Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

মায়েরা থাকুক নন্দনবাসিনী উর্বশী হয়ে

ফিচার

মায়েরা থাকুক নন্দনবাসিনী উর্বশী হয়ে

Icon

সাবরিনা শারমিন

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

এই লেখাটি যখন লিখতে বসি, তখন আমার মায়ের একটি পুরানো দিনের ছবি দেখছিলাম। কলেজ পড়ুয়া ছিপছিপে এক তরুণী। ছবিটি দেখতে দেখতে মনের ভেতর গুনগুন করে বেজে উঠলো কবিগুরুর সেই গানের কলি – ”হে নন্দনবাসিনী উর্বশী”। 

নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ, সুন্দরী রূপসী

হে নন্দনবাসিনী উর্বশী। 

মাকে আমরা মা হিসেবেই দেখি। মা-কে মা হিসেবে দেখার, পাবার জন্য কত যে গান, কবিতা, রীতি-রেওয়াজ আর আবেগ এ পৃথিবীতে রয়েছে, তার কোনো হিসেব নেই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শিশু খোকার প্রশ্নের উত্তরে মায়ের মনের কথাটি বলেছিলেন – “ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে”। অর্থাৎ, নারী মা হওয়ার আগেই তাঁর মনে মা হবার বাসনা জেগে থাকে। অন্তত কবির এভাবে কল্পনা করতে ভালো লেগেছে। 

তবে আমার মাকে অন্যভাবে দেখতে মন চাইছে - মা হয়ে ওঠার আগের সেই সময়টাতে। কল্পনা করতে চাইছি, মাতৃত্বের সাধ, সাধ্য আর সংগ্রামের জীবন শুরুরও আগে মায়েরা কেমন থাকেন? কেমন থাকে তাঁদের স্বপ্ন ও শিহরণের দিনগুলো? আদৌ কি তেমন কিছু থাকে?

থাকে বৈকি! মায়েরও তো একটি আনমনে ‘উর্বশী সময়’ থাকে। যে সময়ে তিনি কারো কন্যা, জায়া কিংবা জননী নন; তিনি কেবলই নিজের। নিজের স্বপ্ন আর ভালোলাগায় নীরবে ভেসে থাকার একটি স্বাধীন আকাশ তাঁরও থাকে। মায়ের সেই উর্বশী সময়টি কত রঙের ঝিলমিল অনুভব, সুখ-স্বপ্নে দুলবার সময়! প্রতিটি মেয়ের জীবনেই এমন একটি ”নন্দনবাসিনী উর্বশী” পর্ব থাকে।

দুঃখের বিষয়, আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত মায়েরা জীবনের সেই উর্বশী পর্ব শেষ হতে না হতেই হুট করে একদিন কারো ‘জায়া’ এবং তারপর আমাদের ”মা” হয়ে যান। আর অমনি শুরু হয়ে যায় তাঁর ‘মহান মা’ হওয়ার এক বন্ধুর যাত্রা। এরপর মায়ের আর থামা হয় না। উর্বশী রঙের স্বপ্ন, গান, ভালোলাগাগুলো উধাও হয়ে যায়; জীবন কেবল উৎসর্গিত হয় খোকা-খুকীর জন্য।

বিশেষ করে আমাদের সমাজে, মাকে ‘মা’ হওয়ার এক বিশাল ভার বহন করতে হয়। সমাজ মায়ের এমন এক অপার্থিব ও দৈবিক মূর্তি তৈরি করে দেয় যে, খোদ মায়ের মধ্যেও ‘মহৎ’ হবার এক নেশা চেপে বসে। মা শব্দের আগে-পরে অজস্র বিশেষণ বসিয়ে আমরা এমন এক কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে ফেলি, বেচারী মায়ের অস্তিত্ব ’মা’ নামের এক সিন্দুকে আটকা পড়ে যায়। সেই সিন্দুকের চাবিটি কিন্তু মায়ের কাছে থাকে না। 

মা কি সবসময় এমন মহানুভবতার প্রতিমূর্তী হয়েই বাঁচতে চেয়েছিলেন? নাকি কখনো কখনো তাঁরও খুব সাধারণ মানুষের মতো বাঁচতে ইচ্ছে করত? সারাক্ষণ ’মা, এটা দাও, ‘মা, ওটা করো, বন্ধুদের রান্না করে খাওয়াও – এইসব আবদারে মার কি কখনো ক্লান্তি লাগেনি? কথনো কি মনে হয়নি যে এরা বড্ড বেশি চাইছে? মায়ের এই ‘ফ্রি সার্ভিস’গুলো যাতে সীমিত হয়ে না যায়, তাই আমরা তাঁর মনে গেঁথে দিয়েছি – ’আমার মা বিশ্বসেরা, মা সব পারে ইত্যাদি। আমরা তাঁকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং ‘মা’ হিসেবে মহিমান্বিত করতে চেয়েছি। 

এই মহানুভবতার মশাল হওয়ার চাপে আমাদের মায়েরা নিজের যত্ন নিতে ভুলে যান, ভুলে যান নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের যত্ন নিতে। সন্তানমুখী ব্যস্ততায় জীবন পার করে যখন একদিন সন্তানরা বড় হয়ে নিজেদের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে,  তখন মা নিজের একান্ত জীবনে ফেরেন। ফিরে দেখেন, জীবনসাথীটি তাঁকে ছাড়া দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মা এই একাকীত্বের পাহাড় বুকের ভেতরেই চেপে রাখেন; মুখে এক চিলতে বিষন্ন হাসি ঝুলিয়ে কাটিয়ে দেন বাকীটা জীবন। আর খুব গোপনে, সন্তর্পণে ফিরে যান তাঁর সেই ফেলে আসা ‘উর্বশী’ দিনগুলোতে। 

মা পরিচয়ের ভারে পিষ্ট হয়ে এভাবেই তিলেতিলে ক্ষয় হয় একজন নারীর নিজস্ব সত্তা। আর আমরা ঢাকঢোল পিটিয়ে, অনুষ্ঠান আয়োজন করে তাঁকে ‘স্বর্ণময়ী মা’, ’রত্নগর্ভা মা’ ইত্যাদি উপাধি দিই –  যাতে ভবিষ্যতে অন্য মায়েদেরও এমন আত্মবলিদান অব্যাহত থাকে।

খুব অল্পসংখ্যক মা সামাজিক স্বার্থপরতার এই ফাঁদ এড়িয়ে, দৈবিক মা হবার বাসনামুক্ত থেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বাঁচার সাহস করেন। এই মায়েরা কেবল সন্তানকে ‘সার্ভিস’ দেন না, বরং সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁরা নিজেকে নিয়ে ভাবেন, নিজের যত্ন নেন। নিজের ব্যক্তিগত জীবন আর নিজের ’উর্বশী সময়’কে হারিয়ে যেতে দেন না। সমাজ এই মায়েদের পুরস্কৃত করে না, বরং সুযোগ পেলে নিন্দামন্দ করে। আসলে আমরা এবং আমাদের সমাজ এই স্বাধীনচেতা ও ঋজু ব্যক্তিত্বের মায়েদের ভয় পাই। আমি এই মায়েদেরই অভিনন্দন জানাই। 

আমার প্রজন্মের মায়েরা আজ বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। আমরা তাঁদেরকে ’দেবী সিন্দুক’ থেকে বের হতে দিই নি; স্বর্গের পরী হয়ে থাকতে বাধ্য করেছি। আমরা আমাদের তরুণী মাকে যতটা ভালোবেসেছি, নুয়ে পড়া প্রবীন মাকে ততটা হয়তো পারিনি। আমরা তাঁর ভেতরের ‘মানুষ’ মনটার খোঁজ নিইনি কখনো। 

তবে নতুন প্রজন্মের ওপর আমি ভরসা রাখি। এরা আমাদের মতো এমন বিরক্তিকর ও স্বার্থপর নয়। এদের ভেতর আমি দৃঢ় ও স্পষ্ট ব্যক্তিত্ব দেখতে পাই। আমার বিশ্বাস, ’মা’ সম্পর্কটাকে তারা নতুনভাবে মূল্যায়ন করবে। তারা মাকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেবে, ’মানুষ মা’কে ভালোবাসবে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য মায়ের কোনো ’দেবীমূর্তী’ বানিয়ে তাঁকে নিঃস্ব করে দেবে না।

মন্তব্য করুন

Logo