আমার কাছে মা মানে আমার স্বাধীনতার পাঠ, খোলা আকাশ
জান্নাতুন নাঈম প্রীতি, লেখক
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
বিপ্লবী প্রীতিলতার নামে আমার নাম রাখার মতামত ছিলো আমার মায়ের, আমার মা চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ে সারাজীবন লড়াই করুক, কখনো মাথা নত না করুক।
আমি নিতান্তই ক্ষুদ্র মানুষ। কিন্তু তবু কিছু ঘটনা বলি। দেশ থেকে আসার কয়েক বছর আগে আমার মা'কে একজন সাংবাদিক এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন- আপনার মেয়ের কোন গুণটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়? আমিও আগ্রহ করে তাকায়ে আছি, ভাবতেছি আম্মু বলবে- সে ভালো লেখে বা ছবি আঁকে, কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার মা বললেন- আমার মেয়ে কখনো মিথ্যা বলে না!
মহামারীর মধ্যে হাইকোর্ট না খোলার আগে বাধ্য হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলার কারণে আমি যখন পলাতক ছিলাম, তখন প্রায় একমাস আমার মায়ের সাথে কথা হয় নাই। প্রতিদিনই তখন আমার মনে হতো বুকের ওপর বিশাল পাথর রাখা আর আমি অক্সিজেনের সমুদ্রে শ্বাসকষ্টে হাবুডুবু খাচ্ছি। তাই আবার যেদিন আমাদের কথা হলো, সেদিন মনে হলো আমি আবার নিঃশ্বাস নিতে পারছি!
তো, পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত অবস্থায় যারা গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে আমি সম্ভবত তাদের একজন। রেজাল্ট হওয়ার পরে আমার মাকে জানালাম আমার ডিপার্টমেন্টে ফাইনাল ইয়ারে ফোর আউট অব ফোর পেয়েছি, স্কলারশিপ ইত্যাদি পাইতে মনে হয় সমস্যা হবে না...ইত্যাদি, আমার মা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- তুমি একটু খোঁজ নাওতো, জামিনে থাকা আসামীদের মধ্যে তুমিই একমাত্র কিনা যে এরকম ভালো রেজাল্ট করেছে?
এখন আপনিই বলেন- এরকম একজন মা থাকলে আর কি-ই বা লাগে? তাই সারাজীবন কিছু না লিখলেও যে নারীর কথা আমি বারবার লিখবো, তিনি আমার মা! মা সবাই হতে পারে, কিন্তু মাথার ওপর আকাশ হয়ে উঠতে পারেনা! আমার মা আমার আকাশ। আমার মা এমনকি দায়িত্বে, কর্তব্যে আমার বাবাও হতে পারেন, কিন্তু বাবা কখনোই মা হয়ে উঠতে পারবেন না!
শহীদ আজাদের মা আজাদকে বলেছিলেন- তোমাকে যখন মারবে তখন দাঁত চেপে ধরে থাকবা, ব্যথা কম লাগবে! শহীদ রুমিকে জাহানারা ইমাম বলেছিলেন- যা, দিলাম তোকে দেশের জন্য কুরবানি করে! এমনকি আমি যাকে আম্মা ডাকতাম, সেই মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীও আমাকে বলেছিলেন- দেশ হচ্ছে মায়ের মতো, মায়ের ওপর অভিমান করা যায়, কিন্তু রাগ করে থাকা যায় না! আমার ভাই একবার আমার মায়ের সাথে অভিমান করে ছয় মাস বাসায় আসে নাই, কিন্তু আমি কখনো দীর্ঘ সময়ের জন্য আমার মায়ের ওপর অভিমানও করতে পারি নাই! শুধুমাত্র এই ব্যর্থতার জন্যই আমি নিজেকে বাহবা দিতে চাই!
আমি জানি পৃথিবীর অনেক দেশকেই ফাদারল্যান্ড ডাকা হয়। যেমন- পিতৃভূমি জার্মানি, পিতৃভূমি রাশিয়া। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য আমরা দেশ বলতেও মাইই বুঝি! আমরা এতো আঘাতের পরেও দুনিয়ার যেখানেই থাকি সেখানে বসেই গাই-মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি...
ও হ্যাঁ, দেশ আর রাষ্ট্র কিন্তু এক না। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র আমার নামে লেখা কেস ফাইলের ওপর লিখেছে- জান্নাতুন নাঈম প্রীতি ভার্সেস দ্যা স্টেট! আমার মা কখনো এই জিনিস লিখবেন না, কখনোই কথা বলার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না কারণ আমার মা সবসময় আমার দেশ হয়েছেন কিন্তু রাষ্ট্র হন নাই- মা'র কথা ভেবেই আমি আমার হাতের ওপর ট্যাটু করিয়েছিলাম প্যারিসে এসে, যেখানে ফরাসিতে লেখা Vive la liberte d'expression, বাংলায় এর মানে হচ্ছে- বাক স্বাধীনতার জয় হোক।
আমার কাছে মা মানে আমার স্বাধীনতার পাঠ, খোলা আকাশ এবং নিজের মনের কথা নির্ভয়ে বলতে পারা।
ঠিক এই একটা কারণেই তাঁকে জনম জনম ভালোবাসা যায়। তাইনা?
মন্তব্য করুন

