Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

মার্কিন গণমাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রের উপস্থাপন

মার্কিন গণমাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রের উপস্থাপন

দশদিগন্ত

মার্কিন গণমাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রের উপস্থাপন

কাঠামোগত আধিপত্য এবং সংবাদ নির্বাচনের রাজনীতি

Icon

সুমিত রায়

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫১ পিএম

বিশ্বের যেকোনো সাধারণ মানুষের মতো মার্কিন নাগরিকদেরও বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে জানার প্রধান উপায় হলো তাদের নিজস্ব সংবাদমাধ্যম। প্রতিদিন সকালে পত্রিকার পাতা বা সংবাদভিত্তিক চ্যানেলগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, পুরো পৃথিবীটাই যেন তাদের চোখের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। বাস্তবে তারা পৃথিবীর ঠিক ততটুকুই দেখতে পান, যতটুকু তাদের গণমাধ্যমের সম্পাদকরা দেখাতে চান। আন্তর্জাতিক খবরের ক্ষেত্রে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক এবং কাঠামোগত ছাঁকনির ভেতর দিয়ে যায়। যোগাযোগ বিজ্ঞানের অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি ধারণা হলো এজেন্ডা সেটিং, যার প্রবর্তক হিসেবে ম্যাক্সওয়েল ম্যাককম্বস এবং ডোনাল্ড শ ব্যাপকভাবে পরিচিত। তাঁদের এই তত্ত্ব অনুসারে, গণমাধ্যম জনসাধারণকে এটা বলে দিতে পারে না যে তাদের কী চিন্তা করা উচিত, কিন্তু তারা এটা খুব সফলভাবে ঠিক করে দেয় যে দর্শকদের কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে চিন্তা করা উচিত। মার্কিন গণমাধ্যম যখন বিশ্বের দুই শতাধিক দেশের মধ্য থেকে কেবল গুটি কয়েক দেশের খবর নিয়মিত প্রচার করে, তখন সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মনে অবচেতনভাবেই একটি ধারণা জন্ম নেয় যে, পৃথিবীর বাকি দেশগুলোর বোধহয় কোনো বৈশ্বিক গুরুত্ব নেই। এই মনস্তাত্ত্বিক ছাঁকনিটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ফসল।

এই সংবাদ নির্বাচনের পেছনে কাজ করে গেটকিপিং নামের আরেকটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ধারণা, যা প্রথম আলোচনায় আনেন সমাজবিজ্ঞানী কার্ট লিউইন। মার্কিন গণমাধ্যমের বার্তা সম্পাদক বা গেটকিপাররা সাধারণত খবর নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতি এবং কর্পোরেট স্বার্থের একটি অদৃশ্য সীমারেখা মেনে চলেন। গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের স্থায়ী ব্যুরো অফিস বা নিজস্ব সংবাদদাতাদের গুটিয়ে নিয়েছে। এর ফলে তারা আন্তর্জাতিক খবরের জন্য মূলত রয়টার্স বা এপির মতো গুটিকয়েক বৈশ্বিক সংবাদ সংস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যখন পৃথিবীর কোনো প্রান্তে বড় কোনো সংকট তৈরি হয়, তখন তারা সেখানে কয়েকদিনের জন্য সাংবাদিক পাঠিয়ে দেয়, যাকে সাংবাদিকতার ভাষায় 'প্যারাশুট জার্নালিজম' বলা হয়। এই সাংবাদিকরা স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি বা দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে খুব একটা গভীর জ্ঞান রাখেন না। তারা মূলত নিজেদের পশ্চিমা লেন্স বা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঘটনাটিকে মূল্যায়ন করেন এবং খুব দ্রুত একটি চটকদার প্রতিবেদন তৈরি করে দেশে পাঠিয়ে দেন। এর ফলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর যে চিত্র মার্কিন গণমাধ্যমে ফুটে ওঠে, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় খণ্ডিত, একপেশে এবং গভীরতাহীন।

সংবাদ নির্বাচনের এই রাজনীতি বুঝতে হলে আমাদের সংবাদমূল্য সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী ইয়োহান গালতুং এবং মারি রুজ  তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক খবরের ক্ষেত্রে নেতিবাচক এবং সংঘাতপূর্ণ ঘটনাগুলোর সংবাদমূল্য সব সময় বেশি থাকে। মার্কিন গণমাধ্যম এই নীতিরই একটি চরম এবং বাণিজ্যিক রূপ অনুসরণ করে। একটি উন্নয়নশীল দেশে যদি দশটি ভালো কাজ হয়, যেমন শিক্ষার হার বৃদ্ধি বা নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, তবে সেগুলো সাধারণত মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় জায়গা পায় না। কিন্তু সেই একই দেশে যদি কোনো দাঙ্গা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তবে তা সাথে সাথেই ব্রেকিং নিউজ হিসেবে সম্প্রচারিত হতে থাকে। এই ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রচারণার ফলে মার্কিন নাগরিকদের মনে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে একটি স্থায়ী ভীতির জন্ম হয়। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে পুরো পৃথিবীটাই বোধহয় কেবল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি আর সংঘাতের এক বিশাল অন্ধকার প্রান্তর। এই মনস্তাত্ত্বিক ভীতি মার্কিন সরকারকে তাদের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে একটি নীরব জনসমর্থন জুগিয়ে যায়।

প্রাচ্যতত্ত্বের ছায়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপস্থাপন 

মার্কিন গণমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তার পেছনে শত শত বছরের পুরোনো একটি সাংস্কৃতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ফিলিস্তিনি-মার্কিন বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিশ্বনন্দিত গ্রন্থ Orientalism-এ। সাঈদের মতে, পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘকাল ধরে প্রাচ্য বা এশিয়ার দেশগুলোকে নিজেদের একটি বিপরীত সত্তা হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় যুক্তিবাদী, আধুনিক, সভ্য এবং গণতান্ত্রিক হিসেবে। এর ঠিক বিপরীতে তারা প্রাচ্যকে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যকে চিত্রিত করে আবেগপ্রবণ, অসভ্য, রহস্যময় এবং সহিংস হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির নামই হলো প্রাচ্যতত্ত্ব (Orientalism)। আধুনিক মার্কিন গণমাধ্যম এই প্রাচ্যতত্ত্বেরই একটি নতুন এবং ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় বা সংবাদপত্রের পাতায় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো খবর মানেই সেখানে মরুভূমি, উট, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ধ্বংসস্তূপের ছবি অবধারিতভাবে থাকবে। এই অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব কোনো সাধারণ জীবনযাপন, শিল্প-সাহিত্য বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থাকতে পারে - এমন ধারণা মার্কিন মূলধারার গণমাধ্যম সযত্নে এড়িয়ে চলে।


এই স্টিরিওটাইপ বা ছাঁচে ফেলা ধারণার সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাবটি পড়ে আরব এবং মুসলিম পরিচয়ের ওপর। বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর থেকে মার্কিন গণমাধ্যমে ইসলাম এবং মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায় সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে এবং উভয়কেই পশ্চিমা সভ্যতার প্রধান হুমকি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে এখানে ভাষা এবং শব্দের ব্যবহারটি বেশ সুকৌশলী। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাজনৈতিক বা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের পেছনে যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক বা পশ্চিমা হস্তক্ষেপের কারণ থাকতে পারে, তা গণমাধ্যমে খুব কমই বিশ্লেষিত হয়। এর বদলে প্রায় প্রতিটি সংঘাতকেই একটি ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত উন্মাদনা হিসেবে ফ্রেমবন্দি করা হয়। পশ্চিমা দর্শকদের এমনভাবে বোঝানো হয় যেন ওই অঞ্চলের মানুষেরা স্বভাবগতভাবেই সংঘাতপ্রিয় এবং তাদের নিজস্ব কোনো যৌক্তিক চাওয়া-পাওয়া নেই। এই একপেশে প্রচারণার কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের মনে আরব বিশ্ব সম্পর্কে এক ধরনের স্থায়ী বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপকে একটি নৈতিক বৈধতা এনে দেয়।


সাংস্কৃতিক পর্যালোচনার লেন্স থেকে দেখলে বোঝা যায়, এই ধরনের উপস্থাপন মূলত সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ -এর একটি সূক্ষ্ম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। মার্কিন মিডিয়া যখন মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিশৃঙ্খল এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে বারবার প্রচার করে, তখন তারা পরোক্ষভাবে পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক মডেলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করে। গণমাধ্যমে দেখানো হয় যে মধ্যপ্রাচ্যের সমাজব্যবস্থা নারীদের জন্য চরম নিপীড়নমূলক এবং সেখানে মানবাধিকারের কোনো অস্তিত্ব নেই। যদিও এই দাবিগুলোর অনেকগুলোই বাস্তব ভিত্তি রাখে, কিন্তু গণমাধ্যম এগুলোকে এমনভাবে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে যেন পশ্চিমা বিশ্বই হলো সেই একমাত্র ত্রাণকর্তা, যাদের দায়িত্ব ওই অন্ধকার সমাজকে উদ্ধার করা। এই মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান বা ন্যারেটিভ তৈরি করার মাধ্যমে মার্কিন গণমাধ্যম মূলত তাদের রাষ্ট্রের অভিভাবকসুলভ পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে একটি শক্ত জনমত গঠন করে। মধ্যপ্রাচ্যের আসল চেহারা এবং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখের গল্পগুলো এই বিশাল প্রোপাগান্ডার ভিড়ে চিরকাল আড়ালেই থেকে যায়।


লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ফ্রেমিং 


পৃথিবীর মানচিত্রে লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা দুটি বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় মহাদেশ হলেও মার্কিন গণমাধ্যমের চোখে এদের পরিচয় বেশ সংকুচিত। একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কীভাবে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা হবে, তা নির্ধারণ করার প্রক্রিয়াকে যোগাযোগ বিজ্ঞানে ফ্রেমিং তত্ত্ব বলা হয়। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট এন্টম্যান এই তত্ত্বের ব্যাখ্যায় বলেছেন, ফ্রেমিং হলো কোনো বাস্তবতার একটি নির্দিষ্ট অংশকে বেছে নিয়ে তাকে যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি হাইলাইট করা, যাতে করে ওই নির্দিষ্ট ঘটনাটি একটি বিশেষ অর্থ তৈরি করে। মার্কিন গণমাধ্যমে আফ্রিকার খবর প্রচারের ক্ষেত্রে এই ফ্রেমিংয়ের সবচেয়ে নির্লজ্জ এবং রুটিন প্রয়োগ দেখা যায়। আফ্রিকাকে সাধারণত 'অন্ধকার মহাদেশ' হিসেবে ফ্রেম করা হয়, যেখানে খবরের প্রধান বিষয়বস্তু থাকে দুর্ভিক্ষ, মহামারি, অনাহারী শিশু এবং বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আফ্রিকার অনেক দেশে যে দ্রুতগতির নগরায়ণ হচ্ছে, নতুন প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে বা একটি বিশাল শিক্ষিত তরুণ সমাজ তৈরি হচ্ছে - সেই ইতিবাচক গল্পগুলো মার্কিন মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রায় কখনোই জায়গা পায় না।


একইভাবে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতি মার্কিন গণমাধ্যমের একটি নির্দিষ্ট এবং নেতিবাচক স্টিরিওটাইপ রয়েছে। মেক্সিকো, কলম্বিয়া বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলোর খবর মার্কিন টেলিভিশনে এলেই অবধারিতভাবে ড্রাগ কার্টেল, মাদক পাচার, গ্যাং ওয়ার এবং অবৈধ অভিবাসনের বিষয়টি সামনে চলে আসে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে যে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে বা তাদের যে এক সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আছে, তা নিয়ে মার্কিন দর্শকদের খুব একটা ধারণা দেওয়া হয় না। এর পেছনে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক কারণ কাজ করে। লাতিন আমেরিকা ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ব্যাকইয়ার্ড' বা পেছনের উঠান হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অনেক সময় মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। তাই গণমাধ্যমগুলো সুকৌশলে এমন একটি বয়ান তৈরি করে, যেন লাতিন আমেরিকার সরকারগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত এবং তারা তাদের নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ।


এই ধরনের নেতিবাচক ফ্রেমিংয়ের একটি সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা যখন প্রতিনিয়ত এই ধরনের খবর দেখতে থাকেন, তখন তারা ওই দেশগুলোর অভিবাসীদের প্রতি এক ধরনের সন্দেহ এবং ভীতি নিয়ে তাকাতে শুরু করেন। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিবাসন একটি বড় ইস্যু এবং গণমাধ্যমের এই স্টিরিওটাইপগুলো অনেক সময় কট্টরপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের ভোট বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যখন লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার দেশগুলো তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে কথা বলতে চায়, তখন বৈশ্বিক সম্প্রদায় তাদের খুব একটা গুরুত্বের সাথে নেয় না। কারণ গণমাধ্যমগুলো বিশ্ববাসীর মনে এমন একটি ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, এই দেশগুলোর নিজেদেরই কোনো সক্ষমতা নেই, তাই তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও থাকা উচিত নয়। ফ্রেমিংয়ের এই অদৃশ্য দেয়ালগুলো মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশ্বরাজনীতির প্রান্তিক অবস্থানে আটকে রাখার একটি অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।


স্নায়ুযুদ্ধ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ: শত্রু নির্মাণের মনস্তত্ত্ব 


একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিজস্ব অস্তিত্ব এবং সামরিক ব্যয়কে যৌক্তিক প্রমাণের জন্য সব সময় একটি দৃশ্যমান শত্রুর প্রয়োজন হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তাদের গণমাধ্যমগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে হাত মিলিয়ে যুগের পর যুগ এই শত্রু নির্মাণের কাজটি নিখুঁতভাবে করে আসছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বৈশ্বিক কমিউনিজম। সেই সময়ে গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত এমন সব খবর এবং বিশ্লেষণ প্রচার করা হতো, যাতে সাধারণ মার্কিনীদের মনে পরমাণু যুদ্ধের ভীতি এবং কমিউনিস্ট আগ্রাসনের আতঙ্ক স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি এবং এডওয়ার্ড হারম্যান তাঁদের বিখ্যাত Manufacturing Consent বইয়ে প্রোপাগান্ডা মডেল এর কথা বলেছেন। এই মডেল অনুযায়ী, গণমাধ্যমগুলো সমাজের প্রভাবশালী এলিট শ্রেণি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষের মতামতকে এমনভাবে তৈরি করে, যাতে রাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসী সিদ্ধান্তকেও জনগণের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়।


নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সেই পুরোনো শত্রুর আর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বিশ্বরাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়, যা মার্কিন সামরিক এবং কর্পোরেট স্বার্থের জন্য বেশ চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য গণমাধ্যমগুলো খুব দ্রুতই নতুন শত্রুর সন্ধান শুরু করে এবং নাইন-ইলেভেনের পর তারা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যবস্তু পেয়ে যায়। শুরু হয় 'ওয়ার অন টেরর' বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নতুন যুগ। গণমাধ্যমগুলো রাতারাতি তাদের ফোকাস পরিবর্তন করে এবং নতুন শত্রু হিসেবে বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদকে সামনে নিয়ে আসে। চমস্কি এবং হারম্যানের তাত্ত্বিক লেন্স থেকে দেখলে বোঝা যায়, এখানেও সেই পুরোনো সম্মতি উৎপাদনের প্রক্রিয়াটিই নতুন মোড়কে ব্যবহৃত হয়েছে। ইরাক বা আফগানিস্তানে সামরিক অভিযানের আগে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে এমন একটি বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয় যে ওই দেশগুলোতে হামলা করা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার আর কোনো উপায় নেই।


শত্রু নির্মাণের এই মনস্তাত্ত্বিক খেলাটি মূলত ভয় বা ফিয়ার সাইকোলজির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। গণমাধ্যম প্রতিনিয়ত এমন সব শব্দ ব্যবহার করে - যেমন 'অ্যাক্সিস অব ইভিল' বা শয়তানের অক্ষশক্তি, যা মানুষের আদিম ভীতিকে উসকে দেয়। এই শব্দগুলো কোনো নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার অংশ নয়; এগুলো মূলত রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার একেকটি ধারালো অস্ত্র। যখন একটি পুরো রাষ্ট্র বা অঞ্চলকে খলনায়ক হিসেবে ফ্রেমবন্দি করা হয়, তখন ওই দেশের সাধারণ মানুষের জীবন বা মৃত্যুর খবরের কোনো সংবাদমূল্য থাকে না। মার্কিন গণমাধ্যমে ইরাক বা আফগানিস্তানে নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যার চেয়ে মার্কিন সৈন্যদের বীরত্বের গল্পগুলো অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়। এর ফলে সাধারণ মার্কিন দর্শকদের মনে এক ধরনের নৈতিক অন্ধত্ব তৈরি হয়। তারা বুঝতে পারেন না যে তাদের দেশ বাইরের পৃথিবীতে ঠিক কী ধরনের মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে। রাষ্ট্র এবং গণমাধ্যমের এই সম্মিলিত আঁতাত মূলত বিশ্বরাজনীতিকে একটি স্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে শান্তির চেয়ে যুদ্ধের খবর বিক্রি করেই বেশি মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়।


সফট পাওয়ার, বিনোদন মাধ্যম এবং পাল্টা আখ্যান 


বিদেশি রাষ্ট্রের উপস্থাপন কেবল প্রথাগত খবরের কাগজ বা নিউজ চ্যানেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হলিউডের চলচ্চিত্র, নেটফ্লিক্সের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সিরিজ এবং জনপ্রিয় পপ সংস্কৃতির মাধ্যমে এই ন্যারেটিভগুলো মানুষের মনের অনেক গভীরে প্রোথিত হয়। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসেফ নাই এই ক্ষমতাটিকে সফট পাওয়ার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। সফট পাওয়ার হলো অন্য দেশকে সামরিক শক্তি দিয়ে বাধ্য না করে, নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করে বশ করার একটি নীরব কৌশল। হলিউডের অ্যাকশন সিনেমা বা স্পাই থ্রিলারগুলোতে খেয়াল করলে দেখা যাবে, ভিলেন বা খলনায়ক চরিত্রগুলো সাধারণত রাশিয়ান, চাইনিজ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নাগরিক হয়। এই সিনেমাগুলোতে দেখানো হয় যে বাইরের পৃথিবীটা চরম বিশৃঙ্খল এবং একমাত্র মার্কিন নায়করাই তাদের মেধা এবং প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে। বিনোদনের এই রঙিন মোড়কে মোড়ানো বার্তাগুলো সাধারণ দর্শকরা খুব সহজেই গ্রহণ করেন এবং অবচেতনভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব-মোড়ল পরিচয়টিকে বৈধতা দিয়ে দেন।


তবে বিশ্বায়নের এই যুগে এসে মার্কিন গণমাধ্যমের এই একচেটিয়া আধিপত্য বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে এখন তথ্যপ্রবাহ কেবল একমুখী নেই। ব্রিটিশ যোগাযোগ গবেষক অ্যান্ড্রু চ্যাডউইক আধুনিক গণমাধ্যমের এই নতুন রূপটিকে হাইব্রিড মিডিয়া সিস্টেম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ব্যবস্থায় প্রথাগত গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে একটি নতুন ধরনের পাল্টা আখ্যান বা কাউন্টার-ন্যারেটিভ তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আল-জাজিরার মতো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলো যখন মধ্যপ্রাচ্যের খবরগুলো একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রচার করতে শুরু করে, তখন পশ্চিমা গণমাধ্যমের দীর্ঘদিনের সেট করা এজেন্ডাগুলো বড় ধরনের ধাক্কা খায়। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নাগরিক সাংবাদিকরা এক্স বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের দেশের আসল চিত্রগুলো সরাসরি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছেন, যা মার্কিন গণমাধ্যমের তৈরি করা স্টিরিওটাইপগুলোকে প্রতিনিয়ত ভেঙে দিচ্ছে।


এই পাল্টা আখ্যানগুলোর উত্থান বিশ্বরাজনীতিতে এক নতুন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বুঝতে পারছে যে, কেবল সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা আর সম্ভব নয়। তথ্যের এই বহুমুখী প্রবাহের যুগে সাধারণ মানুষের মন জয় করাটাই এখন সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নশীল দেশগুলোও ধীরে ধীরে নিজেদের গণমাধ্যম এবং বিনোদন শিল্পকে শক্তিশালী করছে, যাতে তারা আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের গল্পগুলো নিজেদের মতো করে বলতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ বা ল্যাটিন আমেরিকার টেলিভিশন সিরিজের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের পুরোনো দেয়ালগুলো এখন আর আগের মতো মজবুত নেই। মার্কিন গণমাধ্যমে বিদেশি রাষ্ট্রকে হেয় করার যে প্রথাগত ছক, তা হয়তো রাতারাতি বন্ধ হবে না, তবে সেই ছকের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর সচেতনতা এবং প্রতিরোধ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ডিজিটাল এবং হাইব্রিড মিডিয়ার যুগে সত্য আর কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় বন্দি নেই; এটি এখন অসংখ্য কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীতে অনুরণিত হচ্ছে।


মন্তব্য করুন

Logo