Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

আবদেল মাহদির অন্তহীন বাস্তুচ্যুতির গল্প

আবদেল মাহদি আল-উহেইদি ও তাঁর স্ত্রী, ছবি: সংগৃহীত

দশদিগন্ত

নাকবা থেকে গাজার ধ্বংসস্তূপ

আবদেল মাহদির অন্তহীন বাস্তুচ্যুতির গল্প

Icon

শুভ্র মিসির

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১২:৫১ এএম

ফিলিস্তিনের উত্তর গাজার জাবালিয়ায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি আধাভাঙা ঘরের ভেতরে আগুনের পাশে বসে থাকা মানুষটির নাম আবদেল মাহদি আল-উহেইদি। বয়স ৮৫ বছর। তাঁর চারপাশে ভাঙা দেয়াল আর ধ্বংসের চিহ্ন। চোখদুটি সামনের ধ্বংসস্তূপের দিকে—এসবের মাঝে বসে তিনি হয়তো খুঁজে ফিরছেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া সময় আর একসময়ের আনন্দঘন, নিরাপদ জীবন।
পাশে বসা স্ত্রী আজিজা, তাঁর বয়সও আশির কোঠায়। প্রায় ছয় দশক আগে বিয়ে হয়েছিল তাঁদের। ঘটনাবহুল দীর্ঘ সময় তাঁরা একসঙ্গে পার করলেও তাঁদের কোনো সন্তান নেই; এই দম্পতি নিঃসন্তান। তবুও তাঁরা নিজেদের কখনও একা ভাবেননি। আবদেল মাহদি তাঁর ছোট ভাইয়ের পাঁচ সন্তানকে নিজের ছেলে-মেয়ের মতোই লালন করেছেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ছোট শিশু সন্তানদের দায়িত্ব নেন তিনি। তাঁদের বড় করে তোলা, লেখাপড়া থেকে বিয়ে—সবকিছুর পেছনেই ছিল আবদেল মাহদির পরিশ্রম আর ত্যাগ। সেই ছেলেরা আজ পরিবার নিয়ে বেঁচে আছে, কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় তাঁদের জীবনও তছনছ হয়ে গেছে।
আবদেল মাহদির জন্ম ১৯৪০ সালে। তখন ফিলিস্তিন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূখণ্ড। সেখানে গ্রাম ছিল, চাষাবাদ ছিল, গবাদিপশু ছিল আর ছিল একটি স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু মাত্র আট বছর বয়সেই শিশু আবদেল মাহদির অভিজ্ঞতা হয় ১৯৪৮ সালের মর্মান্তিক ‘নাকবা’র। ফিলিস্তিনিদের কাছে নাকবা মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি জাতিগত বিপর্যয়, উচ্ছেদ এবং শেকড় হারানোর করুণ, বেদনাদায়ক ইতিহাস। যার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় প্রায় সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনিকে তাঁদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আসতে বাধ্য করা হয়।
সে সময় আবদেল মাহদি শিশু হলেও তাঁর মনে নাকবার স্মৃতি এখনও জীবন্ত। তিনি স্মৃতিচারণ করেন, তাঁদের বাড়ি ছিল বির আল-সাবা এলাকায়, যা বর্তমানে বেরশেবা নামে পরিচিত। এটি ছিল নাকাব মরুভূমির একটি বড় শহর। তাঁদের পরিবার ছিল কৃষিভিত্তিক। জমি, পশু আর পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে তাঁরা স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছিলেন।

আবদেল মাহদি, ছবি: সংগৃহীত

তিনি স্মরণ করেন, একসময় এলাকায় খবর ছড়িয়ে পড়ে যে জায়নবাদী হাগানাহ মিলিশিয়াদের দল এগিয়ে আসছে। পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলছিল পালিয়ে যেতে হবে, কেউ বলছিল লড়তে হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ পরিবারই সিদ্ধান্ত নেয়, সাময়িকভাবে গাজায় চলে যাবে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, কয়েক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি শান্ত হলে সবাই আবার ফিরে আসবে।
সেই বিশ্বাস নিয়েই অনেকের সঙ্গে আবদেল মাহদির পরিবারও বাড়ি ছাড়ে। সঙ্গে নেয় সামান্য টাকা, কিছু কাপড়, গবাদিপশু আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। দিনের পর দিন হেঁটে তাঁরা গাজার পথে যাত্রা করেন। সেই পথ ছিল কঠিন, অনিশ্চিত এবং ক্লান্তিতে ভরা। ছোট্ট আবদেল মাহদি তখন পরিবারের সঙ্গে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন সেই পথ। সে সময় তিনি কিংবা তাঁর মতো প্রায় সবাই বুঝতেই পারেননি, এই যাত্রার মধ্য দিয়ে আসলে তাঁরা নিজেদের জন্মভূমি চিরতরে হারিয়ে ফেলছেন।
আবদেল মাহদি বলেন, ‘আমরা কখনও ভাবিনি এটা স্থায়ী নির্বাসন হয়ে যাবে। আমরা ভেবেছিলাম, কিছুদিন পরই ফিরে যাব।’ গাজায় পৌঁছে প্রথমে তাঁরা জেইতুন এলাকায় আশ্রয় নেন। পরে চলে আসেন জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে। সেখান থেকেই শুরু হয় জীবনের কঠিনতম অধ্যায়। তাঁবুর মধ্যে কাটত দিনরাত্রি। শীতকালে বৃষ্টিতে তাঁবু প্লাবিত হতো, হিমশীতল ঠান্ডায় জমে যেত শরীর। গ্রীষ্মকালে অসহনীয় গরমে মানুষ পুড়ে যেত। খাবারের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো তো ছিল নিত্যদিনের কষ্ট। এছাড়াও পানির সংকট ছিল ভয়াবহ, শৌচাগারগুলোও ছিল চরম অস্বাস্থ্যকর। রোগব্যাধি, উকুনের সমস্যা আর অপুষ্টি ছিল মানুষের নিত্যসঙ্গী।
এই দুর্বিষহ জীবনের মধ্যেও একটি ‘আশা’ তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছিল—সেটি হলো আপনভূমিতে ফিরে যাওয়ার আশা। আবদেল মাহদি বলেন, ‘আমার বাবা ও দাদা সবসময় বলতেন, “আমরা একদিন ফিরে যাব।” তাঁরা আমাদের ও আমাদের সন্তানদের বলতেন, কখনও নিজেদের ভূমির দাবি ভুলে যেও না।’ কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরণার্থী শিবিরই হয় তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা।
নিজের যৌবনে আবদেল মাহদি ইসরায়েলে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। সে সময় কিছু ফিলিস্তিনি শ্রমিককে সীমিতভাবে কাজের অনুমতি দেওয়া হতো। দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি ও তাঁর ভাইয়েরা ধীরে ধীরে অর্থ সঞ্চয় করে নতুন বাড়ি তৈরি করেন এবং কিছু জমি কেনেন। এভাবে বহু বছর কষ্টের সময় পার করে তাঁরা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো অস্থির জীবনের কিছুটা স্থিতি ফিরে এসেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, অবশেষে হয়তো ক্ষত কিছুটা শুকিয়েছে। এখানে আমরা আবার নতুন জীবন শুরু করতে পেরেছি।’ কিন্তু সেই স্বপ্নও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ইসরায়েলি হামলায় সব স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ তথা হামলা শুরু হলে তাঁদের জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। বৃদ্ধ আবদেল মাহদি, এখন যার চলাফেরা করতে কষ্ট হয়, তাঁকে তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়েই জীবন বাঁচানোর তাগিদে পালাতে হয়।
তিনি জানান, প্রথমে সবাইকে নিয়ে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে আশ্রয় নেন। হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের মতো তিনিও নিরাপত্তা খুঁজছিলেন। কিন্তু একদিন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সেখানেও অভিযান চালায়। তিনি স্মরণ করেন, হঠাৎ চারদিকে গুলির শব্দ, মানুষের চিৎকার, আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেনারা লাউডস্পিকারে সবাইকে গাজার দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। সেদিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমাকে আর আমার স্ত্রীকে একে অপরের ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে হয়েছিল। অনেকেই বের হতে পারেনি, তারা সেখানেই মারা গেছে।’
এরপর শুরু হয় নতুন এক দুর্ভোগ। কখনও পশ্চিম গাজার সমুদ্রতীর এলাকায়, কখনও মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় আশ্রয় নিতে হয়। দিনের পর দিন তাঁবুতে, বালুর ওপর অনাহারে আর আতঙ্কে কেটেছে সময়। তিনি বলেন, ‘বাস্তুচ্যুতি মানুষের সম্মান কেড়ে নেয়। মানুষ যখন নিজের ঘর ছাড়ে, আসলে তখন সে সবকিছু হারিয়ে ফেলে।’

আবদেল মাহদি, ছবি: সংগৃহীত

খাবারের সংকট, ওষুধের অভাব, বিশুদ্ধ পানির অভাব—সব মিলিয়ে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল জীবন। আবদেল মাহদি বলেন, ‘সে সময় আমি শুধু মৃত্যুই কামনা করেছি। আমি শুধু একটি দেয়াল চেয়েছি, যেখানে হেলান দিয়ে আমি একটু বিশ্রাম নিতে পারি।’
২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতির পর উত্তর গাজার বাসিন্দাদের ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়। সে সময় আবদেল মাহদিও নিজের এলাকায় ফিরে আসেন। কিন্তু ফিরে এসে যা দেখেন, তা তাঁর হৃদয় ভেঙে দেয়। নিজ শহর জাবালিয়া তখন আর সেই আগের জাবালিয়া নেই। পুরো এলাকাই পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। রাস্তাঘাট ভাঙা, বাড়িঘর সব নিশ্চিহ্ন, চারদিকে শুধু ধুলোবালি আর ধ্বংসের চিহ্ন। আবদেল মাহদি এখন লাঠি নিয়ে চলাফেরা করেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে কয়েকবার পড়েও গেছেন। তবুও তিনি নিজের ভাঙা বাড়ির কাছেই ফিরে আসেন বারবার।
আবদেল মাহদি বলেন, ‘আমি জীবনে বহু যুদ্ধ দেখেছি—১৯৪৮ সালের নাকবা, ১৯৫৬ সালের হামলা, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা এবং গাজার আগের যুদ্ধগুলো। কিন্তু এবার ইসরায়েল যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা আগের সবকিছুর চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। আগেও যুদ্ধ হতো, তারপর ইসরায়েলি বাহিনী চলে যেত। কিন্তু বর্তমানে গাজার অনেক বড় অংশ দখল হয়ে গেছে। প্রতিদিনই গুলির শব্দ শুনতে পাই।’
গাজার সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আরব বিশ্বের ভূমিকা নিয়েও তাঁর মনে গভীর হতাশা। তিনি মনে করেন, ফিলিস্তিনিরা সবসময়ই একা ছিল। তিনি বলেন, ‘বারবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি একইভাবে হচ্ছে। আমাদের প্রতিবারই একা ফেলে রাখা হয়েছে।’ তাঁর মতে, বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে গাজার মানুষের জীবন বদলায়নি। সীমান্ত খোলা, সাহায্য পৌঁছানো বা জীবনযাত্রার উন্নতির যে আশ্বাস দেওয়া হয়, সেগুলো তাঁর কাছে এখন ফাঁকা বুলির মতো মনে হয়।
এত যুদ্ধ, কষ্ট, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি আর ধ্বংসের পরও আবদেল মাহদির মন থেকে একটি জিনিস হারায়নি—তা হলো নিজের মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘নিউইয়র্কে যদি আমাকে একটি প্রাসাদও দেওয়া হয়, আমি সেটি ফিরিয়ে দেব, তবুও এই ভাঙা বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না।’
তাঁর বর্তমান জীবন যতই বেদনাবিধুর হোক না কেন, আবদেল মাহদি আগের চেয়ে আরও দৃঢ়চিত্তে সংকল্প করেছেন—নিজ ভূমি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কারণ তিনি মনে করেন, ‘যারা অনেক আগে চলে গিয়েছে, তারা আর কখনো ফিরে আসেনি।’ তাই সবকিছু হারিয়েও তিনি নিজের মাটিতেই থাকতে চান। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আবদেল মাহদি তাই বলতে পারেন—‘আমার মৃত্যু এখানে হবে, আর আমার কবরও হবে এখানেই।’
[আল জাজিরা অবলম্বনে]

মন্তব্য করুন

Logo