দীপা সরকার ও তার মা
দীপা সরকার, নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম
মা আমার শিক্ষক, চিকিৎসক; আমার মা আমার আদর্শ, আমার আনন্দ, আমার পৃথিবী। মা-ই আমার জীবনের সবকিছু। আসলে মা সম্পর্কে যতই বলি, মনে হয় কিছু না কিছু বলা বাকি থেকে গেল। মা আমার জীবনে চলার ছন্দ, আমার সাহস, আমার আশ্রয়। মা-ই আমার প্রকৃত বন্ধু। জীবনের সুখে-দুঃখে, প্রতিটি বিপদে তিনি ঢাল হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। মা আছেন বলেই আজ আমি এতদূর আসতে পেরেছি। আজ আমি যে ড. দীপা সরকার, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার স্নেহময়ী মায়ের।
আমার মা যেমন সহজ-সরল, তেমনি ভীষণ পরিশ্রমী একজন নারী। তিনি একাধারে সাহসী, উদ্যমী, সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং প্রতিবাদী। তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা আমাকে আজও অনুপ্রাণিত করে। ভাবতে অবাক লাগে—প্রান্তিক জেলা নওগাঁর দক্ষিণ কালিতলা মহল্লার সেই নারী, যিনি সেই সময়ের সমাজ বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছেন, তিনি কী অসাধারণ দূরদর্শিতা নিয়ে জীবনকে দেখতেন! নৃত্যের মতো শিল্পচর্চার মাধ্যমকে আমাদের আপন করে নিতে দিয়েছেন। দিয়েছেন জীবনের সব শ্রম-মেধা-সাধনা।
আমরা মেয়ে বলে মা কখনোই আমাদের দুই বোনকে সীমাবদ্ধ করে ভাবেননি। ছেলে-মেয়ের ভেদাভেদ না করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। সন্তানদের কল্যাণে সঠিক সময়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তাঁর প্রতিটি চিন্তা ও কাজে ছিল আধুনিক মননের ছাপ। শাসন ছিল কঠোর, কিন্তু কখনো বিরক্তিকর বা দমবন্ধ করা নয়। তিনি কখনোই আমাদের ওপর কোনো শিক্ষা বা নিয়ম জোর করে চাপিয়ে দেননি।
তাঁর শাসনের মধ্যেও ছিল এক অদ্ভুত মমতা ও কার্যকরী এক নীরব ভাষা। মায়ের চোখের দিকে তাকালেই আমরা বুঝে যেতাম— এখন পড়তে হবে, ঘুমাতে হবে, নাকি নৃত্যচর্চা করতে হবে। ছোটবেলায় আমাদের জীবন ছিল সুন্দর, সুশৃঙ্খল রুটিনে বাঁধা। মা অত্যন্ত যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে সেই রুটিন তৈরি করেছিলেন। তাঁর সেই নিখুঁত পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা আর ত্যাগের ফলেই আজ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি।
আমার মা তাঁর নিজের জীবনে খুব বেশি কিছু পাননি। খুব অল্প বয়সেই তিনি বাবা-মাকে হারিয়েছেন। মাত্র সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। অভিভাবকহীন অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষাও দেওয়া হয়নি; তার আগেই তাঁকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়েছিল। কিন্তু জীবনের এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। বরং নিজের না-পাওয়াগুলোকে শক্তিতে রূপান্তর করে সন্তানদের জন্য গড়ে তুলেছেন এক সুন্দর ভবিষ্যৎ।
তিনি আমাদের নিজের হাতে সেলাই করা জামাকাপড় পরাতেন। সেই পোশাকগুলো ছিল ভীষণ সুন্দর, সবার থেকে আলাদা, নিজস্ব নকশায় তৈরি। তাঁর হাতে রান্না— আহা, যেন অমৃত! কম তেল, কম মসলা দিয়েও কী অসাধারণ স্বাদ তৈরি করা যায়, তা তাঁর রান্না না খেলে বোঝানো যাবে না। সেই স্বাদ কোথাও খুঁজে পাই না। রন্ধনশিল্পেও তাঁর অসাধারণ দক্ষতা।
আর এই জন্যই বলি, আমার মা শুধু একজন গৃহিণী নন, তিনি একজন নির্মাতা— মানুষের নির্মাতা। তিনি তাঁর সন্তানদের শুধু বড় করেননি, মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাঁর ত্যাগ, ভালোবাসা, শাসন, শিক্ষা ও মমতা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। পৃথিবীর সব মায়ের মতো তিনিও হয়তো নিঃশব্দে ভালোবেসেন, কিন্তু আমার কাছে তিনি অসাধারণ এক নারী, অনন্য আলোকবর্তিকা। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা কোনো শব্দে প্রকাশ করার মতো নয়।
দীপা সরকার, নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন

