মৃত্যুকে মুঠোয় নিয়েও শিখর জয়ের স্বপ্ন
নিম্নির এভারেস্ট আরোহন, অরুণের মৃত্যু এবং মানুষের অদম্য অভিযাত্রার গল্প
সজল শহীদ
প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬, ১২:১৩ পিএম
১৪ বছর পর আবারও বাংলাদেশের এক নারী এভারেস্ট জয় করলেন। কাঠমান্ডুভিত্তিক অভিযাত্রী সংস্থা ‘এইটকে এক্সপেডিশনস’-এর চেয়ারম্যান পেম্বা শেরপার তথ্য অনুযায়ী, ২৭ মে ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে নুরুননাহার নিম্নি ৮ হাজার ৮৪৮ দশমিক ৮৬ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছান। তিনি বাংলাদেশের তৃতীয় নারী, যিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাঁড়ানোর এই বিরল কৃতিত্ব অর্জন করলেন।
এই অর্জন নিছক ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি সাহস, অধ্যবসায়, মানসিক দৃঢ়তা এবং মৃত্যুকে সামনে রেখেও এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। কারণ এভারেস্ট জয় কখনোই সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এখানে শুধু শারীরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ, কঠোর প্রশিক্ষণ এবং ভয়কে নিয়ন্ত্রণ করার অসাধারণ ক্ষমতা।
এভারেস্ট চূড়ায় নুরুননাহার নিম্নি
মানুষ কেন পাহাড়ে ওঠে?
পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট—শুধু একটি পাহাড় নয়, এটি মানুষের সীমা অতিক্রম করার প্রতীক। বরফে ঢাকা, ঝড়-বিধ্বস্ত, অক্সিজেনশূন্য এক ভয়ংকর ভূখণ্ড, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। তবুও মানুষ বারবার সেখানে যায়। কেউ ফিরে আসে বিজয়ের পতাকা হাতে, কেউ থেকে যায় চিরতরে বরফের নিচে।
২০২৬ সালের মে মাসে এই দুই বাস্তবতাই আবার সামনে এলো। একদিকে বাংলাদেশের পর্বতারোহী নুরুননাহার নিম্নি এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়লেন। অন্যদিকে ভারতীয় পর্বতারোহী অরুণ কুমার তিওয়ারি শিখর ছুঁয়েও আর ফিরতে পারলেন না। একজনের গল্প সাফল্যের, অন্যজনের গল্প মৃত্যু ও অসমাপ্ত প্রত্যাবর্তনের। কিন্তু গভীরে গেলে দুটো গল্পই আসলে মানুষের অদম্য স্বপ্নের গল্প।
নিম্নির দীর্ঘ প্রস্তুতির গল্প
বাংলাদেশের মতো সমতলভূমির দেশে জন্ম নিয়েও পাহাড়ের প্রেমে পড়েছিলেন নিম্নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনার সময় প্রকৃতির প্রতি তার আকর্ষণ আরও গভীর হয়। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে এক শিক্ষাসফর থেকেই শুরু হয়েছিল তার পাহাড়ের প্রতি টান। এরপর ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেছেন তিনি। ভুটান, সিকিম, নেপাল—বিভিন্ন অঞ্চলের দুর্গম পর্বতচূড়ায় আরোহনের মাধ্যমে অর্জন করেছেন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে নেপালের হিমলুং হিমাল আরোহন তাকে এভারেস্ট অভিযানের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
এভারেস্টে ওঠার প্রস্তুতি আসলে প্রায় সামরিক পর্যায়ের শৃঙ্খলার জীবন। প্রতিদিনের কঠোর ব্যায়াম, সহনশীলতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ, উচ্চতাজনিত অসুস্থতার জন্য প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে এটি বছরের পর বছর ধরে চলা এক সংগ্রাম। নিম্নিও সেই পথেই নিজেকে তৈরি করেছেন। দিনের চাকরি সামলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং অদম্য মানসিক প্রস্তুতি তাকে পৌঁছে দিয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে।
এভারেস্ট: সৌন্দর্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মৃত্যুপুরী
৫৩ বছরের অরুণ কুমার তিওয়ারি ছিলেন পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। হায়দরাবাদে চাকরি করতেন, কিন্তু পাহাড় ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় নেশা। পৃথিবীর একাধিক কঠিন শৃঙ্গ তিনি আগেই জয় করেছিলেন—আমেরিকার ডেনালি, আর্জেন্টিনার অ্যাকনকাগুয়া, রাশিয়ার এলব্রুস, আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো। এরপর তাঁর স্বপ্ন হয়ে ওঠে এভারেস্ট।
২০২৫ সালেও তিনি এভারেস্ট অভিযানে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় ৭২০০ মিটার উচ্চতায় অসুস্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। সেই ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারেনি। ২০২৬ সালের মে মাসে আবার অভিযানে নামেন তিনি। ২১ মে সফলভাবে এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অংশ অনেক সময় ওঠার পথে নয়, ফেরার পথে অপেক্ষা করে থাকে।
সামিটের পর ফেরার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। ঘটনাস্থল ছিল হিলারি স্টেপের কাছাকাছি, প্রায় ৮৭৯০ মিটার উচ্চতায়। এই অংশটিকে এভারেস্টের সবচেয়ে বিপজ্জনক অঞ্চলগুলোর একটি ধরা হয়। সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নামার সময় অরুণের শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে এবং তিনি রক্তবমিও করেছিলেন। সঙ্গে থাকা শেরপারা অতিরিক্ত অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে চিকিৎসা করার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।
৮ হাজার মিটারের ওপরে শুরু হয় তথাকথিত “ডেথ জোন”। সেখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মানুষের শরীর ধীরে ধীরে নিজের শক্তি হারাতে থাকে। মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, শরীর অসাড় হয়ে যাওয়া—সবকিছু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। মস্তিষ্ক ঠিকমতো কাজ করে না, ফুসফুসে পানি জমতে পারে, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যেতে পারে। তার ওপর রয়েছে মাইনাস ৪০ থেকে মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, তুষারঝড় এবং মুহূর্তে বদলে যাওয়া আবহাওয়া।
এভারেস্টে উদ্ধার অভিযান শুনতে যতটা সহজ লাগে, বাস্তবে তা অনেক বেশি ভয়ঙ্কর। ওই উচ্চতা থেকে একটি মৃতদেহ নামিয়ে আনতে ৮ থেকে ১২ জন পর্যন্ত শেরপার প্রয়োজন হতে পারে। ব্যবহার হয় অতিরিক্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার, বিশেষ দড়ি ও নানা সরঞ্জাম। খরচ পৌঁছে যেতে পারে প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি। সবচেয়ে বড় কথা, উদ্ধার করতে গিয়েও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে। অতীতেও মৃতদেহ উদ্ধারের সময় শেরপাদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
অরুণের পরিবার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তাঁর দেহ আর নিচে নামানো হবে না। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পাহাড়ই ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। হিমালয়কে তাঁরা “ভগবান শিবের আবাস” বলেও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, এত উচ্চতা থেকে মৃতদেহ নামানোর সময় শরীরের অবস্থা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেই দৃশ্য তাঁরা দেখতে চাননি।
এভারেস্টে এখনও শতাধিক মৃতদেহ পড়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্বতারোহী সংস্থার ধারণা। তীব্র ঠান্ডায় অনেক দেহ বরফের মধ্যে স্থায়ীভাবে আটকে যায়। কোথাও কোথাও সেই মৃতদেহই নতুন পর্বতারোহীদের জন্য পথ চেনার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন তারা নীরবে মনে করিয়ে দেয়—এখানে ভুলের কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের জন্যও এভারেস্টের ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, বেদনাময়ও। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুসা ইব্রাহীম এভারেস্ট জয় করেন। পরে নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন, এম এ মুহিত, বাবর আলী, ইকরামুল হাসান শাকিলসহ আরও অনেকে শিখরে উঠেছেন। তবে সবাই নিরাপদে ফিরতে পারেননি। এভারেস্ট জয় করেও ফিরে আসতে পারেননি মোহাম্মদ খালেদ হোসেন, যিনি সজল খালিদ নামে পরিচিত ছিলেন। ফেরার পথে নিখোঁজ হওয়ার পর পরে তার মৃত্যুর খবর আসে। তাইতো, এভারেস্ট কেবল সৌন্দর্যের নাম নয়। এটি একই সঙ্গে মৃত্যুপুরীও।
এভারেস্ট চূড়ায় নুরুননাহার নিম্নি
মৃত্যুকে জেনেও মানুষ এগিয়ে যায়
এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, পর্বতারোহণ কেবল রোমাঞ্চ নয়; এটি জীবনের সঙ্গে এক নির্মম বোঝাপড়াও। তবুও মানুষ থামে না। প্রতি বছর নতুন মানুষ আবারও পাহাড়ের পথে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু কেন?
বিখ্যাত পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরি একবার বলেছিলেন, “Because it is there”—“কারণ এটি সেখানে আছে।” এভারেস্টে কেন উঠতে চান—এই প্রশ্নের জবাবে তার এই ছোট্ট উত্তর আজও পর্বতারোহণের দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
আসলে মানুষ শুধু বেঁচে থাকার জন্য বাঁচে না। মানুষের ভেতরে এক ধরনের অদম্য অনুসন্ধিৎসা কাজ করে। কেউ সাগরের গভীরে ডুব দেয়, কেউ মহাকাশে পাড়ি জমায়, কেউ পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়াতে চায়। এই চাওয়ার মধ্যে শুধু রোমাঞ্চ নেই; আছে নিজেকে আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা।
অনেক পর্বতারোহী বলেন, পাহাড় জয় করা নয়, বরং নিজের ভয়কে জয় করাই আসল। কারণ পাহাড় কখনো মানুষের কাছে পরাজিত হয় না। মানুষ কেবল সাময়িকভাবে তার চূড়ায় পৌঁছানোর অনুমতি পায়।
বাংলাদেশের মতো সমাজে একজন নারীর জন্য এভারেস্টে ওঠা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা—সবকিছু পেরিয়ে নিম্নির এই সাফল্য তাই নিছক ক্রীড়া অর্জন নয়; এটি সামাজিক মানসিকতার বিরুদ্ধেও এক প্রতীকী বিজয়। নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন এবং এখন নুরুননাহার নিম্নি দেখিয়ে দিয়েছেন—পাহাড় কোনো লিঙ্গ দেখে না; সে শুধু সাহস, প্রস্তুতি এবং ধৈর্যকে মূল্য দেয়।
নিম্নির সাফল্য হয়তো বাংলাদেশের অনেক তরুণীর মধ্যেও নতুন স্বপ্ন জাগাবে। হয়তো কোনো মেয়ে আজ এই খবর পড়ে প্রথমবারের মতো ভাবছে—“আমিও পারব।”
শক্তি নয়, ইচ্ছা শক্তির জয়গান
অভিজ্ঞ পর্বতারোহীরা বলেন, এভারেস্টের চূড়ায় ওঠা সবচেয়ে বড় সাফল্য নয়; সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো নিরাপদে ফিরে আসা। কারণ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা যেমন কঠিন, সেখান থেকে নেমে আসাও ততটাই বিপজ্জনক। ক্লান্ত শরীর, কমে যাওয়া অক্সিজেন, পরিবর্তিত আবহাওয়া—সব মিলিয়ে ফেরার পথ অনেক সময় আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
তবুও মানুষ যায়। কারণ মানুষের স্বপ্ন কখনো শুধু নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কিছু মানুষ থাকে, যারা অজানাকে ছুঁতে চায়। যারা জীবনের গভীরতা খুঁজে পায় ঝুঁকির মধ্যেই।
নুরুননাহার নিম্নির এভারেস্ট জয় তাই শুধু বাংলাদেশের জন্য গর্বের মুহূর্ত নয়; এটি মানুষের ইচ্ছাশক্তিরও উদযাপন। একই সঙ্গে অরুণ কুমার তিওয়ারির মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়।
এভারেস্টের বরফঢাকা শিখরে দাঁড়িয়ে হয়তো মানুষ বারবার একই সত্যই আবিষ্কার করে—মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার শরীরে নয়, তার মন এবং স্বপ্নে।
নারীদের পর্বতারোহণ: ভাঙছে সামাজিক সীমাবদ্ধতা
রংপুরের মেয়ে নিম্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্বে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ২০০৬ সালে শিক্ষাসফরে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাওয়ার পর থেকেই তার পাহাড়ের প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর দীর্ঘ প্রস্তুতির পথে তিনি ভুটান, সিকিম ও নেপালের বিভিন্ন শৃঙ্গ জয় করেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালে নেপালের ৭ হাজার ১২৬ মিটার উচ্চতার হিমলুং হিমাল আরোহন তাকে এভারেস্ট অভিযানের জন্য আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।
বাংলাদেশ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি) আয়োজিত এবং পূবালী ব্যাংক পিএলসির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এ অভিযান শুরু হয় গত ১১ এপ্রিল। প্রায় ৫০ দিনের এই অভিযানে তিনি নেপাল হয়ে দক্ষিণ দিকের রুট ব্যবহার করেন।
এভারেস্ট জয়ের লক্ষ্যে নিম্নি কঠোর অনুশীলন করেছেন। প্রতিদিন ভোর ৫টায় দিন শুরু করতেন তিনি। পূর্ণ কর্মদিবসের পাশাপাশি নিয়মিত জিমে অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে সর্বোচ্চ ফিট রেখেছেন। ২০২২ সাল থেকেই তিনি এভারেস্ট অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, যার অংশ হিসেবে দার্জিলিংয়ে পেশাদার প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।
মন্তব্য করুন

