অসাম্প্রদায়িক চেতনা নজরুলের সকল প্রেরণার উৎস
মহসিনুল হক
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকীতে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি
কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশের জাতীয় কবি তিনি। নজরুল কেবল একজন সাহিত্যিক ছিলেন না—
তিনি ছিলেন একটি চেতনার নাম।
ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে মানবমঙ্গলের যে অনন্ত পথে তিনি হেঁটেছেন সেই পথ আজও প্রাসঙ্গিক। আজও তা অনুসরণযোগ্য। কবি নিপীড়িত সাধারণ মানুষের প্রগতি চেয়েছেন।পিছিয়ে পড়াদের জাগাতে চেয়েছেন। তিনি ছিলেন সকল সংগ্রামে। তিনি ছিলেন সকল সংগ্রামীর অন্তরে —
অত্যাচারিতের প্রতিনিধি ছিলেন। ছিলেন দুর্বলের কণ্ঠস্বর।
নজরুল তাঁর শেষ ভাষণে বলেছিলেন—
'কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনোটাই না। আমি শুধু হিন্দু-মুসলিমকে এক জায়গায় ধরে নিয়ে হ্যান্ডশেক করানোর চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি।'
এই একটি উক্তিতেই তাঁর সমগ্র জীবন-দর্শনের নির্যাস ধরা আছে। কবি নজরুল শ্যামাসংগীত, হরিনাম, কীর্তন রচনা করেছেন। তাই কেউ তাঁকে বলেছেন কাফের। আবার তিনি গজল, ইসলামি সংগীত রচনা করেছেন। আরবি-ফারসি সাহিত্যকর্ম বাংলায় অনুবাদ করেছেন। সেকারণে গোঁড়াপন্থীদের কাছে তিনি ছিলেন সাম্প্রদায়িক। অথচ তিনি বিয়ে করেছিলেন হিন্দু নারী প্রমীলা দেবীকে। এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে নজরুল ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক। মানবতাবাদী চেতনাই ছিল নজরুলের প্রেরণার উৎস।
অসাম্প্রদায়িক মানে যিনি সাম্প্রদায়িক নন। কোনো ব্যক্তির মনোভাবকে তখনই সাম্প্রদায়িক বলা হয় যখন সে এক বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ভুক্তির ভিত্তিতে অন্য সম্প্রদায় ও তার মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষতিসাধনে প্রস্তুত থাকে। সেখানে ব্যক্তি গৌণ। মুখ্য হলো সম্প্রদায়। অপরদিকে অসাম্প্রদায়িক মানে বিশেষ কোনো দল বা ধর্ম-সম্প্রদায় সম্পর্কে নিরপেক্ষ, সার্বজনীন ও উদার।
১৯২৭ সালে অধ্যক্ষ ইবরাহিম খাঁ-কে লেখা চিঠিতে নজরুলের এই চেতনা খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সেই চিঠিতে নজরুল লিখেছেন—
'হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের অশ্রদ্ধা দূর করতে না পারলে যে এ পোড়া দেশের কিছু হবে না, এ আমিও জানি। এবং আমিও জানি যে, একমাত্র সাহিত্যের ভেতর দিয়েই এ অশ্রদ্ধা দূর হতে পারে।'
তাই তিনি সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকে হাতিয়ার করে সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূর করার প্রয়াস চালিয়েছেন। কবিতায়, গদ্যে, উপন্যাসে এবং সংগীতে তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল খুবই স্পষ্ট।
'বিদ্রোহী' কবিতাকে সাধারণত বিপ্লবের কবিতা হিসেবে পড়া হয়। কিন্তু এটি একইসাথে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য সৃষ্টি। একই নিঃশ্বাসে কবি উচ্চারণ করেন হিন্দু ও ইসলামি পুরাণের প্রতীক।
'আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি ইস্রাফিলের শিঙার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিণাকপাণির ডমরু ত্রিশূল,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড।'
ইস্রাফিল ইসলামি ঐতিহ্যের ফেরেশতা, আর পিণাকপাণি হলেন শিব। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্মের প্রতীক। এই দুটি বিষয় এক কবির কণ্ঠে একাকার হয়ে যায়। শব্দ ব্যবহারেও একই প্রবণতা দেখা যায়। কাজিয়া, রথ, ত্যজিয়া, পূজা, কোরবান, শঙ্খ ও আজান পাশাপাশি ব্যবহার করে তিনি কাব্যে একটি অসাম্প্রদায়িক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। এটি শুধু শিল্পকৌশল নয়, এটি তাঁর বিশ্বদৃষ্টির প্রকাশ।
নজরুলের 'মানুষ' কবিতা তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানসের সবচেয়ে সরাসরি উচ্চারণ। তিনি বলেন—
'গাহি সাম্যের গান —
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম-জাতি,
সব দেশে সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।'
এই কবিতায় তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন মন্দির-মসজিদের দ্বার রুদ্ধ রাখার বিরুদ্ধে।এই সাহসী উচ্চারণ সেই যুগে কেবল নজরুলের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' কবিতায় নজরুল এক অনন্য প্রশ্ন রাখেন যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
'হিন্দু না ওরা মুসলিম?' ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা'র।'
ডুবন্ত মানুষের পরিচয় জিজ্ঞেস করার সময় নেই।এই বার্তা আজকের পৃথিবীতেও কতটা জরুরি! জাতিধর্ম নয়, মানুষের প্রাণ রক্ষাই আসল কাজ।এই মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিই নজরুলের সত্তার মূল ভিত্তি।
'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার সবচেয়ে পরিণত রূপ পাওয়া যায়।
'গাহি সাম্যের গান —
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।'
এই সংকলনে 'হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ', 'পথের দিশা', 'যা শত্রু পরে পরে'সহ একাধিক কবিতায় তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতাকে চিত্রিত করেছেন এবং সম্প্রীতির আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে ধর্মের আসল সত্য হলো মানুষে মানুষে ভালোবাসা। বাকি সব আচার-বিচার নিছক বাহ্যিক খোলস।
নজরুল যেমন শ্যামাসংগীত ও কীর্তন রচনা করেছেন, তেমনি লিখেছেন হামদ-নাত ও গজল। এই দুই ধারায় সমান দক্ষতা ও প্রজ্ঞতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য করে তোলে। একটি কবিতায় তিনি শ্যামাকে সম্বোধন করে লেখেন—
'আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায়
দেখে যা আলোর নাচন,
মায়ের রূপ দেখে বুক পেতে শিব
যার হাতে মরণ বাঁচন।'
আবার অন্য একটি রচনায় নবীজির মাতা আমিনার মাতৃত্বকে স্মরণ করেন সমান ভালোবাসায়। তিনি লিখেছেন—
'তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে।'
দুটি ধর্মের মহান নারীকে সমান শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন। এটাই নজরুলের অনন্যতা। তাঁর সংগীত-সাধনায় 'মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম / হিন্দু-মুসলমান'— এই ভাবনাই সর্বদা প্রধান ছিল।
'দুর্গম গিরি কান্তার মরু' গানটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে এটি পরিবেশন করেছিলেন। গানটি রচনা করেছিলেন মূলত হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কে একসাথে উদ্দীপ্ত করার লক্ষ্যে।
'মন্দির ও মসজিদ' এবং 'হিন্দু-মুসলমান' প্রবন্ধে নজরুলের অসাম্প্রদায়িক মনোভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লেখেন— আহত হিন্দু ও মুসলমান পাশাপাশি পড়ে একই ভাষায় আর্তনাদ করছে, ধর্মপরিচয় তখন মুছে গেছে, শুধু রয়েছে মানুষের কান্না।
'হিন্দু-মুসলমান' প্রবন্ধে তিনি বলেছেন —
'অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি তিনি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য এসেছেন — তাঁরা বলেছেন মানুষের জন্য এসেছেন, আলোর মতো সকলের জন্য।'
"বাঁধনহারা" উপন্যাসে নজরুলের ধর্মনিরপেক্ষ উদার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁর মতে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই অভিন্ন এক মানবধর্মকে হৃদয়ে ধারণ করে আছে। ধর্মের বাহ্যিক রূপটা একটা খোলস মাত্র। ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে ভুলে গিয়ে হিন্দু-মুসলমান বাহ্যিক আচার-আচরণকে অহেতুক গুরুত্ব দেয়।
নজরুলের মতে হিন্দু-মুসলিম মিলনের পথে প্রধান অন্তরায় হলো সামাজিক বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার ধারণা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, সব ধর্মের ভিত্তি একই চিরন্তন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই সত্যকে মানলে ধর্মের বৈষম্য আর হিংসার কারণ হতে পারে না।
নজরুল ধর্মকে আঘাত করেননি। আঘাত করেছেন ধর্মের নামে শোষণ ও ব্যবসাকে। তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বুঝাতে চেয়েছেন— মন্দির-মসজিদ-গির্জা তাঁর লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো সেই সংকীর্ণতা যা ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। যে ধর্ম মানুষকে মানুষ থেকে আলাদা করে, সেই ধর্মাচারণের বিরুদ্ধেই তাঁর বিদ্রোহ।
নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা কেবল কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সমগ্র জীবনযাপনেই তার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি হিন্দু নারী প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তাঁকে ধর্মান্তরিত হতে বলেননি। উভয়েই নিজ নিজ ধর্ম পালন করেছেন। তাঁদের সন্তানদের নামে হিন্দু ও মুসলিম দুই ঐতিহ্যের মিশ্রণ ছিল। কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ, কাজী অরিন্দম খালেদ। যা সেই যুগে ছিল এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত।
১৯২৬ সালে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি বন্ধু কমরেড মুজফফর আহমদের সাথে বাংলায় ও উর্দুতে দাঙ্গাবিরোধী ইশতেহারে সই করেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে বৈঠকে হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন। তিনি শুধু কবি ছিলেন না, ছিলেন একজন সক্রিয় সামাজিক কর্মী।
অধ্যাপক আহমদ শরীফের ভাষায়— 'নজরুল ইসলাম সারাজীবন প্রায় সতর্কভাবেই চেতনায়, চিন্তায়, কথায় ও আচরণে এ অসাম্প্রদায়িকতা বজায় রেখেছিলেন।'
নজরুল নিজেও স্বীকার করেছেন— 'আমি হিন্দু-মুসলমানদের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী।'
নজরুলের সমগ্র সাহিত্যসাধনার কেন্দ্রে ছিল একটি মাত্র স্বপ্ন। তা হলো— সম্প্রদায়গত বিভেদ ও বিভাজনমুক্ত একটি মানবিক সমাজ। তিনি লিখেছেন— 'আমি স্রষ্টাকে দেখিনি, কিন্তু মানুষকে দেখেছি। এই ধুলিমাখা পাপলিপ্ত অসহায় দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করবে।' এই মানুষকে দেখার চোখ এবং ভালোবাসার শক্তিই নজরুলের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
বহু নজরুল গবেষক বলেছেন— 'সাম্যবাদী চিন্তা নজরুলের মানসলোকে সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ মানবসত্তার জন্ম দিয়েছে। হিন্দু-মুসলমান বৈপরীত্যের দ্যোতনা না হয়ে তাঁর চেতনায় হতে পেরেছে জাতিসত্তার পরিপূরক দুই প্রান্ত।'
আজকের বাংলাদেশে এবং সমগ্র উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা যখন বারবার মাথাচাড়া দেয় সেসময় নজরুলের সেই কণ্ঠস্বর আরও জরুরি হয়ে ওঠে। তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত অসাম্প্রদায়িক চেতনা যেন আজ শুধু সাহিত্যের বিষয় নয়। এগুলো আমাদের সামাজিক প্রয়োজনের অংশ।
কাজী নজরুল ইসলাম সর্বতোভাবে সংস্কারমুক্ত উদার মানবতাবাদী কবি। তিনি বাংলার কবি, বাঙালির কবি। নজরুল কোনো বিশেষ সম্প্রদায় বা বিশ্বাসের ক্ষুদ্রতায় নিজেকে আবদ্ধ করেননি। ব্যক্তিজীবনেও গোঁড়ামির হাতে বন্দী হননি। অসাম্প্রদায়িক, সাম্য ও মানবতাবাদী নজরুল আমাদের জাতীয় কবি। তিনি আমাদের জাতিসত্তার প্রধান রূপকার।
তাঁর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে সত্যিকারের পথ হলো তাঁর সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করা। যে স্বপ্নে নজরুল আজীবন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলকে একই মানববন্ধনে আবদ্ধ করতে কাজ করে গেছেন। শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ আজও মনে করেন— সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকার যতদিন থাকবে, নজরুলের আলো ততদিন প্রয়োজন। তাঁর কবিতা বা লেখা শুধু পাঠ করা নয় বা শুধু শুধু তাঁর গান শোনা নয়— বরং তাঁর চেতনাকে সমুজ্জ্বল রাখাই হবে আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের
জন্মদিনে আজ ভূপেন হাজারিকার ভাষায় বলি—
'সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল
যতই আসুক বিঘ্ন-বিপদ হাওয়া হোক প্রতিকূল
এক হাতে বাজে অগ্নিবীণা, কণ্ঠে গীতাঞ্জলি
হাজার সূর্য চোখের তারায় আমরা যে পথ চলি
সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল'
মন্তব্য করুন

