক শিল্পময় মাধ্যম।
একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য কি শুধুই জনপ্রিয়তা, পুরস্কার কিংবা দীর্ঘ কর্মজীবন? বরেণ্য নাট্যজন আতাউর রহমান–এর জীবন আমাদের ভিন্ন এক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য হলো মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেওয়া। কারণ জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে, পুরস্কারের জৌলুস একদিন ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও স্মৃতিতে বেঁচে থাকা শিল্পী কখনও হারিয়ে যান না। আতাউর রহমান সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যিনি অভিনয়ের মাধ্যমে শুধু বিনোদন দেননি, মানুষের অনুভূতিকেও স্পর্শ করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল জীবনের সরলতা, মাটির গন্ধ এবং গভীর মানবিকতা। কখনও তিনি দর্শককে হাসিয়েছেন, কখনও কাঁদিয়েছেন, আবার কখনও সমাজ ও মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছেন। তাঁর প্রতিটি চরিত্র যেন বাস্তব জীবনের মানুষেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠত।
আজকের সময়ে, যখন নাটক ও শিল্প ক্রমশ বাণিজ্যিক চাপে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, যখন শিল্পমানের চেয়ে জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন আতাউর রহমানের জীবন ও কাজ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সত্যিকারের শিল্প কখনও সহজ জনপ্রিয়তার জন্য নিজের গভীরতা বা সততা বিসর্জন দেয় না। বরং শিল্পের মানবিক শক্তি, নান্দনিকতা এবং শিল্পীর আন্তরিকতাই তাকে মানুষের মনে দীর্ঘদিন জীবিত রাখে। এই কারণেই আতাউর রহমান শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি বাংলা নাট্যাঙ্গনের এক অবিস্মরণীয় মানবিক মুখ।
তাঁর প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। কারণ কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের বিকল্প হয় না। তাঁরা একটি সময়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। আতাউর রহমান ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি সেই প্রজন্মকে, যারা শিল্পকে সত্যিকারের ভালোবাসতেন, শিল্পের জন্য জীবন উৎসর্গ করতেন। তাঁর জীবন আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো শুধু নাটকের চরিত্র নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। বহু মানুষ আজও তাঁর অভিনয়ের দৃশ্য মনে করতে পারেন, তাঁর সংলাপ স্মরণ করতে পারেন। এটাই একজন শিল্পীর অমরত্ব। মানুষ মারা যায়, কিন্তু শিল্প বেঁচে থাকে।
বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে তাঁর অবদান নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের তাঁর অভিনয়ভঙ্গি, নাট্যদর্শন এবং সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে পড়াশোনা করা দরকার। কারণ তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। তাঁর ব্যক্তিজীবনের সরলতাও মানুষের কাছে তাঁকে আরও প্রিয় করে তুলেছিল। খ্যাতি পাওয়ার পরও তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেননি। তাঁর কথাবার্তা, চলাফেরা, মানুষের সঙ্গে আচরণ—সবকিছুতেই ছিল আন্তরিকতা। এই মানবিক গুণই তাঁকে প্রকৃত অর্থে বড় মানুষে পরিণত করেছিল।
আজ যখন আমরা তাঁর স্মৃতির সামনে দাঁড়াই, তখন মনে হয় বাংলা নাটকের এক বিশাল বৃক্ষ যেন হঠাৎ উপড়ে গেছে। কিন্তু সেই বৃক্ষের ছায়া রয়ে গেছে আমাদের সংস্কৃতির ভেতরে। তাঁর অভিনয়, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর শিক্ষা আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে। একজন শিল্পী কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যান না। তিনি থেকে যান তাঁর কাজের মধ্যে, মানুষের স্মৃতির মধ্যে, সময়ের ভেতরে। আতাউর রহমানও তেমনি থেকে যাবেন। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো তরুণ অভিনেতা তাঁর অভিনয় দেখে অনুপ্রাণিত হবে। হয়তো কোনো দর্শক পুরোনো নাটকের দৃশ্য দেখে আবারও আবেগে ভেসে যাবেন। হয়তো কোনো মঞ্চকর্মী তাঁর নাম উচ্চারণ করে নতুন স্বপ্ন দেখবেন।
এই মহান শিল্পীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। বাংলা নাট্যাঙ্গনে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—শিল্প কেবল অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সত্যিকারের শিল্প মানুষের হৃদয়ে মানবতার আলো জাগিয়ে তোলে। আর সেই আলো কখনও নিভে যায় না।
মন্তব্য করুন

