Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

চিতা বিড়াল

বনভূমি উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে চিতা বিড়াল, ছবি: সংগৃহীত

ফিচার

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী

চিতা বিড়াল

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১১:২৮ এএম

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর শ্রীমঙ্গল বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। পাহাড়, টিলা, চা-বাগান আর ঘন বনাঞ্চল মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে এখনও টিকে আছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। কিন্তু প্রকৃতির সেই নীরব বাসিন্দারাই এখন সবচেয়ে বেশি সংকটে। বনভূমি উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে প্রতিনিয়ত মানুষ ও বন্যপ্রাণীর দূরত্ব কমে আসছে। আর সেই সংকটেরই আরেকটি করুণ উদাহরণ সামনে এলো সম্প্রতি, যখন শ্রীমঙ্গলে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো একটি মহাবিপন্ন চিতা বিড়াল।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের টি রিসোর্ট অ্যান্ড মিউজিয়াম সংলগ্ন এলাকায় প্রাণীটিকে প্রথম দেখতে পান স্থানীয় দুই যুবক জাহান আহমেদ ও মোহাম্মদ মিলন। সড়কের পাশে প্রায় নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে থাকা প্রাণীটিকে দেখে তারা প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পরে কাছ থেকে বুঝতে পারেন, এটি সাধারণ কোনো বিড়াল নয়। ধারণা করা হচ্ছে, দ্রুতগতির কোনো যানবাহনের ধাক্কায় প্রাণীটি গুরুতর আহত হয়েছিল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও কয়েকজন পরিবেশকর্মী। তারা নিশ্চিত করেন, আহত প্রাণীটি একটি চিতা বিড়াল।

প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে প্রাণীটিকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেটি কিছুটা সুস্থ হলেও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে তাৎক্ষণিক পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সুস্থ করে প্রাণীটিকে আবার বনাঞ্চলে অবমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে।

চিতা বিড়াল মূলত বন্য বিড়ালজাতীয় প্রাণী। বৈজ্ঞানিক নাম প্রিওনাইলুরাস বেঙ্গালেনসিস। আকারে এটি গৃহপালিত বিড়ালের চেয়ে কিছুটা বড় হলেও আচরণে অনেক বেশি চতুর ও বন্য। শরীরে চিতার মতো ছোপ ছোপ দাগ থাকার কারণেই এর নাম হয়েছে চিতা বিড়াল। রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে শিকার করা, গাছে চড়ার দক্ষতা এবং দ্রুত চলাফেরার কারণে এটি অত্যন্ত দক্ষ শিকারি হিসেবে পরিচিত।

একসময় বাংলাদেশের বিভিন্ন বনাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, হাওরপাড় ও জলাভূমির আশপাশে চিতা বিড়ালের দেখা পাওয়া যেত। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, সুন্দরবন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে এদের বিচরণ ছিল। তবে বর্তমানে তাদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বনভূমি সংকুচিত হওয়ায় চিতা বিড়াল এখন প্রায়ই লোকালয়ে চলে আসছে। কখনও খাবারের সন্ধানে, কখনও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। আর তখনই তারা মানুষের হাতে নিহত হচ্ছে অথবা সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিতা বিড়াল প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। এটি মূলত ইঁদুর, ছোট পাখি, টিকটিকি ও ক্ষুদ্র প্রাণী শিকার করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কৃষিজমিতে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও এদের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু মানুষের অজ্ঞতা ও ভয় অনেক সময় এই প্রাণীটির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই চিতা বিড়ালকে হিংস্র মনে করে হত্যা করে, যদিও মানুষের ওপর আক্রমণের ঘটনা প্রায় নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন থাকলেও বাস্তবে বনভূমি ধ্বংস ও অবৈধ দখল বন্ধ করা যাচ্ছে না। চা-বাগান সম্প্রসারণ, পাহাড় কাটা, অবৈধ কাঠ সংগ্রহ এবং সড়ক নির্মাণের কারণে বনাঞ্চল খণ্ডিত হয়ে পড়ছে। ফলে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের পথও হারিয়ে যাচ্ছে। শ্রীমঙ্গলের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, শুধু আহত প্রাণী উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন বন সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা, সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই পরিবেশের ভারসাম্যের অংশ। 

বাংলাদেশের বনভূমি একসময় বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় ছিল। এখন সেই বনই ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। আর বন ছোট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাতও বাড়ছে। আহত চিতা বিড়ালটির অসহায় চোখ যেন সেই হারিয়ে যেতে বসা প্রকৃতিরই নীরব আর্তনাদ।

মন্তব্য করুন

Logo