চোখ নেই যার, সে-ই এখন নদীর চোখ!
আরাফাত ইসলাম
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
আজ আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি যখন ফিরে আসে, তখন আমাদের চারপাশের চেনা পরিবেশের অনেক হারিয়ে যাওয়া বা বিপন্ন প্রাণীর মুখ ভেসে ওঠে। তেমনই এক বিপন্ন অবয়বের নাম ‘শূশুক’ বা গাঙ্গেয় ডলফিন। এটি কেবল আমাদের জাতীয় জলজ প্রাণীই নয়, বরং আমাদের নদীমাতৃক সংস্কৃতির এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এক সময় পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা হালদা নদীর বুকে দলবেঁধে এদের লাফিয়ে বেড়ানোর দৃশ্য ছিল খুবই চেনা। অথচ আজ প্রকৃতির এই অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টিটি আমাদের নদীগুলো থেকে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে।
শূশুকের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো ওরা সম্পূর্ণ অন্ধ। আলো-আঁধারির এই পৃথিবীতে চোখ দিয়ে দেখার কোনো সুযোগ ওদের নেই। তাহলে নদীর ঘোলা পানিতে ওরা পথ চলে কীভাবে, শিকারই বা করে কীভাবে? প্রকৃতি ওদের দিয়েছে এক অনন্য উপহার, যার নাম ‘ইকোলケーション’ বা প্রতিধ্বনি-পদ্ধতি। মুখ থেকে এক ধরনের বিশেষ আল্ট্রাসনিক শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করে এবং সেই শব্দের প্রতিধ্বনি শুনে ওরা নদীর তলদেশের নিখুঁত মানচিত্র এঁকে ফেলে মনের ভেতর। বিবর্তনের এই অবিশ্বাস্য মেকানিজম বিজ্ঞানীদের আজও মুগ্ধ করে।
পরিবেশবিজ্ঞান ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের গবেষকদের কাছে এই শূশুক বা ডলফিন কেবল একটি প্রাণী নয়; এটি হলো নদীর স্বাস্থ্যের এক নীরব নির্দেশক। সহজ কথায়, একটি নদী কতটা দূষণমুক্ত এবং তার বাস্তুসংস্থান কতটা ভারসাম্যপূর্ণ, তা বোঝা যায় সেই নদীতে শূশুকের উপস্থিতি দেখে। নদী যদি সুস্থ থাকে, তবেই শূশুক টিকে থাকবে। আর নদী যদি মরতে বসে, তবে সবার আগে বিদায় নেবে এই নিরীহ প্রাণীরা। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশের নদীগুলোতে এখন দ্বিতীয় ঘটনাই ঘটছে। তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া মানে হলো আমাদের সুপেয় পানির উৎস এবং সামগ্রিক জলজ পরিবেশ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।
বাস্তবতা হলো, মানুষের তৈরি কিছু সুনির্দিষ্ট আর ক্রমাগত আঘাতের কারণেই আজ শূশুক বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য এবং শহরের পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে মেশার ফলে পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এর সাথে যোগ হয়েছে যত্রতত্র অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদী থেকে অতিরিক্ত পানি প্রত্যাহারের নিষ্ঠুরতা, যার কারণে নদীগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাচ্ছে এবং ডলফিনদের অবাধ বিচরণের পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে পড়ছে।
একই সাথে, নদীতে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক নৌযান চলাচল করায় যে তীব্র শব্দদূষণ তৈরি হচ্ছে, তা শূশুকের একমাত্র ভরসা—সেই শব্দ-তরঙ্গ ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। আর সবশেষে রয়েছে অসচেতন জেলেদের কারেন্ট জাল বা ফাঁদ, যাতে আটকা পড়ে প্রতি বছর বহু প্রাণ হারাচ্ছে এই জলজ স্তন্যপায়ীটি।
শূশুক বা গাঙ্গেয় ডলফিন রক্ষা করা মানে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রজাতিকে বাঁচানো নয়; এটি আসলে আমাদের নদীগুলোকে বাঁচানোর দীর্ঘমেয়াদি লড়াই। কারণ এই নদীগুলোর ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতি। নদী যদি তার জীববৈচিত্র্য হারায়, তবে তার চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে আমাদের মানবসমাজকেই।
তাই আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবসে আমাদের কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শূশুক ও নদী সুরক্ষার বিষয়টিকে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তৃণমূলের জনসচেতনতার মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে। নদীপাড়ের মানুষ ও জেলেদের এই সুরক্ষাকাজে সরাসরি অংশীদার করতে হবে। আসুন, আমাদের অবহেলায় এই অনন্য জলজ প্রাণীকে আমরা শুধু পত্রিকার পাতার কোনো ‘হারিয়ে যাওয়া শিরোনাম’ হতে না দিই। নদী বাঁচলে শূশুক বাঁচবে, আর নদী সুস্থ থাকলে নিরাপদ থাকবে আমাদের আগামী প্রজন্ম।
আরাফাত ইসলাম : শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
মন্তব্য করুন

