Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

শরিয়া আইন, ধর্ষণ এবং শাস্তির রাজনীতি: আহমাদুল্লাহর পোস্ট

কাভার স্টোরি

শরিয়া আইন, ধর্ষণ এবং শাস্তির রাজনীতি: আহমাদুল্লাহর পোস্ট

Icon

আসিফ বিন আলী

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০৩:১২ পিএম

শায়খ আহমাদুল্লাহ বাংলাদেশের একজন প্রভাবশালী ইসলামিক বক্তা এবং আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। তার কথা সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ব পায়। তার ফেসবুক পোস্ট লাখো মানুষ পড়ে, শেয়ার করে, মতামত গঠন করে। ফলে তিনি যখন ধর্ষণ নিয়ে কথা বলেন, সেটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকে না। সেটি সমাজে বিচার, আইন, নারী, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্র নিয়ে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক পোস্টে তিনি বলেছেন, “সাত বছরের মেয়েও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয় তারা নরপিশাচ। এইসব নরপিশাচের মাত্রা কমিয়ে আনার একমাত্র সমাধান শরীয়া আইন।” প্রথম দেখায় কথাটি খুব শক্ত মনে হয়। ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন শিশু ভিকটিম হয়, তখন সমাজের ভেতরে আতঙ্ক, রাগ এবং বিচার চাওয়ার তীব্রতা তৈরি হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আহমাদুল্লাহ এই ক্ষোভকে বিচারব্যবস্থার সংস্কার, তদন্তের দক্ষতা, আদালতের দ্রুততা, ভিকটিম সাপোর্ট, সামাজিক শিক্ষা বা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বিশ্লেষণের দিকে নেননি। তিনি সরাসরি বলেছেন, সমাধান শরীয়া আইন। এই সরলীকরণটাই বিপজ্জনক।

ধর্ষণ একটি জটিল সামাজিক অপরাধ। এটি শুধু “পাশবিক কামনা” বা “নৈতিক অবক্ষয়” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ধর্ষণের সঙ্গে ক্ষমতা, লিঙ্গ বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক অধিকারবোধ, সামাজিক নীরবতা, বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশি অদক্ষতা, পরিবারের চাপ, আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এবং ভিকটিম-ব্লেমিং জড়িত। অনেক সময় ধর্ষক ভিকটিমের পরিচিত মানুষ, আত্মীয়, শিক্ষক, প্রতিবেশী, ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা স্থানীয় প্রভাবশালী হয়। তাই ধর্ষণকে কেবল “বিকৃত কামনা” বলে ব্যাখ্যা করলে আসল ক্ষমতার সম্পর্ক আড়ালে চলে যায়।

আহমাদুল্লাহর পোস্টে সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি হলো রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার বাস্তব প্রশ্ন। ধর্ষণের মামলায় তদন্ত কতটা দ্রুত হয়? ফরেনসিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? পুলিশ কতটা সংবেদনশীল? ভিকটিম ও পরিবার কতটা নিরাপদ? আদালতে মামলা কত বছর চলে? স্থানীয় প্রভাবশালীরা কীভাবে চাপ দেয়? মীমাংসার নামে কীভাবে অপরাধ ঢেকে দেওয়া হয়? এসব প্রশ্ন না তুলে শুধু “শরীয়া আইন” বললে জনতার রাগকে ধর্মীয় শাস্তির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এতে শাস্তির দাবি জোরালো হয়, কিন্তু বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের দাবি দুর্বল হয়ে যায়।

সমাজতত্ত্বে এই প্রবণতাকে “penal populism” বা শাস্তিমুখী জনতাবাদ দিয়ে বোঝা যায়। অপরাধ ঘটলে জনতার আবেগকে ব্যবহার করে কঠোর শাস্তির দাবি তোলা খুব সহজ। এতে বক্তা জনপ্রিয় হন, মানুষ মনে করে “কঠোর ব্যবস্থা” নিলেই সমাজ ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কঠোর শাস্তি সবসময় অপরাধ কমায় না। অপরাধ কমাতে লাগে নিশ্চিত বিচার, দ্রুত তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহের দক্ষতা, সামাজিক প্রতিরোধ, শিক্ষা, পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি। শাস্তি কঠোর কিন্তু বিচার অনিশ্চিত হলে অপরাধী ভয় পায় না। বরং প্রভাবশালী অপরাধী আরও সহজে মামলা সামাল দেয়, আর দুর্বল মানুষ আইনের চাপে পড়ে।

আহমাদুল্লাহর বক্তব্যের আরেকটি সমস্যা হলো “শরীয়া আইন”কে তিনি একটি সর্বসমাধান হিসেবে হাজির করেছেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন কোনো একক ধর্মীয় ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়াতে পারে না। বাংলাদেশে মুসলমান আছে, হিন্দু আছে, বৌদ্ধ আছে, খ্রিস্টান আছে, আদিবাসী আছে, নাস্তিক আছে, নানা মতের নাগরিক আছে। রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য সমান হতে হবে। যদি ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার ধর্মীয় আইনের ভাষায় দাবি করা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে: কোন ব্যাখ্যার শরীয়া? কার ব্যাখ্যা? কে প্রয়োগ করবে? রাষ্ট্র, আলেম, আদালত, নাকি জনতার চাপ? এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে আইন নয়, নৈতিক কর্তৃত্বের রাজনীতি তৈরি হয়।

গণতন্ত্রের জন্য এখানেই ঝুঁকি। আজ ধর্ষণের ঘটনায় শরীয়া আইন চাই বলা হচ্ছে। শুনতে অনেকের কাছে ন্যায়বিচারের ভাষা মনে হতে পারে। কিন্তু কাল এই একই ভাষা ব্যবহার হতে পারে নারী স্বাধীনতা, প্রেম, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, পোশাক, বিশ্ববিদ্যালয়, সহশিক্ষা, এমনকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। কারণ যখন রাষ্ট্র নৈতিকতার পাহারাদার হয়ে ওঠে, তখন তার নিয়ন্ত্রণ শুধু অপরাধীর ওপর থামে না। তা নাগরিকের জীবনযাপন, চিন্তা, সংস্কৃতি এবং স্বাধীনতার ওপরও নামে। ইতিহাসে এই পথ নতুন নয়।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আহমাদুল্লাহ তাঁর কমেন্টে “অবাধ যৌনতা”, “সাহিত্য ও বিনোদনের নামে যৌন উস্কানি”, “পর্ন ইন্ডাস্ট্রি”, “নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন” ইত্যাদি প্রসঙ্গ এনেছেন। নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের সমালোচনা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সবকিছুকে একসঙ্গে মিশিয়ে দিলে ধর্ষণের দায় অপরাধী, বিচারব্যবস্থা ও পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা থেকে সরে গিয়ে সংস্কৃতি, নারী স্বাধীনতা ও আধুনিক জীবনযাপনের ওপর পড়ে। এখানেই সমস্যা। ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে সমাজ যেন নারীর ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপের দিকে না যায়।

ফেমিনিস্ট সমাজতত্ত্ব বহুদিন ধরে বলছে, ধর্ষণ যৌনতার সমস্যা নয়, ক্ষমতার সমস্যা। ধর্ষক শুধু কামনা দ্বারা চালিত নয়; সে অনেক সময় ক্ষমতা দেখায়, দখল দেখায়, নারী বা শিশুকে অধীনস্থ হিসেবে দেখে। তাই সমাধানও কেবল “যৌনতা নিয়ন্ত্রণ” নয়। সমাধান হলো ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলানো। ছেলেদের শেখাতে হবে সম্মতি কী, নারী মানুষ হিসেবে স্বাধীন সত্তা, শিশুর শরীর তার নিজের, পরিবারে নীরবতা অপরাধকে রক্ষা করে, এবং ধর্মীয় ভাষায় নারীকে সম্মান করার কথা বললেও বাস্তবে যদি নারীকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু করা হয়, তাহলে সহিংসতার সংস্কৃতি ভাঙে না।

এই পোস্টে নৈতিক ক্ষোভ আছে, কিন্তু সমাজতাত্ত্বিক গভীরতা নেই। শাস্তির ভাষা আছে, কিন্তু বিচারব্যবস্থার সংস্কারের ভাষা নেই। ধর্মীয় সমাধানের দাবি আছে, কিন্তু বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বাস্তবতা নেই। ধর্ষকের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা আছে, কিন্তু ধর্ষণ তৈরি করা ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ নেই। এ কারণেই পোস্টটি জনপ্রিয় হলেও বিপজ্জনক। জনপ্রিয় নৈতিকতা অনেক সময় ন্যায়বিচারের বিকল্প হয়ে উঠতে চায়। আর সেটাই গণতন্ত্রের জন্য খারাপ খবর।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ধর্ষণের বিচার অবশ্যই কঠোর হতে হবে, কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে আইনের শাসনের ভেতরে। দ্রুত বিচার চাই, কিন্তু বিচার যেন প্রমাণভিত্তিক হয়। শাস্তি চাই, কিন্তু শাস্তির রাজনীতি নয়। সামাজিক সংস্কার চাই, কিন্তু নৈতিক পুলিশিং নয়। ধর্মীয় বক্তারা সমাজে নৈতিক ভাষা দিতে পারেন, কিন্তু রাষ্ট্রের আইনকে ধর্মীয় উত্তেজনা দিয়ে চালানো যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে রক্ষা করা, অপরাধীকে বিচার করা, এবং একই সঙ্গে নাগরিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে আমাদের আবেগের দরকার আছে, কিন্তু শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়। আমাদের দরকার কার্যকর পুলিশ, দক্ষ তদন্ত, দ্রুত আদালত, ভিকটিম সাপোর্ট, শিশু সুরক্ষা, জেন্ডার শিক্ষা, পরিবার ও সমাজের নীরবতা ভাঙা, এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামাজিক কাজ। শরীয়া আইনকে একমাত্র সমাধান বলা সহজ। কিন্তু সহজ উত্তর সবসময় সঠিক উত্তর নয়। অনেক সময় সহজ উত্তরই সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক দরজা খুলে দেয়। 

আসিফ বিন আলী: ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র

মন্তব্য করুন

Logo