আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ভারত সফরকে অনেকেই কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য কিংবা প্রতীকী সফর হিসেবে দেখলেও, এর অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। জয়পুর, আগ্রা কিংবা তাজমহল ভ্রমণের আড়ালে মূল আলোচনায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র–ভারত ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ চুক্তি’ (ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ডিল) এবং ফিজিতে কোয়াডের নতুন বন্দর প্রকল্প। সমালোচকদের ভাষায়, এই দুই উদ্যোগ আসলে একই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের দুই রূপ—একদিকে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব বিস্তার।
এই সফরের আসল হাইলাইটস ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ চুক্তি’ (ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ডিল) এবং ফিজিতে কোয়াডের নতুন বন্দর প্রকল্প বাস্তবায়নে সমঝোতা, যাকে ইতোমধ্যে ভারতের অনেকে ‘একই নোংরা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ বলে সমালোচনা করছেন।
এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা ও তার মিত্রদের কাছে কাঁচা বিরল মৃত্তিকা খনিজ—বিশেষ করে নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম এবং মোনাজাইটসমৃদ্ধ উপকূলীয় বালু সরবরাহের জন্য ভারতকে কার্যত আবদ্ধ করা হলো। ভারতে এসব বিরল মৃত্তিকা উপাদান আহরণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো আইআরইএল (ইন্ডিয়া) লিমিটেড। এই ভারতীয় অপারেটরের প্রধান বিদেশি অংশীদার জাপানের টয়োটা সুশো কর্পোরেশন, যারা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান টয়োটসু রেয়ার আর্থস ইন্ডিয়ার মাধ্যমে বহু বছর ধরে আইআরইএল থেকে প্রক্রিয়াজাত বিরল মৃত্তিকা উপাদান সংগ্রহ করে আসছে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হলো যুক্তরাষ্ট্রও।
এখানে এমন একটি স্তর রয়েছে, যা খুব কম মানুষই উচ্চস্বরে বলার সাহস পায়—এই খনন কার্যক্রমের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়বে কেরালার চভরা এবং তামিলনাড়ুর মানাভালাকুরিচির উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। মোনাজাইটের উপস্থিতির কারণে অঞ্চলগুলো ইতোমধ্যেই উচ্চমাত্রার প্রাকৃতিক বিকিরণে আক্রান্ত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বিষাক্ত ভারী ধাতু ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের কারণে সেখানকার মাটি ও পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে এবং ধ্বংস হচ্ছে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, চর্মরোগসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার অভিযোগ জানিয়ে আসছেন।
এই নতুন চুক্তি সেই ধ্বংসযজ্ঞকে আরও তীব্র করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। মৎস্যজীবীরা হারাতে পারেন তাদের সমুদ্রসৈকত ও জীবিকা। ভূগর্ভস্থ পানি আরও বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। পুরো অঞ্চলজুড়ে বাড়তে পারে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের প্রকোপ, যার প্রভাব বহন করতে হবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য জমি, সমুদ্র ও বাতাস—সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে ভারত সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার পথে হাঁটছে বলেই সমালোচকদের অভিযোগ। এর লক্ষ্য মূলত চীনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জোটের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করা।
এছাড়া রুবিওর ভারত সফরকালে ঘোষিত ফিজিতে কোয়াডের বন্দর প্রকল্পকে অনেকেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা ব্লকের কৌশলগত আউটপোস্টে পরিণত করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নয়; এটি ক্ষমতা, প্রভাব এবং বৈশ্বিক আধিপত্যের রাজনীতি। ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ নামে প্রচারিত এসব চুক্তি বাস্তবে যদি উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তোলে, তবে তা উন্নয়ন নয়—বরং নতুন ধরনের ভূ-রাজনৈতিক উপনিবেশ গঠনের পথই প্রশস্ত করবে। রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক অর্জনের পেছনে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা কতটা বলি হচ্ছে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন

