Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

ভিউ-বাণিজ্যের দৌড়ে গণমাধ্যম!

কাভার স্টোরি

ভিউ-বাণিজ্যের দৌড়ে গণমাধ্যম!

Icon

সাবরিনা শারমিন

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম

একসময় আমদের দেশে গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমই ছিল না, ছিল সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো এক শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষমতার চোখ রাঙানি, অর্থের প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই সহজে সংবাদমাধ্যমকে নত করতে পারত না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বছরের পর বছর ধরে সংবাদপত্রগুলো নৈতিক অবস্থান নিয়েছে, নিরলসভাবে জনমত তৈরি করেছে। সেই সাংবাদিকতা ছিল দায়িত্ববোধের, জনস্বার্থের এবং নৈতিক অঙ্গীকারের সাংবাদিকতা।

কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির বিস্তার ও ডিজিটাল বিপ্লব গণমাধ্যমকে যেমন গতিশীল করেছে, তেমনি এর এক বড় অংশকে ঠেলে দিয়েছে প্রতিযোগিতার নির্মম বাজারে। এখন সংবাদ অনেক ক্ষেত্রেই আর জনস্বার্থের প্রশ্ন নয়, বরং ‘কত দ্রুত ভাইরাল হবে’—সেই হিসাবের পণ্য। ভিউ, ক্লিক ও ট্রেন্ডের এই দৌড়ে মানবিকতা, গোপনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। ফলে কোনো মর্মান্তিক ঘটনা কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোড়ন তুললেও, খুব দ্রুতই তা হারিয়ে যায় নতুন আরেকটি ভাইরাল ঘটনার ভিড়ে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—গণমাধ্যম কি তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছে? ন্যায়বিচারের পথে সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার বদলে, সে কি এখন কেবল আবেগ ও ট্র্যাজেডিকে পণ্যে পরিণত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে?

গণমাধ্যমের গৌরবের সময়

অনেকদিন আগের একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। যে ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে, এদেশে একদিন গণমাধ্যমগুলো একত্রিত হয়ে অপ্রতিরোধ্য শক্তিশালী হয়ে উঠতে পেরেছিল। এদেশে একদিন গণমাধ্যম ক্ষমতার সামনে বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে যেতে পেরেছিল। রচিত হয়েছিল এদেশের আদালত সাংবাদিকতার (Court Journalism) সাফল্যের এক শ্রেষ্ঠ গল্প।

সময়টা ১৯৮৯ সাল। ধনী শিল্পপতি মুনির হোসেন ১৯৮৯ সালের ৮ এপ্রিল রাতে তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী শারমিন রীমাকে হত্যা করেন। স্বামীর সাথে চট্টগ্রাম বেড়াতে গিয়ে, ফেরার পথে খুন হন শারমিন রীমা। স্বামী মুনির হোসেন তাকে হত্যা করে নারায়নগঞ্জের মিজিমিজি গ্রামের কাছে ফেলে রেখে আসেন। ইডেন কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী শারমিন রীমা বিয়ের মাত্র চার মাসের মধ্যে স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়ে যান। ঘাতক স্বামী পরদিনই গ্রেপ্তার হন।

বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে ”শারমিন রীমা হত্যা মামলা” ছিল অন্যতম এক চাঞ্চল্যকর ও কুখ্যাত ফৌজদারি মামলা। মুনির ছিলেন তৎকালীন খ্যাতনামা ও প্রভাবশালী চিকিৎসক দম্পতি ডা. মেহেরুন্নেসা ও আবুল কাশেমের পুত্র এবং নিজে একজন ধনী শিল্পপতি। শারমিন ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক নিজামউদ্দিন আহমেদের কন্যা।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯০ সালের ২১ মে আদালত মুনিরকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সমস্ত আইনি লড়াই এবং সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখানের পর, হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ চার বছর পর ১৯৯৩ সালের ২৭ জুলাই ফাঁসির মাধ্যমে মুনির হোসেনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।  

তবে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর দিন থেকে দণ্ড কার্যকর করার এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। হত্যাকারীর খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী মা ডা. মেহেরুন্নেসা তাঁর অপরাধী সন্তানকে বাঁচানোর সব ধরনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বিপুল খ্যাতি, সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাব সবকিছুই সেদিন ব্যর্থ হয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, এই প্রভাবশালী পরিবারটি সে সময় গণমাধ্যমকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে পারেনি।  

১৯৮৯ সালের শারমিন রীমা হত্যা মামলায় গণমাধ্যম অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল; বিশেষ করে সংবাদপত্র। সে সময় বাংলাদেশে কোনো ফেসবুক বা ডিজিটাল মিডিয়া ছিল না, কোনো ঘটনা ‘ভাইরাল’ হওয়ার উন্মাদনাও ছিল না। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিও বাংলাদেশ, আর গুটিকয়েক সংবাদপত্রই ছিল তথ্যের একমাত্র উৎস। ঘাতক পক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় আইনি লড়াইটি ছিল অসমান। কিন্তু সেই অসমান লড়াইয়ে ভিকটিমের পক্ষে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এদেশের সংবাদমাধ্যম। দীর্ঘ চার বছর ধরে সংবাদপত্রগুলো এক কলামে হলেও ‘রীমা হত্যা’ মামলার ফলোআপ ছেপে গেছে। মিডিয়া রীমাকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। নিয়মিত নতুন তথ্য উদঘাটন, আদালতের খবরাখবর এবং সত্যনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে মামলাটিকে জনমানসে বাঁচিয়ে রেখেছিল গণমাধ্যম। মিডিয়ার সেই সীমিত সুযোগের সময়ও গণমাধ্যম সক্ষম হয়েছিল জনসাধারণকে এই মামলাটির সঙ্গে একাত্ম করতে। মিডিয়ার এই নিরবচ্ছিন্ন ও অনমনীয় ফোকাসের কারণেই শেষ পর্যন্ত অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি সুনিশ্চিত হয়েছিল। এটি আমাদের গণমাধ্যমের ইতিহাসে অনুসন্ধানী ও আদালত সাংবাদিকতার একটি ঐতিহাসিক সফলতার গল্প।

ভিউ-বাণিজ্যের মিডিয়া যুগ

২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মিডিয়ার এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। এটি ঠিক যে গত সাড়ে তিন দশকে মিডিয়ার ধরন,পরিধি ও বৈশিষ্ট্য ব্যাপক বদলে গেছে। গুটিকয়েক সংবাদপত্র, একটি রাষ্ট্রায়ত্ব টেলিভিশন ও রেডিওর জায়গায় আজ এসেছে শত শত অনলাইন পোর্টাল, অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। জনমনে এগুলোর তাৎক্ষণিক প্রভাবও অত্যন্ত প্রবল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বুদ্ধিবৃত্তিক ও দায়িত্বশীল চর্চা থেকে সরে এসে বর্তমান মিডিয়া এখন ‘ক্লিক-ড্রিভেন’ (Click-driven) বা ভিউ-সর্বস্ব  হয়ে পড়েছে। জনস্বার্থের চেয়ে যেকোনো ইস্যুকে ’ভাইরাল’ করার প্রবণতাই এখন মুখ্য, যার সাথে জড়িয়ে আছে বাণিজ্য সংযোগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে ‘ভিউ বাণিজ্য’। আর এই ইঁদুরদৌড় থেকে মুলধারার গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণগুলোও নিজেদের মুক্ত রাখতে পারছে না।

সাম্প্রতিক সময়ের আছিয়া কিংবা রামিসার ঘটনাগুলোর দিকে তাকালেই মিডিয়ার এই রূপান্তরিত চরিত্রটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গত বছর আছিয়া নামের একটি শিশু নির্মম ধর্ষণের শিকার হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। ঘটনাটি ফেসবুকে ব্যাপক প্রচারের ফলে সারাদেশ প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। ব্যাপক গণপ্রতিবাদের মুখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসামী গ্রেপ্তার হয়, বিচারের সম্মুখীন হয় এবং ধর্ষকের ফাঁসির রায়ও হয়।

তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছিয়ার মামলাটিকে  বিশেষ মামলা বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে রায় কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রায় কার্যকর হয়নি। মামলাটি হয়তো দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে সাধারণ দীর্ঘসূত্রিতার আইনি আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে। যেহেতু ঘটনাটি মিডিয়া থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে, কোনো মিডিয়া ফলোআপ নেই, তাই ঘটনাবহুল জীবনে মানুষও তা ভুলে গেছে। অথচ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পুরো দেশ একসময় ফুঁসে উঠেছিল, বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা প্রতিশ্রুতির ঝুড়ি নিয়ে আছিয়ার পরিবারের উঠানে হাজির হয়েছিলেন।

আমরা একই চিত্র দেখেছি গত ১৯ মে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া সাত বছরের শিশু রামিসার ক্ষেত্রেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও অনলাইন মিডিয়ায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ অবিশ্বাস্য দ্রুততায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত মিডিয়ার ভূমিকা ইতিবাচক ছিল। কিন্তু এর পরপরই শুরু হয় অনলাইন মিডিয়াগুলোর ভিউ বাণিজ্য। ব্যক্তিগত পরিসীমা অতিক্রম করে তাদের ক্যামেরা ঢুকে পড়ে রামিসার পরিবারের বেডরুমে।  রামিসার বাবা-মা কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, কীভাবে শোকে বিলাপ করছেন, সারাক্ষণ তাঁদের মুখের সামনে ক্যামেরা তাক করে রাখা হচ্ছে। অথচ এই ক্যামেরা এখন তাক করার কথা আদালতের বারান্দায়, বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ওপর।

রামিসার বাবা-মার ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করা বন্ধ করে তা আইনি প্রক্রিয়ার দিকে ফোকাস করলে হয়তো তাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথটি সহজ ও গতিশীল হতে পারে; নইলে রামিসার ঘটনাটিও আছিয়ার ঘটনার মতো কিংবা অতীতের আর দশটি ঘটনার মতো হারিয়ে যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী কতজন ভিকটিমের বাড়ি যাবেন

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে নিহত রামিসার বাড়ি গিয়েছেন, পরিবারকে সান্ত্বনা ও দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন এবং রামিসার বড় বোনের পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন। সরকারপ্রধানের এই সংবেদনশীলতা ও জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক তাড়নাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাই। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের এই  প্রশ্নটিও তোলা প্রয়োজন— এটি কি আসলেই কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান? প্রধানমন্ত্রী কতজন ভিকটিমের বাড়িতে যাবেন, ব্যক্তিগতভাবে তদারকি করবেন এবং বিচার নিশ্চিত করবেন?

তাছাড়া এর ভিন্ন একটি প্রেক্ষিতও আছে। প্রধানমন্ত্রীর পদটি সরকার কাঠামোর সর্বোচ্চ অবস্থান। এই পদধারী ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভার অনেক বেশি। যখন চরম বিপর্যস্ত ও অসহায় একটি ভিকটিম পরিবারের সামনে স্বয়ং সরকারপ্রধান গিয়ে দাঁড়ান, তখন সেখানে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। এই বিপুল ব্যক্তিত্বের ভারের কাছে ভিকটিমদের নিজস্ব ও স্বাধীন কণ্ঠস্বর ন সংকুচিত হয়ে পড়ে। তারা আর জোরালোভাবে তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন না। তারা নিজেদের অধিকারের দাবি, বিচারের দাবি, আইন ও বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে পারেন না।

এর চেয়েও বড় কথা, প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় যদি সরকারপ্রধানকে নিজে গিয়ে আশ্বাসের বাণী শোনাতে হয়, তবে তা পরোক্ষভাবে আমাদের আইনি ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে। বিচার প্রক্রিয়া সচল হওয়া উচিত স্বয়ংক্রিয়, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী আইনি কাঠামোয়, কোনো ব্যক্তির বিশেষ অনুগ্রহ, সহানুভূতি বা মৌখিক আশ্বাসে নয়।

পরিশেষে, আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলো এমনভাবে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন, যেন সাধারণ মানুষকে চরম হতাশায় ‘বিচার চাই না’ বলে আহাজারি করতে না হয়। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের জায়গাটিতেই মিডিয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মিডিয়া যদি সাময়িক ভিউ বাণিজ্য ও সস্তা জনপ্রিয়তার স্রোত থেকে বের হয়ে এসে আইন ও বিচার ব্যবস্থার জবাদিহিতা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে তৈরি হবে আরও অসংখ্য ‘শারমিন রীমা হত্যা মামলা’র মতো বিচারিক সফলতার গল্প। সাংবাদিকতায় ফিরে আসবে সুস্থতা, গণমাধ্যমে ফিরবে গৌরব।

সাবরিনা শারমিন, উন্নয়ন ও যোগাযোগ কর্মী

মন্তব্য করুন

Logo