জিনিয়া রহমান
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১১:২২ এএম
বাড়ির আঙিনায় হঠাৎ এক বৃদ্ধ মানুষকে ঘিরে কৌতূহলী ভিড় জমে যায়। কাঁপা কণ্ঠে তিনি নিজের পরিচয় দিচ্ছিলেন—এই বাড়িটিই নাকি তাঁর পৈতৃক ভিটা। এখানেই ফেলে গিয়েছিলেন স্ত্রী-সন্তান, পরিবার আর এক টুকরো জীবন। হিন্দি আর ভাঙা বাংলা মিশিয়ে বলা তাঁর কথাগুলো উপস্থিত সবার কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। তিনি যাঁদের নাম বলছিলেন—স্ত্রী, মা-বাবা, স্বজনদের নাম বলছিলেন; যাঁদের কেউই আজ আর বেঁচে নেই। তবু স্মৃতির ভেতর থেকে টেনে আনা সেই নাম, সেই সম্পর্ক আর ঘটনাগুলোর মিল খুঁজে পেয়ে একসময় একজন প্রবীণ মানুষ তাঁকে চিনতে পারেন। কিন্তু চিনেও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁর। কারণ, এমন গল্প তো রূপকথাকেও হার মানায়।
ধীরে ধীরে স্মৃতির ধুলা সরিয়ে যে গল্প বেড়িয়ে আসে তা রীতি মতো বিষ্ময়কর। আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়ার বয়বৃদ্ধদের কথায় বেরিয়ে আসে ৫৪ বছর আগে সমুদ্রে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হওয়া ছৈয়দ আহাম্মদই ফিরে এসেছেন নিজ বাড়িতে।
সমুদ্র আমাদের অনেক কিছু দেয়, আবার কখনো সব গিলে খায়। এই দেয়া আর নেয়ার মাঝেই সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় উপকূলের মানুষকে। সেখানে কখনো সাগরও হার মানে মানুষের বেঁচে থাকার গল্পের কাছে। নোয়াখালীর হাতিয়ায় তেমনই এক বিস্ময়কর ঘটনার জন্ম দিয়েছেন ছৈয়দ আহাম্মদ নামের এক বৃদ্ধ জেলে—যিনি ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হওয়ার ৫৪ বছর পর হঠাৎ ফিরে এসেছেন নিজের গ্রামে।
হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীদিয়া গ্রামের এমপির পুলসংলগ্ন ফজলি বাড়িতে এখন মানুষের ভিড়। কারণ, যাকে পরিবার বহু আগেই মৃত ধরে নিয়েছিল, সেই মানুষটিই একদিন হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর, কণ্ঠনালীতে অপারেশনের চিহ্ন, অসুস্থতায় ক্লান্ত অবয়ব—তবু চোখেমুখে যেন দীর্ঘ এক যাত্রা শেষে আপন ঠিকানায় ফেরার শান্তি।
প্রায় ৫৪ বছর আগে কুতুবদিয়া এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে ভয়াবহ ট্রলারডুবির শিকার হন ছৈয়দ আহাম্মদ। সাল ১৯৭২। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে মুহূর্তেই ছিটকে পড়েন ট্রলারের সব জেলে। উত্তাল ঢেউ সাঁতরে কেউ কেউ ফিরে এলেও ছৈয়দ আহম্মদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। দিনের পর দিন খোঁজাখুঁজির পর পরিবার ধরে নেয়, সাগরই হয়তো তাকে কেড়ে নিয়েছে।
-6a0169401a754.jpeg)
সেই সময় তার স্ত্রী ছামনা খাতুনের কোলজুড়ে ছিল ছোট্ট শিশু সন্তান আকরাম। বাবার মুখ না দেখেই বড় হয়েছে সে। বাবাকে চিনেছে শুধু মানুষের মুখে শোনা গল্পে। ৫ মে ছৈয়দ আহাম্মদ যখন বাড়ি ফিরেন, তখন আকরাম ৫৫ বছরের প্রৌঢ়। ছৈয়দ আহাম্মদের বয়স ৮৩।
ট্রলারডুবির পর কোনোভাবে খড়কুটো আঁকড়ে ভাসতে ভাসতে ভারতের অজ্ঞাত এক উপকূলে পৌঁছেছিলেন ছৈয়দ আহাম্মদ। এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ অনিশ্চত যাত্রা। বছরের পর বছর কেটেছে পথে-প্রান্তরে, মসজিদে, মাজারে। পরিচয়হীন ভবঘুরের মতো জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন আজমীর শরীফে।
কিছুদিন আগে ঘুরতে ঘুরতে ভারতের হাওড়া স্টেশন এলাকায় দুষ্কৃতকারীদের কবলে পড়েন তিনি। পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। আর তারপরই যেন স্মৃতির ভেতর জেগে ওঠে বহু পুরোনো ঠিকানা। পথ চিনতে চিনতে, স্মৃতির টানে, তিনি একসময় পৌঁছে যান নিজের জন্মভিটা হাতিয়ায়। যেমন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’র ‘উপেন’ ফিরে ছিল নিজ ভিটায়।
৫ মে দুপুরে বাড়িতে এসে নিজের পরিচয় দেন বৃদ্ধ ছৈয়দ আহাম্মদ। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। পরে তাঁর সহপাঠী মুন্সি সারেং, চাচাতো ভাই গেদু মিয়া, সহোদর আবুল খায়ের ওরফে জমিদারসহ কয়েকজন প্রবীণ তাঁকে শনাক্ত করেন। তখনই যেন অবিশ্বাস ধীরে ধীরে রূপ নেয় বিস্ময়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলফাজ বলেন, ‘এত বছর পর আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এটা আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়। মানুষটা যেন জীবনের শেষ সময়ে আপনজনদের সান্নিধ্য পায়, এটাই চাই।’
ছৈয়দ আহাম্মদের ছেলে আকরামের কণ্ঠেও মিশে আছে বিস্ময় আর অপূর্ণ জীবনের দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেন, জন্মের পরপরই বাবা নিখোঁজ হন। এতদিন শুধু মানুষের মুখে বাবার গল্প শুনেছেন। এবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সত্যিকারের বাবাকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেলেন।
তবে এই অবিশ্বাস্য ফিরে আসার গল্পের ভেতরেও তৈরি হয়েছে নতুন পারিবারিক টানাপোড়েন। গ্রামের কিছু লোক ছৈয়দ আহাম্মদকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি পারিবারিক সম্পদ ও টাকাপয়সা নিয়েও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। দীর্ঘ ৫৪ বছর পর ফিরে আসা এক মানুষকে ঘিরে এখন হাতিয়ার মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে বিস্ময়, আবেগ আর নানা প্রশ্নের গল্প।
মন্তব্য করুন

