এদিন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ছোট্ট জনপদ চুকনগর পরিণত হয়েছিল এক ভয়াল মৃত্যুপুরীতে
সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১০:৩০ এএম
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো শুধু শোক নয়, মানবসভ্যতার বিবেককেও নাড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের ২০ মে তেমনই এক বিভীষিকাময় দিন। সেদিন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ছোট্ট জনপদ চুকনগর পরিণত হয়েছিল এক ভয়াল মৃত্যুপুরীতে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা—চুকনগর গণহত্যা। মাত্র চার ঘণ্টার হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারান প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার নিরস্ত্র মানুষ। সংখ্যার বিচারে এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একক বৃহত্তম গণহত্যাগুলোর একটি।
শরণার্থীদের জনস্রোত ও চুকনগরের গুরুত্ব
১৯৭১ সালের মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ রূপ নেয়। খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ফরিদপুর, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়তে শুরু করেন। বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন তখন চরমে পৌঁছেছিল।
ভারতে যাওয়ার তুলনামূলক নিরাপদ পথ হিসেবে মানুষ বেছে নেয় ডুমুরিয়ার চুকনগরকে। ভদ্রা নদীপথে নৌকায় এসে চুকনগরে বিশ্রাম নিয়ে সেখান থেকে সাতক্ষীরা হয়ে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তিন দিক নদীঘেরা চুকনগর বাজার ছিল সেই সময় শরণার্থীদের এক গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট।
১৯ ও ২০ মে সেখানে মানুষের ঢল নামে। পাতখোলা বিল, কাঁচাবাজার, মাছবাজার, ফুটবল মাঠ, কালীমন্দির, বটতলা—সবখানে আশ্রয় নেন হাজার হাজার মানুষ। কেউ রান্না করছেন, কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, কেউবা সারারাত আতঙ্কে নির্ঘুম কাটিয়েছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন, আর কয়েক ঘণ্টা পরই হয়তো নিরাপদে পৌঁছে যাবেন ভারতে। কিন্তু তাদের অপেক্ষায় ছিল এক ভয়াবহ মৃত্যু।
যেভাবে শুরু হয়েছিল হত্যাযজ্ঞ
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুসারে, স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন এবং এক বিহারী ঘাট ইজারাদার পাকিস্তানি সেনাদের কাছে চুকনগরে মানুষের সমাগমের খবর পৌঁছে দেয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ২০ মে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা ট্রাক ও জিপে করে চুকনগরে প্রবেশ করে।
ঝাউতলা এলাকায় গাড়ি থামিয়ে তারা প্রথমে স্থানীয় কৃষক চিকন আলী মোড়লকে গুলি করে। এরপর শুরু হয় নির্বিচার ব্রাশফায়ার। লাইট মেশিনগান ও সেমি-অটোমেটিক রাইফেল হাতে পাকিস্তানি সেনারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাতখোলা বিল, চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, কালীমন্দির, নদীর ঘাট—যেদিকে মানুষ পেয়েছে, সেদিকেই গুলি চালিয়েছে।
মুহূর্তেই চারপাশে শুরু হয় আর্তচিৎকার। মানুষ জীবন বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অনেকে ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীতে ঝাঁপ দেন। কিন্তু সেখানেও রক্ষা মেলেনি। গুলিবিদ্ধ লাশে নদীর পানি লাল হয়ে উঠে। কোথাও কোথাও লাশ জমে নদীপথ বন্ধ হয়ে যায়।
দুপুর তিনটা পর্যন্ত চলে এই হত্যাযজ্ঞ। পরে গুলি ফুরিয়ে এলে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় অনেককে।
এক নারকীয় দৃশ্যের সাক্ষ্য
চুকনগরের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে এক বিভীষিকাময় বাস্তবতা।
বলাই গোলদার নামের এক জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, ‘একজনের পেটের ভুঁড়ি আরেকজনের সঙ্গে লেগে গিয়েছিল। সবাইকে খুঁজে ফিরছি, কাউকে পাই না...।’
প্রত্যক্ষদর্শী আনসার আলী সরদার বলেন,‘শুধু আমরা ৪২ জন ২১টি বাঁশ দিয়ে লাশ ঠেলে নদীতে ফেলেছি।’
কৃষক আফসার আলী সরকারের ভাষ্য আরও ভয়াবহ—‘সারাদিনে কম করে হলেও আমরা ৫ থেকে ৬ হাজার লাশ নদীতে ফেলেছি।’
স্থানীয় শিক্ষক সরদার মুহাম্মদ নূর আলী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন,‘দুই মাস পর্যন্ত ওই নদীর মাছ মানুষ খায়নি। পাঁচ-ছয় মাস বাজারে লোকজন আসেনি।’
মা মৃত, শিশু তখনও দুধ খাচ্ছে
চুকনগর গণহত্যার অসংখ্য নির্মম ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক একটি হলো ‘সুন্দরী’র গল্প।
গণহত্যার পরদিন লাশের স্তুপের মধ্যে দেখা যায়, এক মৃত মায়ের স্তন মুখে নিয়ে দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছে ছয় মাস বয়সী এক শিশু। স্থানীয় এরশাদ আলী মোড়ল শিশুটিকে উদ্ধার করে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। পরে তার নাম রাখা হয় ‘সুন্দরী’।
বড় হয়ে সুন্দরী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—‘চুকনগর বধ্যভূমিতে গেলে আজও বুকটা হাহাকার করে ওঠে। খুঁজে ফিরি মা-বাবাকে। শুধু জানি, বাঁচার আশায় আমার পরিবার এখানে এসেছিল।’
এই ঘটনা যেন পুরো চুকনগর গণহত্যার প্রতীক—একটি জাতির বেঁচে থাকার আকুতি আর নির্মম হত্যার ইতিহাস।
কেন প্রকৃত নিহতের সংখ্যা জানা যায়নি
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় চুকনগর গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা অনুমান করা হয় অন্তত ১০ থেকে ১২ হাজার। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা আজও অজানা। কারণ অধিকাংশ নিহত মানুষই ছিলেন বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শরণার্থী। তাদের স্বজনরা অনেকেই ভেবেছিলেন, তারা হয়তো নিরাপদে ভারতে পৌঁছে গেছেন। ফলে বহু মানুষ নিখোঁজই থেকে যান।
অনেক লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অনেককে গণকবরে দাফন করা হয়। এখনও চুকনগরের ফসলি জমিতে মানুষের হাড়গোড়, অলঙ্কার কিংবা ব্যবহার্য সামগ্রী পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।
ইতিহাসের দায় ও আমাদের স্মৃতি
চুকনগর শুধু একটি গণহত্যার স্থান নয়; এটি আমাদের মুক্তির সংগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার এক জ্বলন্ত দলিল। পৃথিবীর ইতিহাসে সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর একটি এই চুকনগর। অথচ আন্তর্জাতিক পরিসরে এই হত্যাযজ্ঞ এখনও ততটা আলোচিত নয়, যতটা হওয়া উচিত ছিল।
২০ মে এলে চুকনগরের বাতাসে এখনও ভেসে ওঠে সেই আর্তনাদ। ভদ্রা নদীর ঢেউ যেন এখনও বহন করে রক্তাক্ত স্মৃতি। ইতিহাসের কাছে, মানবতার কাছে, চুকনগর এক অবিস্মরণীয় দায়—যে দায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মূল্য কত ভয়াবহ রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল। নতুন প্রজন্ম, তোমরা কি চুকনগরের সেই সব শহীদদের আর্তনাদ শুনতে পাও?
চুকনগর গণহত্যার সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা।
দিন-প্রতিদিন
১৪৯৮ - ভাস্কো ডা গামা প্রথম ইউরোপীয়, যিনি আজকের দিনে জলপথে ভারতের কালিকট বন্দরে উপস্থিত হন।
১৬০৯ - শেক্সপিয়ার এর সনেট প্রথম প্রকাশিত হয় লন্ডনে। প্রকাশক ছিলেন থমাস থর্প।
১৯০২ - কিউবা নিজেকে একটি প্রজাতন্ত্র হিসাবে ঘোষণা করে।
১৯৭১ - ২০ মে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে খুলনার চুকনগরে পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক সর্ববৃহৎ গণহত্যা সংগঠিত হয়।
১৯৮৩ - এইচআইভি ভাইরাস সম্পর্কে প্রথম প্রকাশিত হয় সায়েন্স ম্যাগাজিনে।
মন্তব্য করুন

