আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান, ছবি: সংগৃহীত
সাঈদ হাসান
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১১:১৪ এএম
২০১১ সালে কাজাখস্তানের ২২ বছর বয়সী এক পোস্ট গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট সায়েন্স জার্নালের পেওয়াল (টাকা দিয়ে পড়ার নিয়ম) দেখে এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে, তিনি ৮ কোটি ৮০ লাখ বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র সমৃদ্ধ একটি পাইরেটেড ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেলেন। গত মাসে তিনি পুরো জিনিসটিকে একটি এআই চ্যাট বটে রূপান্তর করেছেন, যেখানে আপনি কেবল একটি প্রশ্ন করলেই উত্তর হিসেবে সরাসরি মূল গবেষণাপত্রটি পেয়ে যাবেন।
ওই তরুনীর নাম আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান, আর তার ওয়েবসাইটটির নাম 'সাই-হাব'।
তিনি সম্প্রতি যে এআই চালু করেছেন তার নাম 'সাই-বট'।
চলুন জানি- এর পেছনের গল্পটি- গত ৫০ বছরে বিজ্ঞান প্রকাশনার জগতে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি একটি।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার বছর, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালে আলমাতিতে এলবাকিয়ানের জন্ম। ১২ বছর বয়সেই তিনি নিজে নিজে প্রোগ্রামিং শেখেন। তিনি এমন সব বিজ্ঞানের বই পড়তেন যা তাঁর পরিবারের কাছে অলৌকিক মনে হওয়া বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি কম্পিউটার সিকিউরিটির প্রেমে পড়েন এবং ২০০৯ সালে ডিগ্রি নিয়ে স্নাতক হন—যে ডিগ্রির তাঁর আসলে খুব একটা প্রয়োজন ছিল না, কারণ ততদিনে তিনি একজন পুরোদস্তুর হ্যাকার হয়ে উঠেছেন।
সে বছর শরতে আলেকজান্দ্রা মস্কো চলে যান। এরপর জার্মানি। তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি গবেষণা ইন্টার্নশিপ। তিনি ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস নিয়ে কাজ করছিলেন; এটি এমন এক ধরনের গবেষণা যেখানে এই ফিল্ডের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই বছরে শত শত গবেষণাপত্র পড়তে হয়। আর এই গবেষণাপত্রগুলোর প্রতিটিই কোনো না কোনো জার্নালের পেওয়ালের পেছনে বন্দি ছিল, যা মাত্র একবার পড়ার জন্যই ৩০ থেকে ৫০ ডলার খরচ করতে হতো। তিনি হিসাব কষে দেখলেন, কাজাখস্তানের একজন স্নাতকোত্তরের ছাত্রীর পক্ষে টাকা দিয়ে বিজ্ঞান পড়া অসম্ভব।
তিনি প্রথম যে কাজটি করলেন তা হলো, এক এক করে গবেষণাপত্রগুলোর পেওয়াল কীভাবে এড়ানো যায় তা শিখে নেওয়া। এই কৌশলটি তিনি অন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেন। তারা ক্রমাগত তাঁর কাছে গবেষণাপত্র চাইতে শুরু করে। ম্যানুয়ালি বারবার এই কাজ করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
তাই ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে, মাত্র তিন দিনে, তিনি একটি স্ক্রিপ্ট লিখলেন যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বয়ংক্রিয় করে দিল। একজন ব্যবহারকারী কেবল একটি ডিওআই (ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফাইয়ার) পেস্ট করবেন; স্ক্রিপ্টটি অনুদান হিসেবে পাওয়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেডেনশিয়াল (লগইন তথ্য) ব্যবহার করে লগইন করবে; গবেষণাপত্রটি বিনামূল্যে চলে আসবে এবং ওয়েবসাইটটি তা সংরক্ষণ করে রাখবে।
পরের বার অন্য কেউ যখন ওই একই গবেষণাপত্র চাইবে, তখন সে তা তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাবে, কারণ আগের অনুরোধের সময়ই সেটির একটি কপি সংরক্ষিত হয়ে গেছে। এটাই ছিল সাই-হাব। তিন দিনের কোডিং। একজন স্নাতকোত্তরের ছাত্রী। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল।
১৫ বছর পর, এখন ৮ কোটি ৮০ লাখ বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র জমা রয়েছে। ২০২০ সালের আগে প্রকাশিত প্রায় প্রতিটি পণ্ডিতসুলভ সাহিত্য ও গবেষণাপত্র তাঁর সার্ভারে রয়েছে। ১৯০টি দেশের গবেষকরা এটি ব্যবহার করেন। বিখ্যাত জার্নাল ন্যাচার-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী মোট একাডেমিক পেপার ডাউনলোডের প্রায় অর্ধেকই এখন সাই-হাবের মাধ্যমে হয়, সেইসব প্রকাশকদের কাছ থেকে নয় যারা আসলে এগুলোর কপিরাইটের মালিক।
২০১৫ সালে এক প্রকাশক তার বিরুদ্ধে মামলা করে এবং ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণের রায় পায়। তিনি তা পরিশোধ করেননি। আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করায়। তিনি তা মানেননি। ভারত, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্যের আদালত এই ডোমেনটি ব্লক করার চেষ্টা করেছে। তিনি কেবল ডোমেন পরিবর্তন করে নিয়েছেন— সাই-হাব.এসই, সাই-হাব.আরইউ, সাই-হাব.ইই ইত্যাদি। সাইটটির এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি ডোমেইন পরিবর্তন হয়েছে এবং এটি এখনও সচল রয়েছে। ২০১৬ সালে বিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১০ জন ব্যক্তির তালিকায় ন্যাচার ম্যাগাজিন তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করে। নিউইয়র্ক টাইমস তাঁকে এডওয়ার্ড স্নোডেনের সাথে তুলনা করেছে। দি ভার্জ তাঁকে আখ্যা দিয়েছে "পাইরেট কুইন অফ সায়েন্স"।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাননি, কারণ বিমানবন্দরে পা রাখামাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।
সাই-বট: গবেষকদের ফ্রি বাতিঘর
২০২৬ সালের এপ্রিলে সাই-বট এর আত্মপ্রকাশের বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ কথা বলছে না। তিনি ৮ কোটি ৮০ লাখ গবেষণাপত্রের এই ডেটাবেজের ওপর একটি স্মল ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বসিয়ে দিয়েছেন। আপনি সাধারণ ইংরেজিতে একটি প্রশ্ন করবেন; মডেলটি পুরো শ্যাডো লাইব্রেরি জুড়ে অনুসন্ধান চালাবে, প্রাসঙ্গিক গবেষণাপত্রগুলো টেনে আনবে, আসল সাইটেশনের ওপর ভিত্তি করে একটি উত্তর তৈরি করবে এবং প্রতিটি উৎসের মূল লেখার লিংক আপনাকে দিয়ে দেবে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কোনো লগইন লাগবে না। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেডেনশিয়াল লাগবে না। কোনো পেওয়াল থাকবে না।
গত মাসে "কেমিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ" জার্নালের একটি আর্টিকেলের জন্য তিনজন আসল বিজ্ঞানী এটি পরীক্ষা করে দেখেছেন। তাঁরা এটিকে চিকিৎসা ও রসায়ন সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন করেছিলেন। রেডিওলজিস্ট জানিয়েছেন যে, তিনি যে উত্তর পেয়েছেন তা ব্যবহারযোগ্য। রসায়নবিদ বলেছেন যে, সাম্প্রতিক গবেষণার ঘাটতিগুলো স্পষ্ট হলেও ওল্ড সায়েন্স (২০২০ সাল পর্যন্ত) ছিল একদম নিখুঁত। প্রকাশকরা এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে।
আলেকজান্দ্রা যা তৈরি করেছেন, টাকা দিয়ে ব্যবহার করা একাডেমিক এআই টুলগুলো ঠিক সেটাই তৈরি করার চেষ্টা করছে। পার্থক্য একটাই—পেইড বা প্রিমিয়াম টুলগুলো কেবল তাদের মূল প্রকাশকের আইনি মালিকানাধীন তথ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর তাঁর তৈরি এআই-টির সীমাবদ্ধতা বলতে গেলে প্রায় কিছুই নেই।
আলেকজান্দ্রা এখনও রাশিয়ার কোনো এক জায়গায় বসবাস করেন। তিনি তাঁর ঠিকানা প্রকাশ করেন না। তিনি কোনো ভিডিও সাক্ষাৎকার দেন না। তিনি ক্যামেরা বন্ধ রেখে স্কাইপের মাধ্যমে বক্তব্য দেন। তিনি একটি ল্যাপটপ আর একটি ডোনেশন পেজের ওপর ভিত্তি করে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবৈধ ও উন্মুক্ত লাইব্রেরিটি পরিচালনা করছেন।
টাকা দিয়ে বিজ্ঞান পড়ার সামর্থ্য না থাকা একজন স্নাতকোত্তরের ছাত্রী এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলেছেন, যার ওপর এখন পুরো বিজ্ঞানী সমাজ নীরবে নির্ভর করে আছে। প্রকাশকরা এক দশক ধরে তাঁকে থামানোর চেষ্টা করে আসছে। আর তিনি এমন এক এআই বাজারে ছেড়ে দিলেন, যা প্রকাশকদের পুরো বিজনেস মডেলটাকেই সেকেলে করে দিয়েছে।
এপস্টাইন, ম্যাক্সওয়েলের আর এক বাটপার প্রকাশক
প্রসঙ্গত বলা জরুরি যে, সায়েন্স ও অন্যান্য স্ট্রিমের রিসার্চ জার্নালগুলো এখন যেমন কিছু সার্চ করলেই সিনোপসিসের অংশবিশেষ বা মাথা দেখিয়ে টাকার জন্য গেট ধরে বসে থাকে, বিষয়টি এমন হবার কথা ছিল না। আবার, বিভিন্ন স্ট্রিমের রিসার্চ পেপার হিসেবে প্রকৃত ও অর্থবহ গবেষণাপত্রের পাশাপাশি প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ গার্বেজ ও ফাঁকিবাজির কাগজপত্র প্রকাশ হয়, সেগুলোও হবার কথা ছিল না। উনিশশো আশি একাশি সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান খাতের গবেষণা ছিল শতভাগ খাঁটি জিনিস। প্রকৃত গবেষণা ও পেপারগুলোই প্রকাশ হতো এবং গবেষণার কাজে ব্যস্ত মানুষগুলোও ছিলেন নিষ্ঠাবান জ্ঞানতাপস। আশির দশকের গোড়ার দিকে ব্রিটেনে হঠাৎ এক প্রকাশকের আবির্ভাব ঘটে যিনি রিসার্চ পেপারের জন্য বিজ্ঞানীদের বেশ ভালো অঙ্কের অর্থ দিতে থাকেন এবং ওইসব পেপারের একচেটিয়া স্বত্ব নিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশ করতে থাকেন। অল্পদিনের মধ্যেই অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থাগুলো রিসার্চ পেপার হারাতে থাকে, কারণ মোটা অংকের টাকার লোভে বিজ্ঞানীরা এই ভুঁইফোড় প্রকাশকের কাছেই নিজেদের শ্রমের ফসল তুলে দিতে থাকেন।
'লেখা ও স্বত্ব হস্তান্তর করলেই নগদ অর্থ অথবা মোটা অংকের চেক' -- এই মডেলের আরেকটা কুপ্রভাব হলো, অনেক বিজ্ঞানী, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিজেদের ফেলে রাখা মানহীন গবেষণাও এই প্রকাশকের কাছে হস্তান্তর করতে থাকে, কারণ গছিয়ে দিতে পারলেই টাকা। এভাবে অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থাকে ব্যবসা থেকে হটিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এই লোক বেশিরভাগ গবেষক ও বিজ্ঞানীকে পকেটে পুরে নেওয়ার পাশাপাশি ততদিনে বেশিরভাগ রিসার্চপেপারেরও কপিরাইট হোল্ডার হয়ে উঠেছেন। এরপর তিনি নিজের প্রকাশিত জার্নাল ও ম্যাগাজিনগুলোর দাম বাড়াতে থাকেন এবং এইসব জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অন্য কোনো ফরম্যাটে প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা ও অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নিয়ে তাদের দফারফা করতে থাকেন। পরবর্তীতে ইন্টারনেটের আবির্ভাবের পর জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগত পুরোপুরি উন্মুক্ত হবার কথা থাকলেও দেখা গেল ইন্টারনেটের শক্তিমান প্রকাশকরাও ব্রিটেনের ওই ভুঁইফোড় প্রকাশকের মডেলটিই অনুসরণ করছে। ওই ভুঁইফোড় গবেষক পরবর্তীতে ব্রিটেনের দুটি প্রধান দৈনিক কিনে নিয়ে সেগুলোর জোরে ব্রিটিশ ও মার্কিন রাজনীতিতে নানারকম পরোক্ষ প্রভাব খাটিয়ে কয়েক বছরে পত্রিকাগুলোকে দেউলিয়া করে নব্বই দশকের গোড়ার দিকে একদিন নিজের ইয়ট থেকে সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি জর্ডান, সিরিয়া ও মিশরের পার্শ্ববর্তী একটি দেশের এজেন্ট ছিলেন বলে বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা মনে করতো। তার নাম রবার্ট ম্যাক্সওয়েল, যার মেয়ে গিসেলিন ম্যাক্সওয়েল এখন জেল খাটছে জেফ্রি এপস্টাইনের অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে।
লেখক সাংবাদিক
মন্তব্য করুন

