Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা

ইসরায়েলি হামলায় দক্ষিণ লেবাননের বহু স্কুল ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

দশদিগন্ত

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা

যেভাবে অন্ধকারে হারাচ্ছে একটি প্রজন্ম

Icon

শুভ্র মিসির

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০১:২২ এএম

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এবং ইরানে ইসরায়েলের হামলা ও যুদ্ধে সবার নজর। গাজা এবং ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও লেবাননে থামছে না হামলা। ইসরায়েলের সঙ্গে লেবাননের দক্ষিণ অংশের সীমানা ১২০ কিলোমিটার জুড়ে। মূলত দক্ষিণ লেবাননের ক্ষমতা শিয়া ইসলামপন্থি সশস্ত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দল হিজবুল্লাহর হাতে। হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করতেই লেবাননে চলছে ইসরায়েলি হামলা।
মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে লেবাননে হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ, আহত হয়েছেন প্রায় নয় হাজার। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা তথা অসম এ যুদ্ধের দামামার মধ্যে সবাই যখন মৃতদেহ আর আহত মানুষের হিসেব কষছে, তখন বেঁচে থাকা শিশু, কিশোর ও তরুণদের খোঁজ রাখেই বা কয়জনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির সমাজ ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে মূলত একটি ‘হারানো প্রজন্ম’ তৈরি হচ্ছে। বলছি দেশটির শিক্ষার্থীদের কথা। যেখানে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাই যুদ্ধ সেখানে লেখাপড়ার কথা চিন্তা করাও যেন বিলাসিতা। যার ফলে দেশটিতে বাড়ছে সামাজিক বৈষম্য এবং নষ্ট হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। আগামী কয়েক দশক যার ভার বইতে হবে লেবাননের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে। 
ইসরায়েলি হামলায় দক্ষিণ লেবাননের বহু স্কুল ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী। এছাড়াও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এতে আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত লেবাননের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও গভীর সংকটে পড়েছে। যদিও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে লেবাননের অনেক স্কুল অনলাইন শিক্ষা ও বিকল্প কর্মসূচি চালু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহু শিক্ষার্থী এখনও এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। 

 মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামলায় লেবাননে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, ছবি: সংগৃহীত

গত ২ মার্চ, দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননে ইসরায়েল হামলার তীব্রতা বেড়েছে। এর আগে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশি হামলা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রায় এক মাস আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশজুড়ে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। দেশটির জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিষদের তথ্যমতে, একই সময়ে ১০ হাজার ছয়শরও বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামলায় লেবাননে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫ লাখ স্কুলপড়ুয়া শিশু। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বহু স্কুলও এখন আর ব্যবহারযোগ্য নয়। সংস্থাটির তথ্য মতে, লেবাননের ৩৩৯টি স্কুল বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে। আরও শত শত স্কুল বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যার ফলে অতিরিক্ত আরো আড়াই লাখ শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া আরও প্রায় ১০০টি স্কুল উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলোর কার্যক্রমও যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। 
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে চলে যাওয়ায় কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন শিক্ষায় ঝুঁকেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্রপীড়িত পরিবারগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা তেমন একটা কার্যকর নয়। কারণ ২০১৯ সাল থেকে শুরু করে একের পর এক সংকট যেমন—গণআন্দোলন, কোভিড-১৯ মহামারি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং বর্তমান যুদ্ধের কারণে প্রতি বছরই শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব বিশ্ব বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আসফারি ইনস্টিটিউটের গবেষক তালা আবদুল গনির মতে, ‘চলমান অস্থিরতার ফলে হাইব্রিড শিক্ষা কার্যক্রম লেবাননের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইন্টারনেটের সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎ সংকট, প্রযুক্তির অভাব ও অনিশ্চিত জীবনযাপনের কারণে এটি বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন কার্যকর হবে না।’ যদিও লেবাননের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউনেস্কো যৌথভাবে কিছু বিকল্প উদ্যোগ নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সরকারি স্কুলে একাধিক শিফটে ক্লাস চালু করা, অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা। ইউনেস্কোর শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মায়সুন চেহাব মনে করেন, ‘শিশুরা তাদের স্বাভাবিক জীবন, বন্ধুত্ব, নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন অভ্যাস হারাচ্ছে। বারবার বাস্তুচ্যুতি, সহিংসতা, ভয় ও অনিশ্চয়তা তাদের মনে গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করছে।’
যদিও এসব সমস্যা এবং সংকট কাটিয়ে উঠতে লেবাননের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দেশটিতে চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বাস্তুচ্যুত দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে নিজেদের সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ চেহাব বলছেন, ‘যুদ্ধতাড়িত এলাকাগুলোয় দারিদ্র্য ভয়াবহভাবে বেড়েছে। পরিবারগুলোকে খাবার খরচ, যাতায়াতসহ বেঁচে থাকার আবশ্যিক বিষয়াদির পাশাপাশি সন্তানের অনলাইন শিক্ষার খরচের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে। ফলে তারা প্রয়োজনীয় বিষয়েই শুধু খরচ করছে। শিক্ষা বিষয়ক খরচ তখন বাড়তি বোঝা মনে হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী স্কুল ছাড়ছে, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহও বাড়ছে।’ তার মতে, ‘এমন বাস্তবতায় বিশ্বজুড়েই শিক্ষাখাতে জরুরি সহায়তা কমে যাচ্ছে।’
যদিও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই লেবাননের শিক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অর্থনৈতিক সংকটে দেশটির মধ্যবিত্ত শ্রেণি মূলত ভেঙে পড়েছে। ব্যাপকভাবে বেড়েছে আয়ের বৈষম্যও। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১ সালে লেবাননের গিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৩২, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে শূন্য দশমিক ৬১ হয়েছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যমূলক দেশের শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে ছিল লেবানন। 
আসফারি ইনস্টিটিউটের আবদুল গনি বলেন, ‘এখন শিক্ষার সুযোগ নির্ভর করছে শিশুটি কোথায় থাকে এবং তার পরিবারের আর্থিক অবস্থার ওপর। দক্ষিণ লেবাননে বহু শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে পুরোপুরি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।’
এদিকে যুদ্ধের কারণে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের অবস্থাও তথৈবচ। যুদ্ধে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে শিক্ষার্থীরা থাকলেও শিক্ষকরাও ভয়াবহ সংকটে আছেন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি মাধ্যমের শিক্ষকরা ন্যায্য বেতনের দাবিতে আন্দোলন করছেন। অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে তাদের বেতন প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। অনেক শিক্ষক দেশ ছেড়েছেন বা পেশা বদলেছেন।
এ অবস্থায় মায়সুন চেহাবের ভাষ্য, ‘শিক্ষকরা শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড, অথচ তারাই সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন। যুদ্ধের কারণে বহু শিক্ষকও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং জীবনের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। কোনো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো একটি বড় সংকট সামাল দিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু লেবানন বছরের পর বছর ধরে একের পর এক সংকটের মুখে রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবাননের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী রিমা কারামি দক্ষ হলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক সংকট ও মানবিক সহায়তার ঘাটতির কারণে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা তার জন্য বেশ কঠিন। সার্বিক বিষয়ে আবদুল গনি সতর্ক করছেন এই বলে, ‘সারা দেশে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে এবং লেবাননের পুরো একটি প্রজন্ম আরও পিছিয়ে পড়বে।’

(আল-জাজিরা অবলম্বনে)

মন্তব্য করুন

Logo