অ্যামচেমের এক সংলাপে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ছবি: সংগৃহীত
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ০৮:৪৭ এএম
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন ঢাকার শেরাটন হোটেলে ২৮ এপ্রিল অ্যামচেমের এক সংলাপে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বক্তব্য দেন। যেটি ২০ মে প্রথম আলো দৈনিকে ছাপা হয়। সেটি পড়ে দেখা যায় ভাষণে মার্কিন রাষ্ট্রদূত অন্তত ২১টি ভুল তথ্য প্রদান করেছেন। সেগুলো তুলে ধরে প্রকৃত সত্য কি সেটিও এখানে উপস্থাপন করা হল।
ভুল তথ্য-১. মি. ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা বিকৃত বাণিজ্য সম্পর্ককে জিইয়ে রাখার নীতিগুলো থেকে সরে আসছে।
প্রকৃত সত্য: ট্রাম্প এতদিনকার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্যের সম্পর্ককে চূড়ান্ত রকমের বিকৃত করার মধ্য দিয়েই এই রেসিপ্রকাল ট্যারিফ চাপাচ্ছেন। এসব চুক্তি করে বেড়াতে বিভিন্ন দেশকে চাপ দিচ্ছেন। ফলে ট্রাম্পই আসলে বাণিজ্য সম্পর্ককে অদৃষ্টপূর্বভাবে বিকৃত করেছেন।
ভুল তথ্য-২. তিনি আরও বলেছেন, সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অনিয়মকে উৎসাহিত করে এবং অস্বচ্ছ বাজারব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে এমন নীতি থেকে ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা সরে এসেছে।
প্রকৃত সত্য: ট্রাম্পের দুর্নীতি আর অনিয়মের এত এত খবর পত্রিকায় পাওয়া যায় যে এই মন্তব্য করে রাষ্ট্রদূত নিজেই আরেকটা ট্রাম্পে পরিণত হলেন। ট্রাম্প এক ইলন মাস্ককেই যেভাবে আইন বহির্ভূতভাবে ক্ষমতা দিয়েছেন সেটাই এর এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি যেভাবে বাজারব্যবস্থাকে ‘ঢেলে সাজাচ্ছেন’ সেটি চূড়ান্ত রকমের অস্বচ্ছ এবং এর ফলে তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে যেমন আর্থিক লাভ করছেন তেমনি এতে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে কেবল তার মিত্র বড় বড় কর্পোরেশনগুলো। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই ট্রাম্পের এইসব অস্বচ্ছতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্য লোককে বড় দায়িত্বে বসানো, তার পরিবারের ক্রিপ্টো কারেন্সির ব্যবসা এসব নিয়ে অভিযোগ, ক্ষোভের অন্ত নেই।
ভুল তথ্য-৩. তিনি বলেছেন, এখন আমরা এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছি, যা আমাদের দুই দেশের মানুষের জন্যই লাভজনক ফল দেবে।
প্রকৃত সত্য: চুক্তি যেই মডেলে এগোচ্ছে তাতে দুই দেশের জন্য লাভজনক ফল না, কেবল আমেরিকাকে, বিশেষ করে ট্রাম্প এবং তার মিত্রদের জন্য লাভজনক ফল দেবে। যেমন বাংলাদেশকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি ক্রয়, ১৪টা বোয়িং ক্রয়, ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য ক্রয় এসবে বাধ্য করা। বিনিময়ে বাংলাদেশের উপর আগে যা শুল্ক ছিল তার উপর ১৯ শতাংশ শুল্ক চাপানো। এই তো বাংলাদেশের তথাকথিত ‘লাভ’?
ভুল তথ্য-৪. তিনি বলেছেন, এই নীতি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে, যেখানে সহায়তার চেয়ে বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যেখানে সাহায্যের চেয়ে বিনিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রকৃত সত্য: এই ধরনের চুক্তি ট্রাম্প করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে। অর্থাৎ সরাসরি আসলে আমেরিকাকে সাহায্য করতে তিনি অন্যান্য দেশকে চাপ দিচ্ছেন। ফলে এখানে অগ্রাধিকার মোটেও বাণিজ্য বা বিনিয়োগ না। এখানে অগ্রাধিকার আসলে আমেরিকাকে তার বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে সহায়তা ও সাহায্য করতে বাংলাদেশসহ অপরাপর দেশকে বাধ্য করা।
ভুল তথ্য-৫: তিনি বলেছেন ট্রাম্পের নীতিতে এমন একটি সত্যিকারের অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হয়, যা দুই দেশকেই সুযোগ তৈরি করে দেয়।
প্রকৃত সত্য: মার্কিন চুক্তির ফলে ১৩১টা করণীয় করতে হবে বাংলাদেশকে আর আমেরিকাকে ৬টা। ফলে আসলে কোন সত্যিকারের অংশীদারত্ব গড়া হচ্ছে না। যা গড়ে তোলা হচ্ছে সেটা হল ট্রাম্পের আদেশ বাস্তবায়ন কাঠামো।
ভুল তথ্য-৬. তিনি বলেছেন, যদি এই চুক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করা হয় এবং বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি শুধু দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যই বাড়াবে না বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরও উঁচু স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
প্রকৃত সত্য: দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য কথাটা আসলে বিভ্রান্তিকর। প্রকৃতপক্ষে এটি কেবল বাংলাদেশে মার্কিন রপ্তানি বাড়াবে। এবং নানা দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্বভৌমত্বকে নষ্ট করার মধ্য দিয়ে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রকৃতপক্ষে আরও তলানিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে। একদিকে বাংলাদেশ হারাবে রাজস্ব, অন্যদিকে বাড়বে জিনিসপত্রের দাম, ওষুধের দাম, আরেকদিকে ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ হয়ে পড়বে মার্কিনীদের হাতের পুতুল।
ভুল তথ্য-৭. তিনি বলেছেন, এআরটি (মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি) একটি অত্যন্ত ভালো চুক্তি।
প্রকৃত সত্য: এই চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য সর্বকালের অন্যতম জঘন্য একটা চুক্তি।
ভুল তথ্য-৮. তিনি বলেছেন, চুক্তিটি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ১৯ শতাংশ প্রতিযোগিতামূলক শুল্কহারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সাহায্য করবে। চুক্তি না থাকলে এই হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত।
প্রকৃত সত্য: এই মুহূর্তে এর চেয়ে ডাহা মিথ্যা কথা আর হয় না। কারণ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গত ২১ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের চাপানো শুল্ককে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে। ফলে ১৯ শতাংশ শুল্ক এখন আর কার্যকর না। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে ট্রাম্প এখন ১৫০ দিনের জন্য ১০ শতাংশ শুল্ক বসাতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনবলে যেটিকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত করা যাবে। ফলে এতদিন পর এসেও চুক্তি না থাকলে এই শুল্কহার ৩৫ শতাংশ হতে পারত বলে রাষ্ট্রদূত একটা ডাহা মিথ্যা কথা বলেছেন।
ভুল তথ্য-৯. রাষ্ট্রদূতের কথামতো, একই সঙ্গে এই চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ তার শুল্কহার এবং অ-শুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতায় কিছু পরিবর্তন আনবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ে এবং দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যপূর্ণ হয়। তিনি বলেছেন এটি আসলে খুবই সাধারণ যুক্তিবোধের বিষয়।
প্রকৃত সত্য: জ্বি না। এটা কোন সাধারণ যুক্তবোধের বিষয় না। এখানে কোন যুক্তিই নাই আসলে। খুবই সাধারণ যুক্তিবোধ হল এটাই যে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি বাড়ানো বাংলাদেশের মাথাব্যাথা হতে পারে না। বাংলাদেশের মাথাব্যাথা হল বাংলাদেশের স্বার্থ দেখা যেটা এই চুক্তিতে রক্ষিত হয় নাই। এই চুক্তির একমাত্র উদ্দেশ্য বাংলাদেশের উপর আমেরিকার অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। ফলে খুবই সাধারণ যুক্তিবোধ এটাই বলে যে বাংলাদেশের এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করা উচিত নয়।
ভুল তথ্য-১০. রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যদি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব কম আমদানি করে এবং অন্য দেশ থেকে বেশি আমদানি করে, তাহলে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব হয় না। বরং এর ফলে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়। আর সেই ঘাটতি সে বাজারকেই দুর্বল করে, যেটির ওপর আপনি নির্ভর করছেন।
প্রকৃত সত্য: টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য একটা দেশের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব থাকাটা অতীব জরুরী যেটা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে নষ্ট হবে। দ্বিতীয়ত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যঘাটতি নতুন কিছু নয়। এই বাণিজ্যঘাটতি নিয়েই এতদিন তারা টিকে ছিল। কোন বড় অসুবিধা ছাড়াই। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা আমাদের কাজ না। চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বাণিজ্য ঘাটতির জন্য দুর্বল হচ্ছে না। দুর্বল হচ্ছে ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ নীতির কারণে। একই সাথে যেভাবে ট্রাম্প শুল্ক যুদ্ধ চালাচ্ছে মূলত তার ফলেও আমেরিকার বাজার দুর্বল হয়ে পড়ছে আমদানি করা জিনিসের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি তৈরির মাধ্যমে। ফলে নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানো বাদ দেন মি. রাষ্ট্রদূত!
ভুল তথ্য-১১. তিনি বলেছেন, সাধারণত গণমাধ্যম এবং বিশ্লেষকেরা শুধু দামের ওপর জোর দেন; কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মান ও প্রোটিনের পরিমাণের মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেন। তিনি আরও বলেন যুক্তরাষ্ট্রের গমে প্রোটিনের মাত্রা ১১.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এটাকেই বলা যায় উচ্চমূল্যের পণ্য এবং আমি গর্বিত যে এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ উচ্চমানের মার্কিন কৃষিপণ্য ভোগ করতে পারবে।
প্রকৃত সত্য: বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম কেবল দামের উপর জোর দিচ্ছে এই কথাটাও সঠিক নয়। গমের ক্ষেত্রে যে আলাপটা উঠছে সেটা হল কোন দেশ থেকে গম আনা সবদিক বিবেচনা করে বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপকারী। এবং সেটা মোটেও আমেরিকা নয়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন পুষ্টিচাহিদা মেটাতে উচ্চ প্রোটিনের গমের আসলে কোন দরকার নাই। সাধারণ প্রোটিন সমৃদ্ধ গমই যথেষ্ট। গমের উচ্চ প্রোটিন মূলত দরকার হয় বেকারি শিল্প আর রন্ধনশিল্পের জন্য। গমের প্রোটিন অর্থাৎ গ্লুটেন ময়দার খামিরকে আরও আঠালো হতে সাহায্য করে। পাউরুটি, বার্গার বান, পিৎজা এসবের জন্য উচ্চ গ্লুটেন হলে ভাল। এরচেয়ে বেশি এটার আর কোন ব্যবহার নাই। সাধারণ মানুষের পুষ্টির জন্য গমের উচ্চ প্রোটিনের চেয়ে বেশি জরুরী হল কোন আটা খাওয়া হচ্ছে সেটা। সাদা আটার চেয়ে লাল আটা বেশি ভাল পুষ্টির জন্য।
ভুল তথ্য-১২. রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য কিনবে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি বর্তমান হারে অব্যাহত রাখলেই পূরণ হয়ে যাবে।
প্রকৃত সত্য: রাষ্ট্রদূত যেটা লুকাচ্ছেন সেটি হল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে এলপিজি নিতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ সেটার প্রধান কারণ আমেরিকার চাপিয়ে দেয়া ইরান যুদ্ধ। ফলে এখন যে হারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশ সেটা কোন স্বাভাবিক হার নয়। তাদের চাপিয়ে দেয়া ইরান যুদ্ধের ফলেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলপিজি আনতে পারছে না বাংলাদেশ। বেশি দাম দিয়ে আমেরিকার এলপিজি কিনতে হচ্ছে। যার ফলে এলপিজির সিলিন্ডারের দামও বেড়ে গেছে। ফলে আগামী ১৫ বছর ধরে এই কাণ্ড অব্যাহত থাকলে এলপিজির দাম আরও বাড়বে।
ভুল তথ্য-১৩. তিনি বলেছেন, এগুলো কোনো সাহায্য নয়, এগুলো ব্যবসার চুক্তি, যা দুই দেশেই কাজের সুযোগ বাড়াবে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে পারবে।
প্রকৃত সত্য: জ্বি না। এগুলো আসলে সাহায্যই। আমেরিকাকে তার বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করতে বাংলাদেশকে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন আপনারা। এতে আমেরিকায় কাজের সুযোগ বাড়তে পারে। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশে কৃষি, পোল্ট্রি, মৎস্য, ওষুধ খাতে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। এবং এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ মোটেও কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে পারবে না। আপনাদের চাপানো অনায্য বাড়তি ট্যারিফটা বাংলাদেশকে দিতে হবে, যেটা আগে দিতে হত না।
ভুল তথ্য-১৪. যখন চুক্তি মানা হয়, তখন বিনিয়োগ আসে। আর যখন মানা হয় না, তখন বিনিয়োগকারীরা অন্য দেশে চলে যায়।
প্রকৃত সত্য: এই চুক্তি ছাড়াই বাংলাদেশে আপনাদের বিনিয়োগ কম না। বিশেষত গ্যাস খাতে। চুক্তি না মানলে আপনাদের শেভরণ চলে যাবে বাংলাদেশ ছেড়ে? আলহামদুলিল্লাহ! কিন্তু আসলে এমনটা যে হবে না সেটা আপনারাও জানেন।
ভুল তথ্য-১৫. চুক্তির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে রাষ্ট্রদূত আরও বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন পূর্বানুমানযোগ্যতা। তাদের জানতে হবে, আজ যে নিয়ম আছে, কালও সেই একই নিয়ম থাকবে। তারা যেন অন্যায্য করের চাপ বা পুঁজি ও তথ্য (ডেটা) চলাচলে বাধার মুখে না পড়ে। অর্থাৎ তিনি বোঝাচ্ছেন যে বাংলাদেশ এই চুক্তি কার্যকর করলে এই পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি হবে।
প্রকৃত সত্য: আজ যে নিয়ম আছে কালও সেই একই নিয়ম থাকবে এই জিনিসটাকে সর্বপ্রথম নষ্ট তো ডোনাল্ড ট্রাম্প তথা আপনারাই করলেন। যা খুশি তাই ট্যারিফ বসানো শুরু করে সকল প্রকার পূর্বানুমানযোগ্যতা আপনারাই তো নষ্ট করলেন! অনায্য করের চাপ তো আসলে আপনারাই দিচ্ছেন। আর আমাদেরকে নসিহত করতে আসছেন কর কমাতে? আর তথ্য চলাচলে বাধা এই দুনিয়ায় আপনাদের চেয়ে বেশি আর কারা দেয়? জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কথা ভুলে গেলেন? আপনারা যেটা চান সেটা হল আমাদের তথ্য হাতানো, আর কিছু না।
ভুল তথ্য-১৬. রাষ্ট্রদূত বলেছেন, কিছু ব্যবসায়িক পদ্ধতি—যেমন অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া—বড় আকারের আমেরিকান বিনিয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
প্রকৃত সত্য: আমেরিকান বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত প্রিয় হল অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া। বিশ্বের দেশে দেশে এর উদাহরণ অসংখ্য। সর্বশেষ এই চুক্তিও তো আপনারা করেছেন বাংলাদেশের মানুষকে কোন কিছু জানতে না দিয়ে এক চূড়ান্ত অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে। আর এখন আসছেন স্বচ্ছতার গল্প শোনাতে?
ভুল তথ্য-১৭. রাষ্ট্রদূত বলেছেন, প্রথমত, আমরা (আমেরিকা) স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতায় বিশ্বাস করি।
প্রকৃত সত্য: আপনারা চূড়ান্ত অস্বচ্ছতা ও অনায্যতায় বিশ্বাস করেন। এপস্টেইন ফাইল থেকে ফিলিস্তিন এবং ইরান এর সর্বশেষ উদাহরণ।
ভুল তথ্য-১৮. আমেরিকান কোম্পানিগুলো আইনের শাসনের অধীন কাজ করে।
প্রকৃত সত্য: আমেরিকান কোম্পানিগুলো বিশ্বের দেশে দেশে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আইনকে পাশ কাটিয়েই কাজ করে। উদাহরণের অভাব নাই।
ভুল তথ্য-১৯. আমরা এমন অংশীদারত্ব দিই, যা পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আমরা এমন অংশীদারি দিই, যা কোনো আড়াল-আবডাল চুক্তি নয়।
প্রকৃত সত্য: আপনারা এমন অংশীদারত্ব দেন যা কেবল এবং কেবল আপনাদের লাভের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। আর কি বললেন? আড়াল-আবডাল চুক্তি নয়? নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট দিয়া চুক্তি প্রকাশ আটকাইয়া রাখছিলেন কেন তাহলে আলাপ চালানোর সময়?
ভুল তথ্য-২০. তিনি বলেছেন, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি থেকে ডিজিটাল অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সব ক্ষেত্রেই আমেরিকান কোম্পানিগুলো বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে।
প্রকৃত সত্য: উৎপাদন প্রযুক্তিতে এখন বিশ্বে শীর্ষে আছে চীন, পরিচ্ছন্ন জালানি উৎপাদনেও তারা শীর্ষে, তবে ব্যবহারে শীর্ষে ইউরোপীয় কিছু দেশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এত দ্রুত পরিবর্তনশীল একটা খাত যে এখানে কে শীর্ষে সেটা বলা কঠিন। তবে এক্ষেত্রেও চীন সমানে সমান টক্কর দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকার সাথে। ফলে যে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার শীর্ষে থাকার ফুটানি রাষ্ট্রদূত করলেন সেটাও মিথ্যা।
ভুল তথ্য-২১. রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই এত শক্তিশালী ছিল না এবং আমাদের সামনে সুযোগও কখনো এত বড় ছিল না।
প্রকৃত সত্য: আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনোই এতটা দাসসুলভ ছিল না। এবং ‘আমাদের’ সামনে না, আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কখনো এত বড় সুযোগ ছিল না।
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ : গবেষক ও লেখক
সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এবং সর্বজনকথা
মন্তব্য করুন

