Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

মানুষের টিকে থাকা নির্ভর করছে জীববৈচিত্র রক্ষার উপর

এই দিনে

বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস

মানুষের টিকে থাকা নির্ভর করছে জীববৈচিত্র রক্ষার উপর

Icon

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম

আমরা মনে করে, প্রকৃতি যেন আমাদের ভোগের জন্যই সৃষ্টি। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতা আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে—প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষের টিকে থাকা সম্ভব নয়। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণ, উদ্ভিদ, নদী, বন, পাহাড়, জলাভূমি ও অণুজীব পারস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল। আজ বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস আমাদের সে কথাই আনুষ্ঠানিকভাবে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। জীববৈচিত্র্য কেবল কিছু বিরল প্রাণী বা বনভূমির সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি মানুষের খাদ্য, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক, পললগঠিত উর্বর ভূমির দেশের জন্য জীববৈচিত্র্য শুধু পরিবেশগত নয়, অস্তিত্বগত প্রশ্নও।

পৃথিবীর ক্ষুদ্র আয়তনের দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এখানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পার্বত্য অঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল, উপকূলীয় বনাঞ্চল, অসংখ্য নদ-নদী ও সামুদ্রিক সম্পদ। একসময় এই ভূখণ্ডে প্রকৃতি ছিল অপরূপ বৈচিত্র্যময়। গ্রামবাংলার মাঠে মাঠে দেখা যেত নানা প্রজাতির পাখি, প্রজাপতি ও দেশীয় মাছ। বর্ষাকালে নদীগুলো ভরে উঠত জীবনের উচ্ছ্বাসে। শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠত জলাভূমি। কিন্তু ক্রমাগত নগরায়ন, বন উজাড়, নদী দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং মানুষের সীমাহীন লোভ বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যকে ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় বিপদের নাম আবাসস্থল ধ্বংস। বন কেটে বসতি, শিল্পকারখানা, ইটভাটা কিংবা সড়ক নির্মাণের ফলে অসংখ্য প্রাণী তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান হারাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে শুধু পাহাড়ের পরিবেশই ধ্বংস হচ্ছে না, বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বহু বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণী। সুন্দরবনের ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে নানা চাপ। কয়লাভিত্তিক শিল্প, নৌপথ, নৌদূষণ, বনদস্যুতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বিশ্ব ঐতিহ্যে অনন্য স্মারক সুন্দরবন আজ হুমকির মুখে। সুন্দরবন যে শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাঘ ‘বেঙ্গল টাইগার’ বা ‘বাংলা বাঘের’ আবাস তাই নয়, এটি আমাদের সমুদ্র উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল। লাখো মানুষের জীবিকার উৎস এবং অসংখ্য প্রাণের আশ্রয়স্থল এই সুন্দরবন।

চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।

তেরশত নদী শুধায় আমাকে, 'কোথা থেকে তুমি এলে?' 

কবি সৈয়দ শামসুল হকের বর্ণনার সেই নদী বা পলি কোনাটাই আর মেলানো যায় না বাংলাদেশের বর্তমান ভূপ্রকৃতির সঙ্গে। বাংলাদেশের অনেক নদী জাস্ট হারিয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোর আবস্থাও নিবিড় পর্যবেক্ষণ ইউনিটে থাকা পেশেন্টের মতো—উদ্বেগজনক। কোনো কোনোটা তো রয়েছে একদম লাইফ সাপোর্টে। 

একসময় যে নদীগুলো ছিল মাছের ভাণ্ডার, আজ সেগুলোর দখলে আর দূষণে মৃতপ্রায়। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনীতি তো রয়েছেই।  শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন ও রাসায়নিক পদার্থ নদীর পানি বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে দেশীয় মাছের বহু প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে। কৈ, শিং, মাগুর, পাবদা কিংবা টেংরাসহ অনেক মাছ খোলা পানিতে আজ আর আগের মতো চোখে পড়ে না। জলাভূমি ভরাট করে আবাসন বা অবকাঠামো নির্মাণ সংকুচিত করছে পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য উপকারী পোকামাকড়ের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। অথচ এসব প্রাণী প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য নতুন ও ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনচক্র পরিবর্তিত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির প্রাণী ও উদ্ভিদ টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। আবার তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কিছু প্রজাতি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা নয়; বরং প্রকৃতির বৃহৎ জীবজগতেরই একটি অংশ।

বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য সংকটের আরেকটি কারণ হলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা দিনের পর দিন প্রকৃতিকে শুধু ভোগের বস্তু হিসেবেই দেখতে শিখেছি। উন্নয়ন মানেই যেন কংক্রিটের শহর, উঁচু ভবন ও বনভূমি দখল। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন কখনোই প্রকৃতি ধ্বংস করে হতে পারে না। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করলে শেষ পর্যন্ত মানুষকেই তার ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়। ঢাকা বা আমাদের বড় নগরগুলোর বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা কিংবা গ্রামাঞ্চলে কৃষি সংকট—সবকিছুর পেছনেই প্রকৃতির ওপর মানুষের অমানবিক হস্তক্ষেপের প্রভাব রয়েছে।

বলতে পারেন, বাংলাদেশে এখন অনেক মানুষ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছেন। পরিবেশবাদী সংগঠন, গবেষক, বনকর্মী, কখনো-কখনো স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং তরুণদের নানা উদ্যোগ ইতোমধ্যে আশা জাগিয়েছে। সুন্দরবন রক্ষায় সচেতনতা বেড়েছে, কিছু এলাকায় বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, নদী ও জলাভূমি রক্ষার আন্দোলনও জোরদার হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক বিবেচনায় দেখতে গেলে, এসব বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ছাড়া কিছুই নয়। আমরা প্রকৃতিতে যে ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়েছি বা চালাচ্ছি তা থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে প্রয়োজন রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন সাধারণ মানুষ। কারণ প্রকৃতি ধ্বংসের পেছনে যেমন মানুষের হাত রয়েছে, তেমনি রক্ষার ক্ষমতাও মানুষেরই আছে। একটি গাছ লাগানো, নদীতে ময়লা না ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পাখি শিকার না করা কিংবা জলাভূমি রক্ষায় সচেতন হওয়া—এমন ছোট ছোট কাজও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে, ভালোবাসতে শেখাতে হবে। যে প্রজন্ম প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখবে, তারাই ভবিষ্যতে পৃথিবীকে রক্ষা করবে।

জীববৈচিত্র রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। পরিবেশবিরোধী প্রকল্প অনুমোদনের আগে কঠোর পরিবেশগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বনভূমি দখল ও নদী দূষণের বিরুদ্ধে লোক দেখানো নয়, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ হয় না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃতজনের জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, প্রকৃতি রক্ষার সবচেয়ে বড় অংশীদার এই মানুষগুলোই সবচেয়ে ভালো জানেন কিসে প্রকৃতির ভালো এবং নিজেরাও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারবেন।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গেও জীববৈচিত্র্যের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পালাগান, লোককথা কিংবা গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি স্তরেই নদী, পাখি, গাছ ও ঋতুর উপস্থিতি স্পষ্ট। প্রকৃতি ধ্বংস হলে কেবল প্রাণী বা বনই হারাবে না, হারাবে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি বড় অংশ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ কিংবা জসীমউদ্দীনের বাংলাকে বুঝতে হলে প্রকৃতির সেই বৈচিত্র্যময় রূপটিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতার দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন। আমরা উন্নয়নের নামে কোথায় যাচ্ছি, কী হারাচ্ছি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন পৃথিবী রেখে যাচ্ছি—সেই প্রশ্ন করারও দিন। আজ পৃথিবীর বহু দেশ জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারণ প্রকৃতি ধ্বংস মানে খাদ্য সংকট, পানির সংকট, রোগব্যাধি ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বৃদ্ধি। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষ নিজেই তার শিকার হয়। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি টিকে থাকার লড়াই। এই লড়াইয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি নাগরিককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আজ যদি আমরা বন, নদী, পাহাড় ও প্রাণিকুলকে রক্ষা করতে না পারি, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো বইয়ের পাতায় বা জাদুঘরে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্যের গল্প পড়বে।

তাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী হওয়া উচিত—প্রকৃতিকে কেবল সম্পদ হিসেবে নয়, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা। কারণ মানুষ টিকে থাকবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে প্রকৃতির জীববৈচিত্র টিকে আছে কি না তার ওপর।

মন্তব্য করুন

Logo