২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু, ছবি: সংগৃহীত
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বাস্তবায়নের দাবি
দ্রুত বিচার, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তিসহ ১৭ দফা দাবি ১৫৬ সংগঠনের
কাভার স্টোরি ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১১:০২ এএম
দেশজুড়ে নারী, কন্যাশিশু ও শিশুদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, হত্যা, পারিবারিক নির্যাতন, সাইবার সহিংসতা, অপহরণ ও পাচারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও প্ল্যাটফর্ম। তারা বলছে, এসব ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও বিচারব্যবস্থার সামনে এটি এখন এক গভীর মানবিক ও নৈতিক সংকট।
এই পরিস্থিতিতে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার এবং প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে সংগঠনগুলো।
৬৪ জেলার ১৫৬ সংগঠনের অংশগ্রহণ
গত ২৩ মে শুক্রবার, রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় কর্মরত বিভিন্ন সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয় দেশের ৬৪ জেলার ১৫৬টি সংগঠন। এর মধ্যে ছিল মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটসহ বিভিন্ন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রাজধানীর পল্লবী ও বনশ্রী থেকে শুরু করে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, মাগুরা, নেত্রকোনার মদনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারী ও শিশুদের ওপর সংঘটিত ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্যা ও যৌন সহিংসতার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গোটা জাতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
বক্তব্য দেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম এবং আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক।
তারা বলেন, নারী ও শিশুরা আজ নিজেদের ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নিরাপদ বোধ করছে না। বিশেষ করে মাদ্রাসাসহ ধর্মভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু ও কিশোরীদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কিন্তু কার্যকর মনিটরিং, অভিযোগ গ্রহণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় কর্মরত বিভিন্ন সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয় দেশের ৬৪ জেলার ১৫৬টি সংগঠন, ছবি: সংগৃহীতকেসস্টাডি: ভেড়ামারার সেই শিশু
সংবাদ সম্মেলনে কেসস্টাডি হিসেবে তুলে ধরা হয় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় এক আবাসিক মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার ঘটনা।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার কুঠিবাজার এলাকার জামিলাতুন্নেসা আশারিয়া মহিলা হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী এক আবাসিক শিশুশিক্ষার্থীর ওপর সংঘটিত নির্যাতনের ঘটনাটি শিশু সুরক্ষা ও আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ভুক্তভোগী শিশুটির ছদ্মনাম “সামিয়া”। নিম্নআয়ের একটি পরিবারের সন্তান সামিয়াকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ওই মাদ্রাসায় আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি করা হয়। মাদ্রাসাটি একটি ভাড়াকৃত দ্বিতল ভবনে পরিচালিত হতো। ভবনের নিচতলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন প্রতিষ্ঠাতা ও সুপার মাওলানা মো. সাইদুর রহমান।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে ঈদুল ফিতরের ছুটির আগে শিশুটি যৌন সহিংসতার শিকার হয়। ১৬ মার্চ শিশুটির মা তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে মাদ্রাসায় গেলে মেয়েকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। এ সময় মাদ্রাসা সুপারের স্ত্রী দাবি করেন, শিশুটির জ্বর হয়েছে।
পরে শিশুটিকে ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা অবস্থার গুরুতর অবনতি দেখে কুষ্টিয়া সদরের আমিন ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সার্ভিসেসে পাঠান। সেখানে চিকিৎসা পরীক্ষায় শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং যৌন সহিংসতার আলামত পাওয়া যায়।
মেডিকেল রিপোর্ট ও পরিবারের বয়ান অনুযায়ী, শিশুটির যোনিদ্বারে গুরুতর আঘাত ও রক্তক্ষরণ, কপালে আঘাত, বাম গোড়ালির জয়েন্টে আঘাত এবং বাম পায়ের নিচের অংশে জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়। পরে তার ফুসফুসেও সংক্রমণ দেখা দেয়। পরিবারের অভিযোগ, শারীরিক নির্যাতন ও বুকে আঘাতের কারণেই এই জটিলতা তৈরি হয়।
ভেড়ামারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, ১৬ মার্চ সকালে শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরিবার প্রথমে পায়ে ব্যথার কথা বললেও প্রাথমিক পরীক্ষায় চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন, শিশুটি যৌন নির্যাতনের ফলে ব্যাপক রক্তক্ষরণের শিকার হয়েছে।
পরে শিশুটিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, শিশুটি টানা ১৩ দিন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল। হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে. বিশ্বাস সংবাদমাধ্যমকে জানান, শিশুটির অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক এবং তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ও যৌন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির দীর্ঘসময় জ্বর ছিল, ফুসফুসের সংক্রমণও জটিল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে মানসিকভাবেও সে ছিল চরম আতঙ্কগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সে সেখানেই চিকিৎসাধীন। পরিবারের ভাষ্য, শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি শিশুটির মনে গভীর মানসিক ট্রমাও রয়ে গেছে।
এ ঘটনায় শিশুটির মা বাদী হয়ে ভেড়ামারা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও সুপার মাওলানা মো. সাইদুর রহমানকে। এছাড়া তার স্ত্রী শামীমা খাতুন এবং শিক্ষক রিশা খাতুনকেও আসামি করা হয়েছে। তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও স্থানীয় সংবাদসূত্র অনুযায়ী, একজন বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। মামলার তদন্ত করছেন ভেড়ামারা থানার ওসি মুহাম্মদ জাহেদুর রহমান এবং কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন।
পরিবারের অভিযোগ, মামলা দায়েরের পর থেকে তাদের বিভিন্নভাবে আপসের চাপ দেওয়া হচ্ছে। নগদ অর্থের প্রস্তাব এবং উন্নত বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। তবে পরিবার সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। শিশুটির বাবার অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকেও আপসের চাপ এসেছে।
চার মাসে ধর্ষণের শিকার ১৭৮ নারী ও কন্যাশিশু
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৮ জন নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে ৫০টি ছিল দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে।
অন্যদিকে, জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ১১টি জাতীয় দৈনিক ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের বিরুদ্ধে ১৯৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ১১৮টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ৪৬টি।
বক্তারা বলেন, বাস্তবে নির্যাতনের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, ভয়ভীতি, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি পরিবারের পরিচিত, শিক্ষক কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল হওয়ায় পরিবার অভিযোগ করতেও ভয় পায়।
‘আইন আছে, প্রয়োগ নেই’
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি, তদন্তে গাফিলতি, দীর্ঘসূত্রিতা, মেডিকেল রিপোর্ট পেতে বিলম্ব, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একই ধরনের অপরাধ পুনরাবৃত্তির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো শুধু সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করছে না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
দাবি ১৭ দফা
সংবাদ সম্মেলনে নারী ও শিশু নির্যাতনকে জাতীয় জরুরি ইস্যু ঘোষণা করে ১৭ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি কার্যকর বাস্তবায়ন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন, মাদ্রাসাসহ ধর্মভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নজরদারি কাঠামো গঠন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, সাক্ষ্য প্রদান প্রক্রিয়াকে যুগোপযোগী করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন, অভিযুক্ত ও পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের তথ্যভিত্তিক কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ডাটাবেজ তৈরি, সাইবার সহিংসতা ও ডিজিটাল যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বিশেষ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, থানা পর্যায়ে নারী ও শিশুবান্ধব ডেস্ক শক্তিশালী করা, শিক্ষা কারিকুলামে লিঙ্গসমতা ও মানবাধিকারভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, স্থানীয় সরকার ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক সচেতনতা আন্দোলন গড়ে তোলা, গণপরিবহন ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিশু সুরক্ষা নীতিমালার কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সমন্বিত জাতীয় ডাটাব্যবস্থা গড়ে তোলা
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। বিচারহীনতা, সামাজিক নীরবতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ না হলে সহিংসতা আরও বাড়বে, আর সমাজে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা স্থায়ী রূপ নেবে। তাই অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়।
মন্তব্য করুন

