২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে।
সামিন সালিম
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১২:০১ এএম
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকের অনুসন্ধানে তার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিশ্বের ৯টি দেশে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সম্পদের সন্ধান মেলে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ পাওয়া যায় যুক্তরাজ্যে। সেখানে জাবেদের ৮০৪টি ফ্ল্যাট ও বাড়ির মূল্য প্রায় ৮ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। এছাড়া কম্বোডিয়ায় পাওয়া যায় ৩৮০ কোটি টাকা মূল্যের ১১১টি ফ্ল্যাট ও প্লট, দুবাইয়ে ৭৬১ কোটি টাকা মূল্যের ৭৩টি ফ্ল্যাট-বাড়ি, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬০ কোটি টাকা মূল্যের ৪১টি ফ্ল্যাট-বাড়ি এবং মালয়েশিয়ায় ৩১৩ কোটি টাকা মূল্যের ৪৭টি ফ্ল্যাট। থাইল্যান্ডে সন্ধান মেলে ১৯০ কোটি টাকার ২৪টি ফ্ল্যাট-বাড়ির, ভিয়েতনামে ১৫৯ কোটি টাকার ৪টি ফ্ল্যাট-বাড়ি এবং ভারতে প্রায় ১৩ কোটি টাকার ১১টি ফ্ল্যাটের।
তবে অনুসন্ধান চলাকালেই তিনি প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিক্রি করে দেন বলে দুদক জানায়। শেষ পর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণসহ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এ যেন কল্পনাকেও হার মানানো রূপকথার গল্প। কিন্তু গল্প হলেও এটাই সত্যি।
চলুন যাই বেগম পাড়ায়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিধানে ‘বেগম পাড়া’ শব্দটি এখন আর শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা বোঝায় না; এটি ধীরে ধীরে ক্ষমতাবানদের অর্থপাচার, দুর্নীতির অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া এবং জবাবদিহিহীন সম্পদ গড়ার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মূলত কানাডার টরন্টো ও তার আশপাশের অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোতে বাংলাদেশি ধনীদের পরিবারের বসবাস বাড়তে থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ‘বেগম পাড়া’ শব্দটির প্রচলন ঘটে। বাংলাদেশের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেরা দেশে থাকলেও স্ত্রী-সন্তানদের কানাডায় বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন। সেই সূত্রেই ‘বেগম পাড়া’ নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক এলাকার নাম না হয়েও রাজনৈতিক-সামাজিক রূপক, যা বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের মাধ্যমে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু টরন্টো বা কানাডা নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে উন্নত দেশের নগরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থ পাচারকারী চক্র এমন ‘বেগম পাড়া’ গড়ে তুলছে।
মূলত কানাডার টরন্টো ও তার আশপাশের অভিজাত আবাসিক এলাকার একটি ‘বেগম পাড়া’, ছবি: সংগৃহীতমিথ্যা ঘোষণায় প্রতি বছর পাচার ৬.৮ বিলিয়ন ডলার
অর্থপাচার যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য এক নীরব ঘাতক। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা যেন মহামারিতে রূপ নিয়েছে। ব্যাংক লুটেরা, দুর্নীতিবাজ আমলা, রাজনীতিকরা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ উন্নত দেশে নিয়ে আয়েশি জীবনযাপন করছেন। ব্যবসায়ীদের অনেকেই কর ফাঁকির জন্য সম্পদ গোপনে নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশে। এভাবে বাংলাদেশকে ফেলা হচ্ছে গভীর সংকটে। অর্থনীতির আজকের এই ভঙ্গুর দশা, দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে থাকার অন্যতম কারণ এই পুঁজিপাচার। অর্থপাচারকারীদের নিয়ে দেশে কঠোর আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই বললেই চলে। অবশ্য শীর্ষ সন্দেহভাজন দেশের দশ ব্যবসায়ী গ্রুপ চিহ্নিত করে দেশি–বিদেশে তাদের সম্পদ জব্দের উদ্যোগ চলমান আছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়– যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের ঘনিষ্ঠজনরাই অর্থ পাচার করেন বেশি। যে কারণে শেষ পর্যন্ত তেমন ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। আবার বাংলাদেশ থেকে সরাসরি একটা দেশে অর্থ নিয়ে সম্পদ গড়া হয় তেমন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখান থেকে অর্থ নিয়ে করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশে অন্য কারও নামে অর্থ নেওয়া হয়। এভাবে একাধিক দেশ ও হাত বদল করে বিদেশে সম্পদ গড়া হয়। ফলে এই অর্থ যে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সেটা প্রমাণ করা কঠিন। সারা বিশ্ব থেকেই পাচার করে অর্থ নেওয়ার জন্য নানা আইনি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তারা সব ধরনের আইনি ফাঁক–ফোকর বন্ধ করে অর্থ পাচার করে দেয়। যে কারণে সারা বিশ্বেরই পাচার হওয়া অর্থ ফেরতের হার মাত্র ২ শতাংশ।
বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচারের বিষয়ে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে নানা তথ্য উঠে আসে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে এতদিন তেমন কোনো উদ্যোগ ছিল না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে পাচার হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা) অনুযায়ী যা ২৮ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকার বেশি। মোট ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই অর্থ পাচার করা হয়। আর এসব দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে ব্যাংকিং, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। এটিকে ভিত্তি ধরলে একটা ধারণা পাওয়া যায়, দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার মতো পাচার হয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় বলেন, “চামচা পুঁজিবাদ থেকেই চোরতন্ত্র তৈরি হয়েছিল। যাতে রাজনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিচার বিভাগসহ সবাই অংশ নিয়েছে।” বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শুধু বাণিজ্যে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন (৬৮ হাজার ৩০০ কোটি) ডলার পাচার হয়েছে। এর মানে প্রতিবছর শুধু বাণিজ্যে মিথ্যা ঘোষণায় পাচার হয়েছে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিশ্বের ৯টি দেশে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের সম্পদের সন্ধান মিলেছে, ছবি: সংগৃহীত পাচার কেন, কীভাবে হয়?
অবৈধ বা কালো টাকা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত থাকে। কর ফাঁকি, ব্যাংক লুট, মাদক পাচার, মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, দুর্নীতি বা ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সরাসরি ব্যবহার করলে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা অবৈধ টাকার সন্ধান পেলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে থাকে। তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও জেল-জরিমানা করা হয়। যে কারণে কালো টাকা বৈধ বা সাদা করাই থাকে অর্থ পাচারের মূল উদ্দেশ্য। অপরাধীরা মূলত তাদের বেআইনি আয়ের প্রকৃত উৎস ও মালিকানা গোপন করার জন্য অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রমের আশ্রয় নেয়। মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ নিয়ে অপরাধমূলক উৎসটি সম্পূর্ণ লুকিয়ে ফেলা হয়। বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ব্যাংকে রাখারও সুযোগ থাকে না। যে কারণে বিভিন্ন স্তরের জটিল লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে অর্থের বৈধতা নেওয়া হয়। সেখানে নিয়ে অবাধে খরচ করা যায়। অনেকে শেল কোম্পানি (নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান) বা বিদেশি অফশোর ব্যাংকিংয়ে নিরাপদে অর্থ জমা রাখেন।
দেশ থেকে কেউ যে, ব্যাগ বা ব্রিফকেস ভর্তি করে বাইরে নিয়ে যান তেমন না। আবার বাংলাদেশি মুদ্রা যেহেতু আন্তর্জাতিক মুদ্রা না, ফলে টাকা নিয়েও কোনো লাভ নেই। সব সময় আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা ডলার বিদেশে নেওয়া হয়। সাধারণভাবে অর্থ পাচার করা হয় আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণা তথা আন্ডার বা ওভার ইনভয়েসিং এবং হুন্ডির মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন গেমিং, বেটিং তথা অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনোও পুঁজিপাচারের একটি বড় উপায় হয়ে উঠেছে। তবে যেভাবেই পাচার করা হোক, দেশ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়। দেশকে ভঙ্গুরতার দিকে আনার জন্য সবচেয়ে বড় দায় এই অর্থপাচার। একটি রাষ্ট্র স্বাবলম্বী হওয়ার যা প্রধান অন্তরায়। এসব দেশের কষ্টে অর্জিত অর্থের একরকম ভোগবাদী হয়ে যায় উন্নত দেশগুলো।
একটি বিষয় বলে রাখা ভালো– অর্থপাচার সারা বিশ্বের জন্যই অপরাধ। এক সময় সুইস ব্যাংকগুলোতে যে কোনো দেশের নাগরিকদের গোপনে অর্থ রাখার সুযোগ দেওয়া হতো। দেশটির ১৯৩৪ সালের ‘ব্যাংকিং অ্যাক্ট’ অনুযায়ী গ্রাহকের তথ্য কঠোরভাবে গোপন রাখা আইনসিদ্ধ করা হয়। যে কোনো দেশের নাগরিক ব্যক্তিগত নামের পরিবর্তে গোপন কোড বা নির্দিষ্ট নম্বর ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ ছিল। ব্যাংক কর্মকর্তারাও জানতেন না আসল মালিক কে। তবে আন্তর্জাতিক চাপে এখন আগের সেই বিধান নেই। ২০১৮ সাল থেকে সারা বিশ্বের কোনো দেশের নাগরিক বা ব্যাংক সুইজারল্যান্ডে কত অর্থ জমা রেখেছে, তার বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করছে। প্রতি বছরের জুন মাসে যা প্রকাশ করা হয়। মূলত অর্থপাচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) শর্তের কারণে দেশটি আইন সংশোধন করে তথ্য প্রকাশে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশও এফএটিএফের সদস্য।
প্রধান গন্তব্য ধনী দেশ
মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে ধনী দেশগুলো বেশি সোচ্চার। সেখান থেকে পাচার করে অন্য দেশে নেওয়াও জটিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশ থেকে এসব ধনী দেশে অর্থ নেওয়ার নানা উপায় রয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজ ও প্রধান উপায় সেকেন্ড হোম প্রকল্পের মতো নানা উপায়ে বিনিয়োগ করে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে কৌশলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর দুর্নীতিবাজ, অর্থ লুটেরাদের আকর্ষণ করে এসব দেশ। সেকেন্ড হোম কর্মসূচি মূলত দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সরকারি কর্মসূচি বা ‘গোল্ডেন ভিসা’। এর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো দেশের নাগরিক কোনো নির্দিষ্ট দেশে নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ বা আর্থিক সক্ষমতা দেখিয়ে নবায়নযোগ্য আবাসিক ভিসা ও বসবাসের সুবিধা নিতে পারেন।
বাংলাদেশিদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পরিচিত সেকেন্ড হোম কর্মসূচি হলো– ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ বা এমএম২এইচ। অবশ্য অর্থের পরিমাণগত দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে হয়তো লন্ডন তথা যুক্তরাজ্যে। এছাড়া কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড রয়েছে এ তালিকার শীর্ষে। এসব দেশ নানাভাবে অর্থপাচারকারীদের আইনি সুরক্ষা দেয়। আবার বাংলাদেশ থেকে এসব অর্থ যে সোজা পথে নেওয়া হয় তেমন না। সাধারণত প্রথমে করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশে অর্থ নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কেম্যান আইল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ বাংলাদেশিদের কাছে অধিক পরিচিত। এসব দেশে ভুয়া আমদানির এলসির আড়ালে প্রথমে অর্থ নেওয়া হয়। এরপর সামান্য কর দিয়ে সেই অর্থের বৈধতা নেওয়া হয়। এরপর এসব দেশ থেকে উন্নত দেশে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ পাচারের জন্য কয়েক হাত বদল করা হয়। ফলে দেশ থেকে যে অনিয়ম, দুর্নীতি, কর ফাঁকি বা অন্য অপরাধমূলক উপায়ে অর্থ নিয়ে পাচার করেছে, তা প্রমাণ করা জটিল হয়।
ব্যাংক লুট, অনিয়ম, দুর্নীতির বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থপাচারের একটি বড় সংযোগ আছে। মোটাদাগে রাষ্ট্রের সুশাসনে যত ঘাটতি দেখা দেয়, অনিয়ম, দুর্নীতি বেড়ে অর্থ পাচার তত বেড়ে যায়। এটাই এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর এক্ষেত্রে বিশ্বের কাছে এক সেরা উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। করোনা মহামারি অনেকের জন্য দুশ্চিন্তা বয়ে আনলেও অর্থপাচারকারীদের জন্য যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। ২০২০ সালে করোনার সময় ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে একের পর এক নীতি শিথিলতা আনে সরকার। একদিকে ঋণ পরিশোধ না করেও খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। আরেকদিকে কম সুদে ও সহজ শর্তে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। ওই সময় বিনিয়োগের তেমন পরিবেশ ও সুযোগ ছিল না। আবার রপ্তানি আয় বাড়ছিল। এর মধ্যে এরকম নানা সুযোগে দেশ থেকে অর্থপাচার এক ভয়ংকর রূপ নেয়। ২০২১–২২ অর্থবছরে হঠাৎ করে আমদানিতে প্রায় ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। ওই অর্থবছর আমদানি দেখানো হয় ৮ হাজার ৯১৬ কোটি ডলারের। ডলার সংকট দেখা দিলে তখন আমদানিতে তদারকি শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরের বছর আমদানি নেমে আসে ৭ হাজার ৫০৬ কোটি ডলারে। এর ফলে পুরো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংকট তৈরি হয়। ২০২১ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছিল। আওয়ামী লীগ পতনের সময় সেখান থেকে কমে ২৫ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। অবশ্য রিজার্ভ আবার বেড়ে এখন ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। আবার ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দীর্ঘদিন ডলারের দর ৮৪ টাকার আশপাশে ছিল। এক লাফে বেড়ে যা ১২০ টাকা ছাড়িয়েছিল। অর্থপাচারে কড়াকড়ির কারণে রিজার্ভের খানিকটা উন্নতি হয়েছে। আবার ডলারের দরও স্থিতিশীল রয়েছে।
পাচার করা অর্থ কি ফেরত আনা যায়?
পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। বিশেষ করে পাচারকারীদের বেশিরভাগের গন্তব্য উন্নত দেশ হওয়ায় সহজে তাদের সঙ্গে কেউ লড়তে চায় না। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। আর সারা বিশ্বে পাচার করা অর্থ ফেরানোর সফলতার হার ২ শতাংশ। অবশ্য পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবার ও ১০ ব্যবসায়ী গ্রুপের বিষয়ে তদন্তের জন্য চার সংস্থার সমন্বয়ে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়। এসব তদন্তের আলোকে এখন পর্যন্ত দেশে–বিদেশে ৫৭ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা জব্দ হয়েছে। পাচার করা অর্থ ফেরত আনার আইনি কার্যক্রম এগিয়ে নিতে ইতোমধ্যে বিদেশি ল’ ফার্মের সঙ্গে নন–ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সম্পন্ন হয়েছে।
দশ ব্যবসায়ী গ্রুপ হলো– এস আলম, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ পরিবারের আরামিট, নাবিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মালিকানাধীন বেক্সিমকো, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ এবং ডা. ইকবালের মালিকানাধীন প্রিমিয়ার গ্রুপ। প্রথমে এই তালিকায় জেমকন গ্রুপের নাম থাকলেও পরবর্তীতে তাদের পরিবর্তে প্রিমিয়ার গ্রুপকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী– শেখ হাসিনা পরিবার ও ১০ ব্যবসায়ী গ্রুপের দেশে–বিদেশে ৫৭ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা জব্দ করা হয়। এর মধ্যে বিদেশে পাচার হওয়া ১০ হাজার ৪৫২ কোটি এবং দেশে জব্দ হয়েছে ৪৬ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে জব্দ করা ৫৭ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার মধ্যে স্থাবর সম্পত্তি ১৩ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশে রয়েছে ৬ হাজার ৯৭ কোটি টাকা এবং দেশে মাত্র ৭ হাজার ৭৭৫ কোটি। আর ৪৩ হাজার ৩৮৫ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে দেশে রয়েছে ৩৯ হাজার ৩১ কোটি টাকা। বিদেশে ৪ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। বিদেশে জব্দ হওয়া অর্থের মধ্যে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের ১৫ কোটি পাউন্ড এবং বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমানের ছেলে ও ভাতিজার ৯ কোটি পাউন্ডও অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) গত বছর এ অর্থ জব্দ করে।
সম্প্রতি কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিক্যাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে সারাহ কুক জানান, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের ২৫ কোটি পাউন্ডের বেশি মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। জব্দ হওয়া এসব অর্থ যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হতে হবে। আর এ জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণের প্রয়োজন।
জবাবদিহি নিশ্চিতের বিকল্প নেই
অর্থপাচার শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর সরাসরি আঘাত। যে অর্থ দেশের শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ হওয়ার কথা, সেই অর্থ যখন দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতি। বাংলাদেশে অর্থপাচার এখন বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি ক্ষমতা, দুর্নীতি, দুর্বল জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নিয়েছে। ফলে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, প্রয়োজন তার নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগ। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থা, কর প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নতুন করে অর্থ পাচারের পথ বন্ধ করা। নইলে ‘বেগম পাড়া’ শুধু একটি প্রতীক হিসেবেই নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও বৈষম্যের স্থায়ী স্মারক হয়ে থাকবে।
মন্তব্য করুন

