বিশ্বখ্যাত পর্বতারোহী অ্যালিসন হারগ্রিভস
শায়লা আক্তার
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ১০:৪২ এএম
১৯৯৫ সালের ১৩ মে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের গায়ে তখন হিমশীতল বাতাসের তাণ্ডব। অক্সিজেনের স্বল্পতায় যেখানে অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরাও হাঁপিয়ে ওঠেন, সেখানে এক নারী এগিয়ে যাচ্ছিলেন একা—নেই কোনো শেরপার সহায়তা, নেই অক্সিজেন সিলিন্ডার। বরফের দেয়াল, মৃত্যুফাঁদ আর তীব্র ঝড় উপেক্ষা করে তিনি পৌঁছে যান পৃথিবীর শীর্ষ চূড়ায়। ইতিহাসে নাম লেখান প্রথম নারী হিসেবে। তিনি ব্রিটিশ পর্বতারোহী অ্যালিসন হারগ্রিভস।
অ্যালিসনের এই অভিযাত্রা শুধু একটি পর্বত জয় ছিল না; এটি ছিল মানুষের সীমা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার এক দুঃসাহসিক ঘোষণা।
পাহাড়ের অদম্য টান
১৯৬২ সালে ইংল্যান্ডের ডার্বিশায়ারে জন্ম নেওয়া অ্যালিসনের শৈশব কেটেছে পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির মাঝে। কৈশোরেই তিনি পাহাড়ে ওঠার প্রেমে পড়ে যান। ধীরে ধীরে ইউরোপের কঠিনতম সব পর্বতারোহণ করে নিজের সক্ষমতার পরিচয় দিতে থাকেন।
তখনো পর্বতারোহণের জগৎ প্রায় পুরোপুরি পুরুষশাসিত। নারীদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তোলা হতো। কিন্তু অ্যালিসন এসব ধারণাকে একের পর এক অভিযানে ভুল প্রমাণ করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি আল্পস পর্বতমালার বিখ্যাত উত্তর দেয়াল ‘আইগার নর্থ ফেস’ এককভাবে আরোহণ করেন। পরে ম্যাটারহর্ন ও গ্র্যান্ড জোরাসেসের মতো ভয়ংকর শৃঙ্গও জয় করেন। এই তিনটি কঠিন উত্তর দেয়াল এক মৌসুমে একাই আরোহণ করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসেন।
এভারেস্টের পথে
এভারেস্ট শুধু একটি পাহাড় নয়, এটি মানুষের সহনশীলতা ও সাহসের চূড়ান্ত পরীক্ষা। উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে অক্সিজেন, বাড়তে থাকে মৃত্যুঝুঁকি। অধিকাংশ অভিযাত্রী সেখানে শেরপা গাইড এবং সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ব্যবহার করেন। কিন্তু অ্যালিসন সিদ্ধান্ত নেন, তিনি প্রকৃতির সঙ্গে লড়বেন নিজের শক্তিতেই।
১৯৯৫ সালের সেই অভিযানে তার সঙ্গে ছিল না কোনো অতিরিক্ত অক্সিজেন। শেরপার সহায়তাও নেননি। এই সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেছিলেন। সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন—দুই সন্তানের মা হয়ে কেন তিনি এমন বিপজ্জনক অভিযানে যাচ্ছেন?
অ্যালিসনের উত্তর ছিল সরল—আমি পাহাড়ে উঠি কারণ এটিই আমার জীবন।
১৩ মে তিনি সফলভাবে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। অক্সিজেনবিহীন বরফ চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেন, সাহস ও দক্ষতার কোনো লিঙ্গ নেই।
বিতর্ক, সমালোচনা ও এক মায়ের লড়াই
অ্যালিসনের এভারেস্ট জয় শুধু প্রশংসাই কুড়ায়নি, জন্ম দিয়েছিল বিতর্কেরও। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিল—একজন মা কীভাবে এমন ঝুঁকি নিতে পারেন? কিন্তু একই ধরনের ঝুঁকি নেওয়া পুরুষ পর্বতারোহীদের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন কি ওঠে। ফলে অ্যালিসনের ঘটনা নারীর স্বাধীনতা, মাতৃত্ব এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
তিনি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পুরুষেরা অভিযানে গেলে তাকে বীর বলা হয়, কিন্তু নারী গেলে তাকে দায়িত্বহীন বলা হয়।
কে-টু: শেষ অভিযাত্রা
এভারেস্ট জয়ের মাত্র তিন মাস পর অ্যালিসন পাকিস্তানের ভয়ংকর কে-টু শৃঙ্গ অভিযানে যান। কে-টু পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বত হলেও অনেকের কাছে এটি এভারেস্টের চেয়েও বিপজ্জনক। ১৯৯৫ সালের আগস্টে তিনি সফলভাবে কে-টুর চূড়ায় ওঠেন। কিন্তু ফেরার পথে ভয়াবহ ঝড়ে তিনি নিখোঁজ হন। ধারণা করা হয়, তুষারঝড়েই তার মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল মাত্র ৩৩ বছর।
অনুপ্রেরণার নাম
অ্যালিসন হারগ্রিভসের জীবন যেন বরফঢাকা এক উপন্যাস—যেখানে আছে স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহস, বিতর্ক এবং ট্র্যাজেডি। তিনি শুধু একজন পর্বতারোহী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক প্রতীক।
আজও বিশ্বের বহু নারী অভিযাত্রী তার গল্প থেকে সাহস পান। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যেন বলে গেছেন—
মানুষের স্বপ্নের উচ্চতা কোনোদিনও মাপা যায় না।
এই দিনে
আজ ১৩ মে ২০২৬, বুধবার। জেনে নিন ইতিহাসের এই দিনে বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা।
• ১৬০৭ – ভার্জিনিয়ার জেমস টাউনে আমেরিকান ভূখণ্ডে ইংরেজরা প্রথম স্থায়ী বসতি স্থাপন করে।
• ১৬৩৮ – সম্রাট শাহজাহানের তত্ত্বাবধায়নে দিল্লির লাল কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
• ১৮৩০ – স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসাবে ইকুয়েডরের প্রতিষ্ঠা লাভ।
• ১৯৬৮ – প্যারিসে ভিয়েতনাম শান্তি আলোচনা শুরু।
• ১৮০৯ – অস্ট্রিয়ার সেনাদলকে পরাজিত করে নেপোলিয়ানের ভিয়েনা দখল।
• ১৮৪৬ – যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
• ১৯৬৯ – মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে বর্ণবাদ দাঙ্গায় শতাধিক নিহত।
• ১৯৯১ – নেপালে প্রথম সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
• ১৯৯৫ – প্রথম নারী হিসেবে ব্রিটিশ বংশদ্ভূত অ্যালিসন হারগ্রিভস কোনো অক্সিজেন ও শেরপা ছাড়াই এভারেস্ট জয় করেন।
মন্তব্য করুন

