Logo

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

আমার মা!

চিররঞ্জন সরকার ও মা

দিন-প্রতিদিন

মা দিবস

আমার মা!

চিররঞ্জন সরকার

Icon

চিররঞ্জন সরকার, লেখক ও সাংবাদিক

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:২৪ পিএম

সারা বিশ্বে এখন দিবসের ছড়াছড়ি। কোন দিন কোন দিবস, তা মনে রাখাই কঠিন। এর মধ্যে কিছু দিবস আবার অদ্ভুত—যেমন ‘হতাশা দিবস’। খুঁজলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো দিবস পাওয়া যাবে। এখন পাসওয়ার্ড দিবসও আছে! তবে এই ‘দিবস’-এর ভিড়ে একটি দিবস সত্যিই আলাদা তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়—মা দিবস। ‘মা’ শব্দটি যুক্ত থাকার কারণেই এটি সম্ভবত এত মহিমামণ্ডিত। যদিও দিন-ক্ষণ মেনে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যায় না। মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা প্রতিদিনের। তবু একটা বিশেষ দিন শুধু মায়ের জন্য—ভাবলেই মনের মধ্যে শিহরণ জাগে। আবেগ-অনুভূতি-ভালোবাসা আর উপলব্ধিতে মন দ্রবীভূত হয়ে ওঠে।

আমি সৌভাগ্যবান যে আমার মা এখনো বেঁচে আছেন। পচানব্বই বছর বয়সেও তিনি বেশ টনটনে। আট বছর আগে পড়ে গিয়ে গ্রোয়েনের হাড় ভেঙেছিল। ভেতরে লোহালক্কর দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে। তারপর থেকে একা সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না, ওয়াকারের সাহায্য নেন। ওয়াকার নিয়ে ঘর-বারান্দা-উঠানে চলতে পারেন। চেয়ারে বসে এখনো তরকারি কাটেন। ফোন এলে রিসিভ করতে পারেন। এক যুগ আগে চোখের ছানি অপারেশনের পর এখনো সব স্পষ্ট দেখেন। এখনও অনেক কিছু মনে রাখতে পারেন। শুধু শ্রবণশক্তি একটু দুর্বল হয়েছে। 

আমার মা সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন। অনেক দুঃখকষ্ট সয়েও যেভাবে আমাদের বড় করেছেন, পরিবার সামলেছেন—তা সত্যিই বিরল। মাত্র তের বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়। একেবারে অক্ষরজ্ঞানহীন আমার মাকে স্বশিক্ষিত বলা যায়। তাঁর গুণগুলো দুর্লভ—কারো সাথে ঝগড়া না করা, হিংসা-ঈর্ষা না করা, নির্লোভ-নিরাসক্তভাবে জীবন যাপন করা, নারী-পুরুষ ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমান চোখে দেখা, নিজে কম খেয়ে কম পরে অন্যকে সাহায্য করা, বাড়িতে কেউ এলে আদর-আপ্যায়ন করা, পরিবারের সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকা। এসব গুণের চর্চা তিনি সারাজীবন করেছেন। সব ধরনের মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা আমরা মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি।

অথচ আমার মায়ের যাতায়াতের পরিধি খুব বেশি নয়। বাড়ির কাজ সামলানোর পর কোথাও ঘুরে বেড়ানোর সময় ও সুযোগ তিনি পাননি। এমনকি কোনো আত্মীয়ের বাড়িতেও মাকে কখনো যেতে দেখিনি। আমাদের পীড়াপীড়িতে চিকিৎসার জন্য তিনি দুইবার ঢাকায় এসেছিলেন, বিভুদা (বিভুরঞ্জন সরকার)-র বাসায় উঠেছিলন। কিন্তু ঢাকায় এসে মা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। এর বাইরে মা তেমনভাবে কোথাও ঘোরেননি। তারপরও কীভাবে এত মানবিক গুণ আয়ত্ত করলেন—সেটা আমার কাছে এক পরম বিস্ময়!

আমার মায়ের কথা ভাবলে বুকের ভেতর কষ্টে ভরে ওঠে। আমরা এগারো ভাইবোন। এই এগারো সন্তানকে তিনি কী নিপুণ দক্ষতায় ‘মানুষের মতো মানুষ’ বানানোর চেষ্টা করেছেন! নিজে নিরক্ষর হয়েও সাধ্যমতো সবার লেখাপড়ার চেষ্টা করেছেন। জীবনে এমন কোনো বিপদ নেই, যার মুখোমুখি হননি মা। তিনি দেখেছেন মৃত্যুর মিছিল—শৈশবে বাবাকে হারিয়েছেন, নিজের মা ও শাশুড়ির মৃত্যু দেখেছেন। চোখের সামনে অজ্ঞাত ঘাতকের হাতে সন্তান খুন হতে দেখেছেন। স্ত্রী-সন্তান রেখে দুই সন্তানের অকালমৃত্যু, একাধিক নাতি-নাতনির মৃত্যু, স্বামীর মৃত্যু, বিধবা ছেলের বউকে নিজের পরিবারের একজন করে রাখা, দুই মেয়ের জামাইয়ের অকালমৃত্যু, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এক ছেলের দেশান্তর, চরম অভাব ও দারিদ্র্য—সব কিছুই তিনি দেখেছেন। সমস্ত প্রতিকূলতা, দুর্যোগ, শোক তিনি সামলেছেন নিজস্ব নিয়মে। তিনি চোখের জল ফেলেছেন, কিন্তু আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সেই শোককে মনের গভীরে চেপে রেখেছেন। যারা চলে গেছে, তাদের জন্য মায়ের কান্না কখনো শেষ হয় না। আর যারা এখনো বেঁচে আছি, তাদের জন্যও মায়ের উৎকণ্ঠা আর আশীর্বাদের কোনো শেষ নেই। মায়ের এত সব কষ্টের কথা মনে ভাবলে বুকটা ফেটে যায়। আবার মায়ের জন্য গর্বও হয়। মা এখনো আছেন—মাথার ওপর ছাদ হয়ে, স্নেহ আর আশীর্বাদের ছাতা হয়ে। এমন মা জগতে আর কজন আছে?

ছোটবেলায় দেখেছি মাকে সবার পরে ঘুমাতে, আবার সবার আগে উঠতে। সংসারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, অথচ কখনো অভিযোগ করেননি।

চরম টানাটানির মুহূর্তেও দেখেছি, নিজে আধপেটা খেয়ে অধিকতর দরিদ্র প্রতিবেশীদের গোপনে খাবার বিলিয়ে দিতে। নিজে কখনো কোনো সাধ-আহ্লাদ করেননি। ভালো কাপড় দিলে পরতে চাননি। অথচ অন্যকে দেওয়ার ব্যাপারে কৃপণ হতে দেখিনি কখনো। সবচেয়ে ভালোটা অন্যকে বিলিয়ে দেওয়ার মহত্ব আমার মায়ের মতো আর কাউকে দেখিনি।

সব রকম সংকীর্ণতা, ঘৃণা-বিদ্বেষ আর স্বার্থপরতার ঊর্ধ্বে উঠেও যে বেঁচে থাকা যায়—সেটা আমি শিখেছি আমার মায়ের কাছ থেকে।

পচানব্বই বছরেরও বেশি সময় ধরে মা আমাদের সংসারে বটবৃক্ষ হয়ে আছেন। কোনো বই না পড়ে, পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়াও যে মানুষ বৃহৎ ও মহৎ হতে পারে—সেটা মাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।

কৈশোরে অনেক সময় মায়ের অবাধ্য হয়েছি, মাকে উপেক্ষা করেছি। মনে পড়ে সেই আশির দশকে, যখন সিনেমা ছাড়া আর কোনো বিনোদন ছিল না, তখন সিনেমা দেখার টাকার জন্য মায়ের কাছে বায়না ধরতাম। অভাবের সংসারে সিনেমার টাকা দেওয়ার বাস্তবতা ছিল না। তাই টাকা না দিয়ে মা ধমক দিতেন, আর আমি ক্ষুব্ধ হতাম। অনেক সময় দেখেছি, ধমক দেওয়ার পর মা আড়ালে চোখের জল ফেলতেন। এই অশ্রু যে সন্তানের বায়না মেটাতে না পারার অক্ষমতাজনিত, সেটা তখন বুঝিনি। আজ যখন বুঝি, তখন নিজেকে অপরাধী মনে হয়! মাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এখনো মাঝে মাঝে অনুশোচনা জাগে। যদিও জানি, আমার মায়ের কোনো সন্তানের ব্যাপারেই কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না, এখনও নেই।

আমার মা এখন মাঝে মাঝে নাতি-নাতনিদের বায়না মেটাতে আমার কাছে মাঝে মাঝে টাকা চান। হয়তো পাঁচশ টাকা চেয়েছেন, আমি এক হাজার টাকা দিই। মা কিছুতেই বাড়তি পাঁচশ টাকা নিতে চান না। আমি জোর করলে তাঁর চোখে আবার অশ্রু।

মাকে আমরা যখন শাড়ি কিনে দিই, আসল দামটা বলি না। কারণ তিনশ টাকার বেশি দিয়ে কিনেছি বললে তিনি পরতে চান না, মন খারাপ করে বসে থাকেন। বলেন, কতজনের কত অভাব, এত দাম দিয়ে আমার শাড়ি কেনার দরকার কী!

আমার মা বৌমা-নাতি-নাতনিদের নিয়ে এখনো খুব ভালো আছেন। বৌমারাও তাঁর মেয়ে। মেয়েদের সঙ্গে বৌমাদের তিনি কখনো আলাদা করেননি। মা এলাকার সবার ‘কাকিমা’ বা ‘দিদিমা’। বাড়ির পাশ দিয়ে যারাই যায়, মায়ের সঙ্গে দেখা করে যায়। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকেও মাকে দেখতে আসে। মা যেমন সবাইকে ভালোবাসেন, অন্যরাও তাকে ভালোবাসে। নিরক্ষর-দীন-হীন আমার মায়ের এমন ‘রাজসিক’ জীবনযাত্রা দেখে গর্বে মন ভরে যায়।

প্রত্যেক সন্তানের কাছে তার মা সবচেয়ে সুন্দর ও মহৎ। কিন্তু এই ব্যাপারে আমার আলাদা অহঙ্কার আছে—আমার মায়ের মতো যে সর্বংসহা, উদার, মহৎ, সুন্দর ব্যক্তিত্ব আমি আজও দেখিনি! 

মাঝে মাঝে টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে নানা ব্যক্তির জীবনী নিয়ে আলোচনা শুনি। আমি জানি, আমার মাকে নিয়ে কখনো কোথাও কোনো অনুষ্ঠান বা ফিচার হবে না। কিন্তু আমি এও জানি, যাদের কথা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়, আমার মায়ের মহত্ব, জীবনবোধ ও জীবনসংগ্রাম তার চেয়ে ঢের বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এমন আলোচনা না হলেই বা ক্ষতি কী? আমি তো অন্তত এমন মায়ের সন্তান হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে ছিলাম—নীতি-আদর্শ-মহত্ব নিয়ে বুক উঁচিয়ে।

মাকে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি। আমার এই ভালোবাসা একদিনের জন্য নয়, প্রতিদিনের জন্য। জানি, তবুও মায়ের প্রতি ঋণ শোধ হবে না। একদিনের জন্য নয়, সব সময়ের জন্য, প্রতিদিনের জন্য ভালোবেসেই সম্ভব জন্মের ঋণ শোধ করা।

চিররঞ্জন সরকার, লেখক ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন

Logo