মাহবুব আজীজ ও তার মা মরহুমা বেগম মাসুদা
মাহবুব আজীজ, কবি ও কথাশিল্পী
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম
আমি তখন দাঁড়িয়েছিলাম মহাখালীর রাস্তায়,
আমার মা আসছেন—
ময়মনসিংহ থেকে অ্যাম্বুলেন্সে
অক্সিজেন সিলিন্ডার একটা ইতিমধ্যে শেষ;
দ্বিতীয়টি চলছে—
আমার মা আসছেন।
আমি মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।
লকডাউনের শহরেও এতো দেরি?
অ্যাম্বুলেন্স মহাখালী পৌঁছুতে পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয় হয়—
মা এলেন।
তাকে নামিয়ে হাসপাতালের বেডে রাখা হলো...
আমাকে দেখে সেই হাসি হাসলেন;
যেমন হেসেছেন সব সময়—
ঠোঁটে যতোটা; চোখে তার চেয়েও আরো অনেক বেশি—
অক্সিজেনের তার নাক-মুখ থেকে সরিয়ে আমার ডাকনাম ধরে ডেকে
বললেন—
"সাবধানে থাকিস। সবকিছুতে আগায় যাইস না।
দূরে থাকবি। সাবধানে..."
তারপর প্রাণপণ যুদ্ধ—
একদিকে মাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর থাবা—
আরেকদিকে আমরা কয়েকজন!
দেব না। যেতে দেব না।
দিন বা রাত; অথবা রাত বা দিন কীভাবে যায় বা আসে
আমরা আর বুঝি না আচমকা দেখি—
ময়মনসিংহের বাড়ির নিচতলায়—
আগস্ট মাসের ১১ তারিখ বুধবার রাত আড়াইটায় মাকে নিয়ে আমি
ততক্ষণে নিশ্চুপ বসে আছি—মৃত্যু নামের হিংস্রতম থাবা জিতে গেছে—
আমি অপেক্ষা করছি আমার মায়ের নিঃসার দেহটির পাশে
সারারাত—
ভোর হবে।
পরিচিতরা আসবেন।
আমার মাকে আমার বাবার কবরের পাশে চিরদিনের মতো শুইয়ে দেয়া
হবে।
আমি অপেক্ষা করতে থাকি।
চলচ্চিত্রের মতো একের পর এক দৃশ্য আমার চোখের সামনে দিয়ে
বয়ে যেতে থাকে—
এই আমার মা।
এই আমার জীবন।
এই শেষ হয়ে যাওয়া।
এই যে দিকে তাকাই আদিগন্ত শূন্যতা—!
রাত গভীরতর হয়-ভোর হবে।
পরিচিতজনেরা আসবেন।
আমি চুপ করে মায়ের পাশে বসে থাকি।
মাঝে মাঝে তার মুখ চোখে হাত দিই!
তার চুল ধরে দেখি।
এতো সুন্দর মানুষটিকে একটু পর মাটির নিচে রেখে দিতে হবে—
আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি—
সারা বছর প্রবল যুদ্ধের মাঝে
আমি অপেক্ষা করতাম—
মায়ের কাছে যাবো!
আমার ফিরে যাবার একমাত্র জায়গাটিও আর রইলো না।
মন্তব্য করুন

