Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

আদমজী পাটকলে সংঘটিত ভয়াবহ দাঙ্গা

১৯৫৪ সালের ১৫ মে আদমজি জুট মিলে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়

দিন-প্রতিদিন

এই দিনে

আদমজী পাটকলে সংঘটিত ভয়াবহ দাঙ্গা

Icon

শায়লা আক্তার

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৯:৩১ এএম

১৯৫৪ সালের ১৫ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজি জুট মিলে বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত শ্রমিক-জাতিগত সংঘর্ষ, যা শুধু এই কারখানাকেন্দ্রিক সহিংসতাই ছিল না; বরং তৎকালীন পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক, ভাষাগত ও সামাজিক বৈষম্যের গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।
আদমজী পাটকল তখন বিশ্বের বৃহত্তম পাটকলগুলোর একটি। হাজার হাজার শ্রমিক সেখানে কাজ করতেন। শ্রমিকদের বড় একটি অংশ ছিলেন বিহারসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা উর্দুভাষী অবাঙালি। মূলত দেশভাগের পর তারা পূর্ব পাকিস্তানে এসে বসবাস শুরু করেন। অন্যদিকে স্থানীয় বাঙালি শ্রমিকরাও সংখ্যায় ছিলেন বিপুল। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ, পদোন্নতি, আবাসন ও প্রশাসনিক সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই পক্ষের মধ্যে অসন্তোষ জমে উঠছিল।
ভাষা আন্দোলনের পর পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে উঠে। রাষ্ট্রীয় এবং পাটকলের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নানা সিদ্ধান্তে বাঙালিদের মধ্যে তখন এই ধারণা প্রবল হচ্ছিল যে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও শিল্পকারখানায় অবাঙালিরা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে অবাঙালি শ্রমিকদের একাংশ নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে ছিলেন মরিয়া। ফলে সামান্য উত্তেজনাতেও বড় সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো।
১৯৫৪ সালের মে মাসে আদমজী পাটকল এলাকায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। ১৫ মে হঠাৎ করেই বাঙালি ও অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সূচনার বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়—কেউ বলেন শ্রমিকদের মধ্যে তুচ্ছ বিবাদ থেকে ঘটনার শুরু, আবার কেউ মনে করেন এর পেছনে রাজনৈতিক উসকানি ও পরিকল্পিত উত্তেজনা ছিল। খুব দ্রুত সংঘর্ষ ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নেয়।
দাঙ্গায় লাঠি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা ঘটে। অগ্নিসংযোগ ও করা হয়। শ্রমিক কলোনি ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বহু ঘরবাড়ি আক্রান্ত হয়। সরকারি হিসেবে নিহতের সংখ্যা সীমিতভাবে ৪০০ জনের কথা প্রকাশ করা হলেও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক হাজারের উপরে মানুষের প্রাণহানির কথা উল্লেখ করা হয়। আহত হন শতাধিক মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়।
এই দাঙ্গার প্রভাব শুধু আদমজী পাটকলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরো পূর্ব পাকিস্তানে এটি বাঙালি-অবাঙালি সম্পর্কের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ঘটনা প্রমাণ করে যে পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক বাস্তবতায় ভাষা ও জাতিগত পরিচয় কতটা স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছিল।
পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধিকার আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা আদমজী পাটকলের এই দাঙ্গাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ এই সংঘর্ষে শুধু শ্রমিক অসন্তোষ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বৈষম্য, ভাষাগত বিভাজন এবং রাজনৈতিক অবহেলার দীর্ঘ ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

আজ ১৫ মে ২০২৬, শুক্রবার। জেনে নিন ইতিহাসের এই দিনে বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা।
১০০৪ — জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় হেনরি ইতালির রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন।
১৬২৫ — অস্ট্রিয়ায় বিদ্রোহের অভিযোগে ১৬ জন কৃষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
১৭৭৬ — বিশ্বের প্রথম বাষ্পচালিত জাহাজ নির্মিত হয়।
১৮১৮ — বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ প্রকাশিত হয়।
১৯৫১ — দৈনিক ‘সংবাদ’-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে।
১৯৫৪ — আদমজি জুট মিলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা সংঘটিত হয়; সরকারি হিসাবে নিহত হন ৪০০ জন, বেসরকারি হিসাবে হাজারের ওপরে।
১৯৬০ — কঙ্গো প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা লাভ করে।
১৯৭২ — বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ব্রাজিল।
১৯৮৮ — আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার কার্যক্রম শুরু হয়।

মন্তব্য করুন

Logo