Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

দাম বাড়ছেই, গরিব ও মধ্যবিত্তের সংসারে টানাটানি

বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ছেই, গরিব ও মধ্যবিত্তের সংসারে টানাটানি

মত-দ্বিমত

দাম বাড়ছেই, গরিব ও মধ্যবিত্তের সংসারে টানাটানি

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

জিনিসপত্রের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। চাল, ডাল থেকে শুরু করে তেল, চিনি, আটা, ময়দা, দুধ, ডিম, মসলা—সবকিছুর দাম বাড়তি। বাজারে গেলে মনে হয় যেন আগের সপ্তাহের তুলনায় সবকিছু আরও একটু বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। রোজকার নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থেমে নেই, বর্ষার ব্যাঙের মতো একটানা লাফ দিয়ে চলেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। খরচের বাজেট বারবার কাটছাঁট করেও হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে। দুইবেলা পেট ভরে খেতে পারবেন কি না, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ কোথা থেকে জোগাবেন, মাস শেষে বাসাভাড়া দেওয়ার টাকা থাকবে কি না—এসব ভাবনায় জেরবার এখন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা। অবশ্য তাদের কথা আর কে-ই বা ভাবে? মধ্যবিত্ত এবং নিম্নআয়ের এই মানুষেরা নীরবেই কষ্ট সহ্য করে যান। কোনো প্রতিবাদ নেই, কোনো দাবি নেই—শুধু আছে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই।

এ দফায় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে জ্বালানি তেল। ক্রমাগত সংকটের মুখে এপ্রিলের শেষে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। তাতে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৫ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা, অকটেনে ২০ টাকা ও পেট্রলে ১৯ টাকা দাম বেড়েছে। এসব জ্বালানির দাম বাড়ায় গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে। এর আগে দুই দফায় সিলিন্ডারের গ্যাসের দাম কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা বেড়েছে। এতে বাসাবাড়িতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ৬০০ টাকা দাম বেড়েছে। তবে বাজারে এর চেয়ে বাড়তি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হয়। এতে করে মধ্যবিত্তরা চরম সংকটে পড়েছে। কিছুদিন আগেও যে টাকায় সংসারের খরচ চলত, এখন কিছুতেই তা আর হয় না। খাদ্যতালিকা থেকে মাছ, মাংস বাদ দিলেও হিসাব মেলে না—মাস শেষে ঘাটতি থেকেই যায়। ফলে ধার-দেনা করেই জীবন চালাতে হয়। দেশের কোটি কোটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার বর্তমানে একই চাপের মধ্যে রয়েছে। আয় বাড়ে না, অথচ ব্যয় বাড়ে। এই চাপের মূল কারণ মূল্যস্ফীতি—যা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে প্রায় ৯.৮ শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর ধরেই জিনিসপত্রের দাম লাগামছাড়া। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যায়। এই যুদ্ধ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিঘ্নিত করে, যার ফলে গম, ভোজ্যতেল, পশুখাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে এসে পড়ে। সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ জ্বালানি বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে জিনিসপত্রের দামে।  

আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক কারণের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও কৃত্রিম সংকটও একটি বড় সমস্যা। বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দীর্ঘদিনের সংকট তার একটি বড় উদাহরণ। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়াতে চাইলেও নীতিগত জটিলতার কারণে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, ফলে বাজারে এক ধরনের অস্বচ্ছতা তৈরি হয়। এতে ভোক্তারা পণ্য না পেয়ে কিংবা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। এই তিনটি কারণ একসঙ্গে যোগ হয়ে একটি সংকট তৈরি করেছে। মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের অংশ হয়ে উঠেছে।

গত এক সপ্তাহেই মোটা ও মাঝারি চাল, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। দুই মাসের ব্যবধানে বেড়েছে সাবান, ডিটারজেন্ট, সুগন্ধি চালের দাম। মাছ ও মাংসের বাজারেও একই প্রবণতা—রুই, তেলাপিয়া, পাঙাশ, গরুর মাংস—সবই এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক প্রোটিনের উৎসগুলোর দাম বৃদ্ধি। ডিম, যা সাধারণ মানুষের সবচেয়ে সহজলভ্য প্রোটিন, তার দাম গত দুই সপ্তাহে ডজনে প্রায় ৪০ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। সোনালি মুরগির দাম গত বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। মাছের দামও এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য তা প্রায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এর মানে হলো—মানুষ কেবল কম খাচ্ছে না, বরং কম পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে। সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। মৌসুমি সরবরাহ বাড়লেও দাম কমছে না, কারণ পরিবহন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে আলু ছাড়া প্রায় কোনো সবজি ৫০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। বেশির ভাগ সবজির দাম ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।

‘এত খরচ সামলাব কেমনে’—এটি বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষের আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাস্তবে অনেক পণ্যের দাম তার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। কিন্তু আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অর্থাৎ একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কেনা যাচ্ছে। এই অবস্থাকে অর্থনীতিতে ‘বাস্তব আয়ের অবক্ষয়’ বলা হয়। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নির্দিষ্ট বা স্থির আয়ের মানুষের ওপর—যেমন চাকরিজীবী, গৃহকর্মী, ছোট ব্যবসায়ী।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে ‘লাল’ তালিকায় রাখা হয়েছে। সহজ করে বললে, খাবারের দাম বাড়ার চাপ এখনও কমেনি—বরং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, জ্বালানির দাম আর ডলারের চাপ মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)-র জরিপ বলছে, শহরের নিম্নআয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একদিন কম খেতে হচ্ছে। অর্থাৎ, বিষয়টা শুধু পরিসংখ্যান নয়—এটা সরাসরি মানুষের জীবনের সংকট।

এই অবস্থায় কী করা দরকার? প্রথমত, বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। চাঁদাবাজি, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো—এসব কঠোরভাবে ঠেকাতে হবে। একই সঙ্গে ন্যায্যমূল্যের দোকান, টিসিবির কার্যক্রম আর ভর্তুকি বাড়িয়ে গরিব মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

মাঝামাঝি সময়ে সবচেয়ে দরকার সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক করা। পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ কমাতে রাস্তা-ঘাট ও পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। দরকার হলে আমদানিতে কিছু শুল্ক কমানো যেতে পারে, আর কৃষকদের বেশি সহায়তা দিতে হবে যাতে উৎপাদন বাড়ে। বাজারে স্বচ্ছতা আনতেও কাজ করতে হবে—ডিজিটালভাবে দামের তথ্য প্রকাশ করলে মানুষ বুঝতে পারবে কোথায় কী দামে কী বিক্রি হচ্ছে, এতে অযৌক্তিক দাম বাড়ানোর সুযোগ কমবে।

দীর্ঘমেয়াদে সমাধান একটাই—উৎপাদন বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই চাষাবাদ, ভালো সংরক্ষণ ব্যবস্থা—এসব নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প বাড়ানো, গ্রামে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করা এবং মানুষের আয় বাড়ানো—এই সব মিলেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সত্যিকারের বাড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা, এই পুরো সমস্যার কেন্দ্রে আছে মানুষ। অর্থনীতির হিসাব তখনই অর্থবহ, যখন মানুষের থালায় খাবার বাড়ে, শিশুদের পুষ্টি ঠিক থাকে, আর পরিবারকে ঋণের দুশ্চিন্তায় থাকতে না হয়। শুধু কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে লাভ নেই, যদি মানুষের জীবন সহজ না হয়।

আজকের বাংলাদেশ একটা কঠিন সময় পার করছে। মূল্যস্ফীতি শুধু পকেটের চাপ বাড়াচ্ছে না, ধীরে ধীরে মানুষের স্বাস্থ্য, পুষ্টি আর মানসিক অবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই এটাকে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা ভাবলে ভুল হবে—এটা একই সঙ্গে সামাজিক ও মানবিক সংকট।

এখন দরকার স্পষ্ট লক্ষ্য: এমন একটা দেশ গড়া, যেখানে বাজারের দামের ওঠানামা মানুষের জীবনকে বিপদে ফেলবে না; যেখানে মানুষ অন্তত স্বস্তি ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে, আর মূল্যস্ফীতি তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেবে না।

কিন্তু সরকারের কী এ ব্যাপারে আদৌ কোনো উদ্যোগ আছে?

মন্তব্য করুন

Logo