Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

ইরান যুদ্ধের সময় নেতানিয়াহুর গোপন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের দাবি; আবুধাবির অস্বীকার

দশদিগন্ত

ইরান যুদ্ধের সময় নেতানিয়াহুর গোপন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের দাবি; আবুধাবির অস্বীকার

Icon

সাঈদ হাসান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ১২:০২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নতুন এক উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। এই সংঘাতের আবহে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুর কথিত গোপন সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে ইজরায়েল দাবি করছে, এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে; অন্যদিকে ইউনাইটেড আরব আমিরাত সরাসরি তা অস্বীকার করে একে “ভিত্তিহীন” বলছে। গোপন কূটনীতি, গোয়েন্দা সহযোগিতা, ইরানবিরোধী সমন্বয় এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ড-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। টাইমস অব ইসরায়েল অবলম্বনে লিখেছেন সাঈদ হাসান।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি জানান, ইরানের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক গোপন সফর করেছিলেন এবং দেশটির নেতা প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই বৈঠকের ফলে ইসরায়েল এবং আবুধাবির সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি "ঐতিহাসিক মাইলফলক" অর্জিত হয়েছে।

একটি সূত্রের দেওয়া তথ্যমতে, নেতানিয়াহু এবং বিন জায়েদ ২৬ মার্চ ওমান সীমান্তের কাছে আল-আইনে মিলিত হয়েছিলেন। তাদের সেই বৈঠক বেশ কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, নেতানিয়াহুর এই গোপন সফরের ফলে যুদ্ধের সময় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ইসরায়েলের প্রধান দুটি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেতের প্রধানরাও আমিরাতে গোপন সফর করেছিলেন। 

সংযুক্ত আরব আমিরাত এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। আবুধাবি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বক্তব্যকে "সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন" বলে অভিহিত করেছে। 

আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে- "সংযুক্ত আরব আমিরাত আবারও নিশ্চিত করছে যে, ইসরায়েলের সাথে আমিরাতের সম্পর্ক জনসমক্ষে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হয়। এটি কোনো অস্বচ্ছ বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে নয়।"

আমিরাত আরও যোগ করেছে যে, দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করা পর্যন্ত যে কোনো অঘোষিত সফর বা অপ্রকাশিত ব্যবস্থার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তারা সংবাদমাধ্যমগুলোকে নির্ভুল ও পেশাদার হওয়ার এবং যাচাই না করা তথ্য বা বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে আমিরাতের এই অস্বীকারের জবাবে নেতানিয়াহুর তৎকালীন মুখপাত্র জিভ আগমন জোর দিয়ে বলেছেন যে, তার সাবেক বসের দেওয়া তথ্যটি সত্য।

জিভ আগমন আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির জবাবে ফেসবুকে লিখেছেন-- "যিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ভালো করে চেনেন এবং সেখানে দীর্ঘকাল বসবাস করেছেন এবং যিনি আজ পর্যন্ত অত্যন্ত গোপন রাখা সেই ঐতিহাসিক সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী ছিলেন, এমন একজন হিসেবে আমি বলতে পারি যে প্রধানমন্ত্রীকে আবুধাবিতে রাজকীয় সম্মানে গ্রহণ করা হয়েছে"। 

জিভ আরও লিখেছেন, "শেখ [মোহাম্মদ] বিন জায়েদ, তার পরিবারের সদস্যরা এবং অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আমাদের স্বাগত জানিয়েছেন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে তাদের মাটিতে দেখে খুশি হয়েছেন।" 

"শেখ বিন জায়েদ প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে নিজের গাড়িতে করে প্রধানমন্ত্রীকে বিমান থেকে প্রাসাদে নিয়ে গেছেন।"

"প্রধানমন্ত্রী এই চমৎকার সফরের সময় যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা আগামী কয়েক প্রজন্ম ধরে আলোচিত হবে। একটি বিশাল সাফল্য," বলেছেন জিভ আগমন।

এদিকে, ইরান বলেছে যে তারা নেতানিয়াহুর আবুধাবিতে এই তথাকথিত সফরের কথা জানত।

"নেতানিয়াহু এখন প্রকাশ্যে তা-ই প্রকাশ করেছেন যা ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক আগেই আমাদের নেতৃত্বকে জানিয়েছিল," ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন। 

আরাগচি আরও বলেন, "ইরানের মহান জনগণের সাথে শত্রুতা একটি বোকামিপূর্ণ বাজি। আর ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতার জন্য ইসরায়েলের সাথে হাত মেলানো  অমার্জনীয়। যারা বিভেদ সৃষ্টির জন্য ইজরায়েলের সাথে যোগসাজশ করছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।"

২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে আবুধাবির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পর এটিই সংযুক্ত আরব আমিরাতে নেতানিয়াহুর প্রথম সফর, কারণ আগের প্রত্যাশিত সফরগুলো সফল হয়নি।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে ষষ্ঠবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিন পর তার দপ্তর আবুধাবি সফরের ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু উগ্রপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের টেম্পল মাউন্ট সফরের জেরে ক্ষুব্ধ হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সেই সফর বাতিল করে দিয়েছিল।

সেই সময়ে একজন ঊর্ধ্বতন আরব কূটনীতিক 'দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল'-কে বলেছিলেন যে, সফর স্থগিত করার সিদ্ধান্তের পেছনে আংশিক কারণ ছিল এই আশঙ্কা যে, নেতানিয়াহু আমিরাতের মাটিতে থাকাকালীন সেই সুযোগটি ইরানকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সেই সময়ে তেহরানের সাথে উত্তেজনা কমাতে এবং সম্পর্কের উন্নতির চেষ্টা করছিল—কিন্তু সেই প্রচেষ্টাগুলো খুব একটা কাজে আসেনি যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি, যৌথ মার্কিন-ইজরায়েলি অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই দেশটির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বর্ষণ শুরু করে।

২০২২ সালের ঘোষিত সফর বাতিলের পর ২০২৩ সালের নভেম্বরে দুবাইতে 'COP28' জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সাথে নেতানিয়াহুকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে, এর এক মাস আগে ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত সেখানে যাননি।

২০২০ সালের আগস্টে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ড' স্বাক্ষরের পর কিছু অসমর্থিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে নেতানিয়াহু ২০১৮ সালে গোপনে এই উপসাগরীয় দেশটি সফর করেছিলেন, যদিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

আব্রাহাম অ্যাকর্ড-পরবর্তী বছরগুলোতে জেরুজালেম ও আবুধাবি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে এলেও ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রচেষ্টাগুলো নাটকীয়ভাবে আরও শক্তিশালী হয়েছে।

অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, দুটি দেশ ইরানের ওপর সমন্বিত আক্রমণ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করা এবং ইরানে আক্রমণের জন্য টার্গেট নির্বাচনের ক্ষেত্রে একসাথে কাজ করেছে।

এর আগে গত বুধবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল' রিপোর্ট করেছে যে মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া সামরিক কার্যক্রম সমন্বয় করতে যুদ্ধের সময় অন্তত দুবার এই উপসাগরীয় রাষ্ট্র সফর করেছেন।

আলাদাভাবে, শিন বেত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান ডেভিড জিনি দুই দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ইউএই সফর করেছেন বলে 'কান' পাবলিক ব্রডকাস্টার রিপোর্ট করেছে।

এই সপ্তাহের শুরুর দিকে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা আগের রিপোর্টগুলো নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ইজরায়েল যুদ্ধের সময় ইউএই-তে একটি 'আয়রন ডোম' ব্যাটারি এবং সেটি পরিচালনার জন্য সৈন্যও পাঠিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত পুরো যুদ্ধজুড়ে ইরানের পক্ষ থেকে ভারী আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে বেশ কয়েকবার হামলার মুখে পড়েছে।

আমিরাতি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, তেহরান এই দেশটির দিকে মোট প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং দুই হাজার ২০০-রও বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, যা দেশটিকে ইসরায়েলসহ এই অঞ্চলের সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেশে পরিণত করেছে। 

মন্তব্য করুন

Logo