সুফিয়া কামাল: অসম্পূর্ণ রেখাচিত্র
সুলতানা কামাল, মানবাধিকারকর্মী
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
মাতৃ বিয়োগ প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনের অত্যন্ত সাধারণ অভিজ্ঞতা।
মা-বাবা আমাদের পৃথিবীর আলো দেখান, বড় করে তোলেন, ভাল মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টায় ব্রতী থাকেন,আমাদের জীবন জুড়ে থাকেন তাঁরা। একটা সময় তাঁরা প্রয়াত হবেন, সব সন্তানের মনোজগতেই এই কষ্টের শংকাটা সুপ্ত থাকে। তাঁরা যখন বেঁচে থাকেন ভয় হয় মনে যে তাঁদের মৃত্যুশোক বুকে চেপে কি ভাবে দিন কাটবে আমাদের। কিন্তু দিন কেটে যায় দিনের নিয়মে, শোক কখনো প্রশমিত হয় কি না জানি না, তবে সেই শোকের সাথে আমরা মানিয়ে চলি, তাকে মেনে চলি। কন্যা হিসাবে সেই চেষ্টাই করে চলেছি।
তাঁর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কত ঘটনাই একে একে ছবির মত ভেসে ওঠে। ছয় ভাইবোনের পঞ্চম জন আমি। আমার যে বাড়ীতে জন্ম সেটা ছিল নানা গাছ গাছালির আর তিনটা পুকুর নিয়ে এগারো বিঘা জমির একটা বাগান বাড়ীর অনেকগুলি বাড়ীর মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাড়িটা। তবে সেই বাড়ীর সামনে ছিল বিস্তৃত উঠান, তার এক পাশে বিশাল আমবাগান, নানা রকম বড়ই এর গাছ, সুপারী গাছের সারি দিয়ে ঘেরা পুকুর যেটা গিয়ে মিশেছিল আর একটি পুকুরের সাথে। সেই পুকুরের পাড়ে ছিল একটা অশোক ফুলের গাছ। অশোক ফুল ফুটে যখন ঝরে ঝরে পড়ত, তখন পুকুরের পানিটা রঙ্গিন হয়ে উঠতো।
আমাদের বাড়ীতে বেশ বড় একটা টানা বারান্দা ছিল। আমরা রাতে ঘুমাতে যাবার আগে পর্যন্ত সেই বারান্দা আর উঠানেই আমাদের যত কর্মকান্ড, লেখাপড়া আর খেলাধুলা।
বারান্দার এক প্রান্তে ছিল আমাদের রান্নাঘর। আমার বাবা বলতেন সেটা " সুফিয়া কামালের বৈঠকখানা।" সে কথা বলার কারন হ'ল মা নিজের হাতে রান্না করতেন বলে সকালের দিকে তাঁর বেশীরভাগ সময় কাটতো রান্নাঘরেই। সেই সময়টায় যারা মার সাথে কাজের কারনে বা গল্প করতে আসতেন তারা ঐ রান্নাঘরের দরজার সামনে রাখা মোড়ায় বসেই তা সমাধা করতেন। আমরা একেবারে ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে আসতাম দুপুরের আগেই। এসেই মাকে পেতাম রান্নাঘরে। দরজার সামনে বসেই কিছু খাবার খেয়ে হয় উঠানে এক্কাদোক্কা খেলতে ছুটতাম নয় অন্য খেলাধুলার টানে। কিন্তু সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল মাকে আমার রবীন্দ্রনাথের নানা কবিতা পড়ে শোনানো আর ছোটবোনের গানের গলা ছিল বলে তার রবীন্দ্রনাথের গান শোনানো ।
আমাদের বাড়ীর সামনের উঠান পেরিয়ে যে পুকুরটা ছিল তার অপর পারে বাস ছিল ফরিদা বারি মালিক আর তার পরিবারের। আমরা তাঁকে তাঁর ডাক নামে বীথি আপা বলেই সম্বোধন করতাম। বীথি আপা শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি প্রায়ই সেই সময় এসে সেই রান্নাঘরের সামনে বসেই মাকে মার পছন্দের গান শোনাতেন। আমরাও খেলতে খেলতে সে সব গান মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আর একটা সময় আমাদের খুব প্রিয় ছিল। মা যখন কাপড় ধোবার জন্য পুকুরে যেতেন, আমরা মার পিছন পিছন আমাদের কাপড় চোপড় নিয়ে চলতাম। মা কাপড় কাচতে কাচতে আমাদের সুখু -দুখু , পান্তাবুড়ি, ঊকুনে বুড়ি আর চাঁদের মা বুড়ীর গল্প বলতেন। কাপড় কাচার মত অতি সাধারণ দৈনন্দিন কাজ আমাদের কাছে হয়ে উঠতো অনন্য। মার গান শোনার আর একটা প্রিয় সময় ছিল সন্ধ্যাবেলা পুকুর পাড়ে।
সেই আসর ছিল আমাদের প্রিয় ভাবী -মার প্রিয় বৌমা নার্গিস জাফর ( সিকান্দার আবু জাফরের স্ত্রী) আর পাড়ার মেয়ে পারুলের গানের।
তারই ফাঁকে ফাঁকে কত মানুষের আনাগোনা। কত জনের নাম করব! কেউ আসতেন সভা-সমিতির কাজে, কেউ মার লেখা নিতে। কারো কাছ ছিল পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সমিতি গড়ে তোলার জন্য পরামর্শ করা। মনে পড়ে সেই তরুন বয়সের দাদাভাই রোকনুজ্জামান খান সাইকেলে চড়ে এলেন। সাইকেলটা বড়ই গাছের সাথে হেলান দিয়ে রেখে মার সাথে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তাঁর কিছুদিন পরেই আমাদের উঠানে বসেই অনুষ্ঠিত হ'ল কচি-কাঁচার মেলা গঠনের সভা। প্রতিষ্ঠিত হ'ল দেশের সবচেয়ে বড় শিশু সংগঠন।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী। সরকারী বাধার মুখে সংস্কৃতি কর্মীরা প্রতিবাদী হয়ে যায় উঠলেন। নানা জূলুম আর হয়রানির ঝুঁকি নিয়েও তাঁরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। অবধারিত ভাবেই সুফিয়া কামাল তাতে নেতৃত্ব দেন।
এর কিছুদিন পরেই আমরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রাস্তায় নিজেদের বাড়ীতে উঠে আসি। সেই সময় থেকে সুফিয়া কামালকে ঘিরে কর্মকান্ডের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ালো আমাদের ধানমন্ডির বাড়ীর বারান্দা। বাঙ্গালী সংস্কৃতির উপর পাকিস্তানী শাসকদের বৈরিতা প্রতিহত করে তার প্রসার ও চর্চার জন্য গঠিত হ'ল দেশের অন্যতম বিখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন "ছায়ানট"। যার প্রথম আমৃত্যু সভানেত্রী ছিলেন সুফিয়া কামাল। এ ভাবেই ষাটের দশকে একে একে শিশু, নারী, সংস্কৃতি কর্মীদের অধিকার রক্ষার জন্য সংগঠনগুলি গড়ে উঠতে থাকে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে। সুফিয়া কামালের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল তিনি শুধু নিজের প্রতিভা বিকাশ বা অধিকারের জন্য তাঁর কাজ সীমাবদ্ধ রাখেন নাই। তিনি নিজের কর্মযজ্ঞ চালিত করেছিলেন সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন এর জন্য, সকল মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য। তিনি কাব্য রচনা করেছেন, কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। অন্যদের সাহিত্য রচনার সুযোগ তৈরী করে দেবার জন্য পত্রিকা প্রকাশ করেছেন, সংগঠন তৈরী করে সকলকে সম্মিলিতভাবে সমাজের কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
তাঁর সার্বিক কর্মকান্ডের বিশদ বর্ননা এক বয়ানে তুলে ধরা সম্ভব নয়। শুধু এটুকু বলা যায় নির্দ্বিধায় যে ষাটের দশকের এ দেশের মানুষের সকল প্রগতিশীল সামাজিক সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পুরোভাগে ছিলেন সুফিয়া কামাল। তার ও আগে দেশভাগের পর পর তিনি মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সভানেত্রী হয়েছেন, পত্রিকা প্রকাশ করেছেন, ভাষা আন্দোলনের হত্যাকান্ডের পর নারীদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুফিয়া কামালের বাড়ীর উঠানেই।
দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম মুক্তিযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে নারীরা অংশগ্রহণ করেছেন সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে। তাঁর ভরসায় নারীরা সংগঠিত হলেন "মহিলা সংগ্রাম পরিষদে"র ব্যানারে। এই সংগঠনের মাধ্যমে মূলধারার রাজনৈতিক আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরী হয় এবং পরবর্তী সময়ে নারীরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হন।
মুক্তিযুদ্ধে সুফিয়া কামালের যে ভূমিকা তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার অবকাশ এই লেখায় নেই। তাঁর "একাত্তরের ডায়েরী" গ্রন্থে তার আভাষ মেলে মাত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে যুদ্ধ আক্রান্ত নারীদের উদ্ধার, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। দেশের পুনর্গঠন ও ত্রাণ এর উদ্দেশ্যে গঠিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন "ব্র্যাক" এর প্রথম সভানেত্রী ছিলেন সুফিয়া কামাল।
সুফিয়া কামালের জীবনের বাকি সময়টাতেও তিনি কোন আন্দোলন -সংগ্রাম থেকে দূরে থাকেন নাই। সে আন্দোলন নারী অধিকার আদায় বা নারী নির্যাতন প্রতিরোধেই হোক কি সমাজের সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বার্থ আর মর্যাদা রক্ষার জন্যই হোক, হোক তা সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে - অশীতিপর সুফিয়া কামালকে দেখা গেছে পূর্ণ শক্তি নিয়ে তিনি চলেছেন মিছিলের অগ্রভাগে। তাই তিনি অভিহিত হয়েছেন "জননী সাহসিকতা" বলে। কত মানুষ যে তাঁর অবয়বে নিজের মায়ের চেহারার প্রতিফলন দেখেছেন তার হিসাব মেলা ভার। আমাদের মা হয়ে উঠেছিলেন সকল মুক্তিকামী মানুষের মা।
শহীদ মিনারে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাই জনতার স্রোত ছাড়িয়ে গিয়েছিল লক্ষের অঙ্ক। তাঁর জানাজায় অংশ নিতে সারি বেঁধে একসাথে অশ্রুসজল চোখে দাঁড়িয়েছিলেন নারী-পুরুষ, হিন্দু -মুসলিম-বৌদ্ধ-খৃষ্টান আর যে কোন জাতি গোষ্ঠী নির্বিশেষে তাঁকে ভালোবেসেছেন,শ্রদ্ধা করেছেন , তাকে ভরসা করেছেন এমন সব মানুষেরা। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় আজিমপুর কবরস্থানে। তাঁর অন্তিম ইচ্ছা ছিল সাধারণ মানুষের যেখানে শেষ ঠিকানা হয়, তাঁকেও যেন আমরা সেখানেই পৌঁছে দেই।
সুফিয়া কামালের প্রয়াণ দিবসে আমার সকল সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও নেতাকে জানাই শ্রদ্ধা ও অভিবাদন। কন্যা হিসাবে জানাই গভীর ভালবাসা।
(লেখাটি শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৫-এ খবরের কাগজে প্রথম প্রকাশিত হয়)
মন্তব্য করুন

