নোশিন আনজুম ও মা
মা দিবস
মেয়ে বলে ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পারব না— মা কখনো এমন চিন্তাধারা গড়ে উঠতে দেননি
নোশিন আনজুম
নোশিন আনজুম, দাবাড়ু
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১২:০১ পিএম
দাবার সঙ্গে আমার পথচলা ১২ বছরের। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মা-ই আমার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। প্রতিদিন আনা-নেওয়া করা থেকে শুরু করে জীবনের যেকোনো বিষয়ে— দাবা হোক বা দাবার বাইরের কিছু— সবসময় তিনি পাশে থেকেছেন। শুধু দেশের বাইরে খেলতে গেলে সবসময় সঙ্গে যেতে পারেন না, কারণ সেখানে অনেক খরচের বিষয় থাকে। কিন্তু দেশের ভেতরে কোনো প্রতিযোগিতা হলে আমি যতক্ষণ খেলি, মা ততক্ষণ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে অপেক্ষা করেন। তার এই সমর্থনই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশেষ করে যখন খেলা খারাপ হয়, তখন তিনিই আমাকে নতুন করে সাহস আর অনুপ্রেরণা দেন।
আমি আগেও অনেকবার বলেছি, প্রথমবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে মায়ের অবদানই সবচেয়ে বেশি ছিল। ওই সময় আমার পারফরম্যান্স ভালো যাচ্ছিল না, শরীরও খুব খারাপ ছিল। তখন মা-ই আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলেন— চাইলে এখনও সম্ভব। আজ আমার যত অর্জন, তার প্রতিটির পেছনেই মায়ের অবদান জড়িয়ে আছে।
ছোটবেলা থেকেই মা আমাকে কোনো কিছুতে বাধা দেননি। আমি মেয়ে বলে ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পারব না— এমন কোনো চিন্তাধারা তিনি কখনো আমার মধ্যে তৈরি হতে দেননি। ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা অন্য যেকোনো খেলাধুলায় তিনি সবসময় সমানভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। তাই কখনো মনে হয়নি, মেয়ে হওয়ার কারণে আমি কিছু করতে পারব না।
মা-ই চাইতেন, পড়াশোনার পাশাপাশি আমি খেলাধুলার সঙ্গেও যুক্ত থাকি। আত্মবিশ্বাস আর স্বাধীন চিন্তার যে ভিত্তি আজ আমার মধ্যে আছে, সেটাও মা-ই তৈরি করে দিয়েছেন। সম্ভবত এ কারণেই এখনো দাবায় আমি ওপেন ইভেন্টে খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কখনো মনে হয়নি, আমি মেয়ে বলে কোনো জায়গায় পিছিয়ে আছি।
আমি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ পড়াশোনা করছি। প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। সত্যি বলতে, এখানে পড়ার স্বপ্নটাও মা-ই আমার মধ্যে তৈরি করেছিলেন। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই তিনি আমাকে উৎসাহ দিতেন যেন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারি।
মা আমার জন্য যে পরিমাণ স্বার্থত্যাগ করেছেন, জীবনে যতই করি না কেন, সেই ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব হবে না। তাই চেষ্টা করি মায়ের সঙ্গে যতটা সম্ভব সময় কাটাতে। আমাকে ছাড়া মা খুব একা হয়ে যান। আমার জন্য সময় দিতে গিয়ে তার নিজের কোনো বন্ধু-বান্ধবও গড়ে ওঠেনি। এক অর্থে আমিই তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আমাদের সম্পর্কটা এতটাই বন্ধুসুলভ যে, আমি বিদেশে থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলি বা মেসেজ আদান-প্রদান করি। অনেকেই এটা বিশ্বাস করতে চাইত না। তারা ভাবত, নিশ্চয়ই অন্য কারও সঙ্গে কথা বলছি! কিছুদিন আগে আমি সিলেটে ‘নতুন কুড়ি’র উদ্বোধনে গিয়েছিলাম। সেখানেও সারাক্ষণ মায়ের সঙ্গে চ্যাট করছিলাম। এই বন্ধনটাই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
নোশিন আনজুম, জাতীয় দাবাড়ু
মন্তব্য করুন

