Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

ভারতে প্রধান বিচারপতির উচ্চারণে ‘নাৎসি’ প্রতিধ্বনি

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত

দশদিগন্ত

ভারতে প্রধান বিচারপতির উচ্চারণে ‘নাৎসি’ প্রতিধ্বনি

Icon

কাভার স্টোরি ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে ১৫ মে ২০২৬ হয়তো একটি বিতর্কিত দিন হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী–এর ডিভিশন বেঞ্চে একটি মামলার শুনানিকালে উচ্চারিত কিছু মন্তব্য দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মামলাকে ঘিরে। এক আইনজীবী দিল্লি হাইকোর্টে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ হিসেবে মনোনয়নের জন্য তদবির বা ‘পার্সুইং’ করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রধান বিচারপতির অপছন্দ হয় এবং শুনানিকালে তিনি আবেদনকারীকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু সেই ক্ষোভ দ্রুতই ব্যক্তিগত সমালোচনার সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজের এক অংশের দিকে ধাবিত হয়।
প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, দেশে এমন কিছু তরুণ রয়েছে যারা কর্মসংস্থান পায় না বা পেশাগত জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়ে ‘তেলাপোকার মতো’ আচরণ করছে। তাঁর ভাষায়, এদের কেউ মিডিয়াকর্মী, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট, কেউ তথ্য অধিকার (RTI) কর্মী হয়ে ‘সবাইকে আক্রমণ’ করতে শুরু করে। তিনি আরও বলেন, আদালতগুলোতে ‘ভুয়া মানুষ’ কালো কোট পরে ঘুরছে, যাদের আইন ডিগ্রির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াকেও তিনি এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা না নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে সমালোচনা করেন।
বিচারপতির এই মন্তব্যের পরপরই সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সমালোচকদের প্রশ্ন—ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি কি এভাবে ঢালাওভাবে তরুণ সমাজ, সাংবাদিক, আইনজীবী, আরটিআই কর্মী বা সামাজিক কর্মীদের ‘তেলাপোকা’, ‘পরজীবী’ বা ‘প্যারাসাইট’ বলতে পারেন? কারণ বিচারপতি তো কেবল ক্ষমতাসীনদের নয়, সমালোচক ও বিরোধীদেরও শেষ আশ্রয়স্থল। তাঁর ভাষা তাই শুধু ব্যক্তিগত মত নয়; তা বিচারব্যবস্থার নৈতিক অবস্থানকেও প্রতিফলিত করে।
ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে তদন্ত সংস্থা কিংবা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধান বিচারপতির বক্তব্য অনেকের কাছে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কারণ, তাঁর ব্যবহৃত শব্দচয়ন ভারতীয় রাজনীতির বহুল ব্যবহৃত এক ধরনের বিভাজনমূলক ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
সমালোচকরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অতীতে অনুপ্রবেশকারীদের ‘ছারপোকা’ বা ‘ঘুসপেটিয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২১ সালে আন্দোলনকারীদের ‘আন্দোলনজীবী’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের ‘প্যারাসাইট’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। ইতিহাস বলছে, মানুষকে অমানবিক বা কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করার ভাষা বহুবার ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার ভূমিকা তৈরি করেছে।
জার্মানির নাৎসি প্রচারণায় ইহুদিদের ‘জোঁক’ ও ‘পরজীবী’ বলা হতো। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যা-র আগে ও চলাকালে তুতসি জনগোষ্ঠীকে ‘ইনেয়ানজি’ বা ‘তেলাপোকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। সেই ঘৃণাভাষণ শেষ পর্যন্ত কয়েক মাসের মধ্যেই লাখো মানুষের হত্যাযজ্ঞে রূপ নেয়।
এই প্রসঙ্গে ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল–এর একটি বহুল উদ্ধৃত পর্যবেক্ষণ আবার সামনে এসেছে: ‘মানুষের চিন্তার কারণে যেমন ভাষা দূষিত হতে পারে, তেমনি ভাষার কারণেও চিন্তা দূষিত হতে পারে।’ বিচারপতির বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে মূলত এই ভাষার প্রশ্নটিই রয়েছে।
অবশ্য অনেকে প্রধান বিচারপতির ক্ষোভের পেছনের বাস্তবতাকেও পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না। ভারতের বিচারব্যবস্থা, আইনপেশা, মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অসততা, ভুয়া তথ্য, পেশাগত অনৈতিকতা বা সুযোগসন্ধানী আচরণ নিয়ে সাধারণ মানুষের বিরক্তি আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসব সমস্যার সমালোচনা করতে গিয়ে একজন প্রধান বিচারপতি কি পুরো একটি প্রজন্ম, বেকার যুবসমাজ কিংবা নাগরিক অধিকারভিত্তিক কর্মসূচিকে অপমানজনক শব্দে চিহ্নিত করতে পারেন?
ভারতের শ্রমবাজারের বাস্তবতা বলছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। বহু তরুণ কাজের অভাবে বিকল্প পেশা, ফ্রিল্যান্সিং, অ্যাক্টিভিজম কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হচ্ছেন। তাঁদের সবাইকে ‘পরজীবী’ হিসেবে চিত্রিত করা তাই শুধু অসংবেদনশীলই নয়, সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করারও নামান্তর বলে মনে করছেন অনেকে।
দিনশেষে ওই আইনজীবী ক্ষমা চেয়ে তাঁর আবেদন প্রত্যাহার করে নিলেও বিতর্ক থামেনি। বরং ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যটি ভারতের বিচারব্যবস্থার ভাষা, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কারণ আদালতের রায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের ভাষাও। আর সেই ভাষা যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে উচ্চারিত হয়, তখন তার প্রতিধ্বনি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায়।

মন্তব্য করুন

Logo