নিশাত সুলতানা ও মা
নিশাত সুলতানা, লেখক ও উন্নয়নকর্মী
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
আমার মা আমার চোখে এই পৃথিবীর সেরা সংগ্রামী মানুষদের একজন। মায়ের বিশেষণ হিসেবে এই সমাজে খুব বেশী আদরণীয় শব্দগুলো যখন মমতাময়ী, করুনাময়ী কিংবা মায়াবতী, তখন আমার জীবনের অভিধানে ‘মা’ শব্দটির প্রতিশব্দ হিসেবে সবচেয়ে বেশী অনুরণিত হয় সাহসিনী, আত্মবিশ্বাসী, সংগ্রামী কিংবা দৃঢ়প্রতীজ্ঞ’র মতো শব্দগুলো। আমি জানি একজন মায়ের বিশেষণ হিসেবে এই শব্দগুলো খুব একটা জনপ্রিয় নয় আমাদের সমাজে। কিন্তু খুব বাস্তববাদী আর দূরদর্শী আমার মা জীবনকে কখনো রূপকথার গল্পের মতো দেখেন নি; কিংবা দেখতে শেখেন নি। তিনি জীবনকে দেখেছেন এক নিরন্তর লড়াইয়ের মাঠ হিসেবে। সেই লড়াইয়ে তাঁর সহযাত্রী ছিলেন আমার বাবা। আর আমরা দুই বোন ছিলাম তাঁর সেই লড়াইকে এগিয়ে নেয়ার মূল প্রেরণা কিংবা আমাদের কেন্দ্র করেই হয়তো রচিত হয়েছিল তাঁর জাগতিক লড়াইয়ের গল্প; যা আজও চলমান আছে। আমি নিশ্চিত, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের জন্য তাঁর এই লড়াই অব্যাহত থাকবে।
জীবনে হার না মানা , অপরাজিত এক মায়ের সন্তান হতে পেরে আমি গর্বিত। দুই মেয়ের পাশে আজীবন ঢাল হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সত্তুর ছুঁই ছুঁই আমার মা আজও তাঁর সংকল্পে অটল, প্রাণবন্ত আর সতেজ। তার সতেজতা যেন প্রতি মুহুর্তে ছুঁয়ে যায় আমাদের। পুরুষশাসিত সমাজের চাপিয়ে দেওয়া প্রত্যাশার পাহাড়সম বোঝাকে তিনি কখনো দক্ষতার সঙ্গে সামলে আবার কখনো নিজের মতো করে মানিয়ে নিয়ে দুই মেয়েকে এই সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছেন নিরবে, নিভৃতে, সবার অলক্ষ্যে। নিজের সিদ্ধান্ত আর বিশ্বাসে অটল থেকে তিনি আমাদের জন্য গড়ে তুলেছেন সম্ভাবনার এক উন্মুক্ত দিগন্ত। আমি বিশ্বাস করি, তাঁর এই সাহসই আমাদের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
আমার মা শুধু সাহসী নন; তিনি সৃজনশীল, স্পষ্টভাষী, সুশৃঙ্খল, সুন্দর। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়। তিনি জীবনের প্রতিটি সম্ভাবনার সঙ্গে আমাদের পরিচিত করিয়েছেন; যেন আমরা আমাদের পছন্দ অনুযায়ী সেই সম্ভাবনার পথ ধরে হেঁটে যেতে পারি বহুদূর। সেই যাত্রায় তিনি নিরলসভাবে আমাদের পাশে থেকেছেন, আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করেছেন। আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কঠোর পরিশ্রমী আর সাহসী হবার শিক্ষা আমাদের দিয়েছেন। প্রকৃত অর্থে আত্মবিশ্বাসী মানুষ যে বিনীত হয়, সেই শিক্ষা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছি। মা আমাদের শিখিয়েছেন, ক্ষমতার প্রতি ভালোবাসা নয় বরং ভালোবাসার ক্ষমতা দিয়ে বিশ্ব জয় করা যায়। আমার মা-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তাঁর জীবনযাপনই আমার সবচেয়ে বড় পাঠশালা; যে পাঠশালায় অবাধে খেলা করে আদর, আস্কারা, শাসন আর বারণ।
এই লেখাটি আমি আমার মাকে উৎসর্গ করছি। আমার ছোট-বড় প্রতিটি সাফল্যে তাঁর সাহস, স্বপ্ন আর ভালোবাসা মিশে আছে আর থাকবে- আজ, কাল, চিরকাল। মাগো, তুমি আছ বলেই আমরা বেঁচে আছি। তুমিই আমাদের জীবনের শেষ ভরসা, সবচেয়ে বড় নির্ভরতা। তুমি ছাড়া আমাদের জীবনের গল্প যে অপূর্ণ! অসীম সাহসী আর আত্মপ্রত্যয়ী এই মাকে জানাই আমার হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা আর ভালো্বাসা। তোমার সাহসিকতার দৃঢ় আবরণের আড়ালে যে মমতার স্বাদ আমি পেয়েছি, তাতেই ধন্য আমার জীবন। খুব ভালোবাসি মাগো তোমায়।
নিশাত সুলতানা, লেখক ও উন্নয়নকর্মী
মন্তব্য করুন

