আফ্রিকায় আবারো ফিরেছে প্রাণঘাতী ভাইরাস ইবোলা
আকলিমা ফেরদৌস লিসা
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
কঙ্গো ইয়াম্বুকু মিশন হাসপাতালের ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের ঘটনা— ৪২ বছর বয়সী এক স্কুল শিক্ষক জ্বরসহ কিছু উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হন। ভর্তির চতুর্থ দিন তাঁর প্রচণ্ড জ্বর ও ঠাণ্ডা লাগার লক্ষণ দেখা দেয়। তিনি হাসপাতালে ম্যালারিয়া রোগের চিকিৎসা নিলে জ্বর কমে যায়। কিন্তু এক সপ্তাহ পর তাঁর অবস্থা আরও খারাপ হয় এবং ভয়াবহ মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা ও নাক-মুখ দিয়ে রক্তপাতের মতো লক্ষণ দেখা দেয় এবং তিনি মারা যান।জানা যায়, ওই শিক্ষক ভ্রমণে গিয়ে বন্য প্রাণীর মাংস খেয়েছিলেন।
শিক্ষকের মৃত্যুর পর হাসপাতালে আসা অন্যান্য রোগীদেরও একই রকম উপসর্গ দেখা দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই হাসপাতালটিতে কর্মরত অনেক নার্স ও স্থানীয় মানুষ মারা যেতে শুরু করে। তখন কঙ্গোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত দল সেখানে পাঠানো হয়। ওই দলের সংগ্রহ করা রক্ত ও টিস্যুর নমুনা বেলজিয়ামের এন্টওয়ার্পে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনে পাঠানো হয়।
সেখানে কর্মরত তরুণ অণুজীববিজ্ঞানী পিটার পিওট এবং তাঁর সহকর্মীরা নমুনাগুলো পরীক্ষা করে দেখেন, নমুনায় নতুন এক ধরণের ভাইরাস, যা অন্য পরিচিত ভাইরাস থেকে আলাদা। তারা সেটিকে একটি নতুন ও মারাত্মক ভাইরাস হিসেবে শনাক্ত করেন।
আর হাসপাতালে ভাইরাসটি ছড়িয়ে যাওয়ার মূলে ছিল সেই শিক্ষকের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সূচ ও সিরিঞ্জ অন্য রোগীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা। সে সময় হাসপাতালে মাত্র ৫টি সূচ ও সিরিঞ্জ ছিল, যা ঠিকমতো জীবাণুনাশক ছাড়াই বারবার বিভিন্ন রোগীর শরীরে ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে একজন ইবোলা আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত সিরিঞ্জের মাধ্যমে সুস্থ রোগীরাও এই মারাত্মক ভাইরাসে সংক্রমিত হতে থাকেন।
ইবোলা কী
সম্প্রতি কঙ্গোতে নতুন করে ইবোলা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। আফ্রিকার জঙ্গলের গভীরতা থেকে উঠে আসা অদৃশ্য এই আতঙ্ক কয়েক দশক ধরে মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে। প্রতিবারই যখন আফ্রিকার কোনো অঞ্চলে ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন শুধু আক্রান্ত দেশ নয়, পুরো বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এই ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী, দ্রুত ছড়াতে সক্ষম এবং বহু ক্ষেত্রেই এর সংক্রমণ মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
এটি মূলত ‘ইবোলা ভাইরাস ডিজিজ’ বা ইভিডি নামে পরিচিত। ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করার পর রক্ত, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভয়াবহভাবে আক্রমণ করে। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ দেখা দেয়।
ইবোলায় মৃত্যুহার এতো বেশি যে, একে মূতিমান যমদূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রাদুর্ভাব এলাকায় ইবোলায় আক্রান্তদের মৃত্যুহার ২৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে গড়ে প্রায় অর্ধেক আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যান।
ইবোলা সাধারণ ফ্লু বা করোনা ভাইরাসের মতো সহজে বাতাসে ছড়ায় না। কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল অন্যদের সংস্পর্শে এলে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণেই পরিবার, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকর্মী ও দাফনকারীদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
নদীর নামে ভাইরাসের নাম
১৯৭৬ সালে প্রথমবারের মতো এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। একই সময়ে আফ্রিকার দুটি দেশে রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর একটি কঙ্গো, সেই সময় যেটি জাইর নামে পরিচিত ছিল আর অন্যটি সুদান।
কঙ্গোর যে এলাকায় প্রথম ভয়াবহ সংক্রমণ দেখা দেয়, তার কাছ দিয়ে বয়ে গেছে ‘ইবোলা’ নামে একটি নদী। সেই নদীর নাম অনুসারেই ভাইরাসটির নাম রাখা হয় ‘ইবোলা’।
বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। বাদুড়ের শরীরে ভাইরাসটি দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। পরে এটি বনাঞ্চলের অন্যান্য প্রাণী যেমন বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জি বা হরিণ জাতীয় প্রাণীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এসব প্রাণী শিকার, জবাই বা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করে থাকে।
কীভাবে মানুষের মধ্যে ছড়ায়
ইবোলা খুবই সংক্রামক, তবে এটি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সাধারণভাবে বাতাসে ছড়ায় না। মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, ঘাম, বমি, লালা, প্রস্রাব, মল বা বীর্যের সংস্পর্শে এলে অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা অসুস্থ রোগীর সেবা করতে গিয়ে আক্রান্ত হন। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরাও ঝুঁকিতে থাকেন, বিশেষ করে যদি সুরক্ষা পোশাক বা স্বাস্থ্যবিধি ঠিকভাবে অনুসরণ না করা হয়।
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত ব্যক্তিকে গোসল করানো, ছোঁয়া বা ধর্মীয় আচার অনুযায়ী দাফনের আগে শরীর স্পর্শ করার রীতি রয়েছে। ইবোলায় মৃত হয়েছে এমন মানুষের শরীরে ভাইরাসটি দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকে। ফলে দাফন কার্যক্রম থেকেও ব্যাপক সংক্রমণ ঘটার তথ্য রয়েছে।
ইবোলার লক্ষণ ও উপসর্গ
ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে সাধারণত এর উপসর্গগুলো দেখা দেয়। শুরুতে এটি সাধারণ জ্বর বা ভাইরাস সংক্রমণের মতো মনে হয়। রোগী হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন; সঙ্গে দুর্বলতা, পেশীতে ব্যথা, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা দেখা দেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগটি আরও জটিল হতে থাকে। রোগীর বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দেয়। কিডনি ও লিভারের কর্মক্ষমতা কমে যায়। আরও অবনতী হলে রোগীর শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণও হতে দেখা যায়। সাধারণত মুখ, নাক, চোখ কিংবা মলদ্বার দিয়ে রক্ত বের হয়ে থাকে। ইবোলা আক্রান্ত রোগীরা পানিশূন্যতায় ভোগেন এবং দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েন। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু প্রায় অনিবার্য।
বিশ্বের ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাব
ইবোলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায়। গিনি থেকে শুরু হয়ে দ্রুততম সময়ে লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে নাইজেরিয়া, মালি, সেনেগাল এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও কিছু আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ওই প্রাদুর্ভাবে প্রায় ২৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট।
সেই সময় লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ে ছিল। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতোটাই বেড়ে যায় যে, তাদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক চিকিৎসক ও নার্স ইবোলায় সংক্রমিত হয়ে মারা যান। বহু শিশু এতিম হয়। দেশের অর্থনীতি হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্কুল-কলেজ। সংক্রমন ঠেকাতে অনেক দেশ সীমান্তও বন্ধ করে দেয়। এই প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে বুঝিয়ে দেয়, একটি ভাইরাস কীভাবে কয়েকটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশ থেকে আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
বারবার কেন কঙ্গোতে ফিরে আসে ইবোলা
কঙ্গোতে বারবার ইবোলার প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হলো দেশটির বিশাল বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেখানে অনেক মানুষ বন্য প্রাণী শিকার করেন খান। এতে ভাইরাসটি প্রাণীর দেহ থেকে সহজেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
এ ছাড়া কঙ্গোর অনেক অঞ্চল দুর্গম এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো দুর্বল। দীর্ঘদিনের সংঘাত, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বর্তমানে ইতুরি প্রদেশে যে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেখানে বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এটি ইবোলার তুলনামূলক ভাবে বিরল একটি ধরন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এই ভাইরাসের জন্য এখনো কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। ফলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে পরেছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোয় ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই, ছবি: সংগৃহীতইবোলার বিভিন্ন ধরন
এখন পর্যন্ত ইবোলা ভাইরাসের বেশ কয়েকটি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জায়ার, সুদান, বুন্ডিবুগিও, তাই ফরেস্ট এবং রেস্টন উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি অত্যন্ত প্রাণঘাতী। জায়ার প্রজাতির ভাইরাস সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালের পশ্চিম আফ্রিকার মহামারির জন্যও এই প্রজাতি দায়ী ছিল। অন্যদিকে রেস্টন প্রজাতি মূলত প্রাণীদের মধ্যে দেখা যায় এবং এখন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করেনি। বুন্ডিবুগিও প্রজাতির ভাইরাস তুলনামূলক কম পরিচিত হলেও এটি মানুষের জন্য বিপজ্জনক। সাম্প্রতিক কঙ্গো প্রাদুর্ভাব এই ভাইরাসের কারণেই হয়েছে।
চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন
দীর্ঘদিন ইবোলার কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা ছিল না। রোগীদের মূলত সাপোর্টিভ কেয়ার দেওয়া হতো। অর্থাৎ শরীরে তরল সরবরাহ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন দেওয়া এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা করা হতো।
২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো ইবোলার একটি ভ্যাকসিন অনুমোদন পায়। এটি জায়ার প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর। পরে আরও কিছু ওষুধও তৈরি হয়েছে, যা মৃত্যুহার কমাতে সাহায্য করে।ত বে সব ধরনের ইবোলা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন এখনো উদ্ভাবন হয় নাই। বিশেষ করে বর্তমান বুন্ডিবুগিও প্রজাতির জন্য অনুমোদিত ভ্যাকসিন না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।
কেন বিশ্ব এত উদ্বিগ্ন
ইবোলার মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বিশ্ব সবসময় এই ভাইরাসকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। এর পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ও বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করে—
প্রথমত, আফ্রিকার সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে মানুষের চলাচল অনেক বেশি। ফলে দ্রুত অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। বর্তমানে কঙ্গো থেকে উগান্ডায় সংক্রমণ পৌঁছানোর ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই বাড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ইবোলার উপসর্গ শুরুতে সাধারণ জ্বরের মতো হওয়ায় দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন।
তৃতীয়ত, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও দারিদ্র্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। অনেক এলাকায় মানুষ চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে ভয় পান বা কুসংস্কারের কারণে রোগ লুকিয়ে রাখেন।
চতুর্থত, বৈশ্বিক ভ্রমণের যুগে কোনো সংক্রামক রোগ খুব দ্রুত মহাদেশ পেরিয়ে যেতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে এ বাস্তবতা আরও স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে।
মানুষের করণীয় ও সতর্কতা
ইবোলা প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায় হলো সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। আক্রান্ত ব্যক্তি বা সন্দেহভাজন রোগীর শরীরের তরল পদার্থ থেকে দূরে থাকতে হবে। রোগীর সেবার সময় গ্লাভস, মাস্ক ও সুরক্ষা পোশাক ব্যবহার জরুরি। বন্য প্রাণীর মাংস খাওয়া বা অপরিষ্কারভাবে জবাই করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই বন অধ্যুষিত অঞ্চলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা করে চিকিৎসা দিতে হবে। সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। নিরাপদ দাফন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং দ্রুত পরীক্ষা ব্যবস্থাও অত্যন্ত জরুরি।
ইবোলা ও সামাজিক আতঙ্ক
ইবোলা শুধু রোগ নয়, এটি একই সঙ্গে সামাজিক আতঙ্কও তৈরি করে। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার সমাজে বৈষম্যের শিকার হন। মানুষ ভয়ে রোগীকে এড়িয়ে চলেন। ফলে আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে দেরি করেন।
আবার গুজব ও ভুল তথ্যও বড় সমস্যা তৈরি করে। কোনো কোনো এলাকায় মানুষ বিশ্বাস করে, বিদেশিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভাইরাস ছড়াচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। জনসচেতনতা, সঠিক তথ্য প্রচার এবং স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইবোলা কি বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নিতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহাদেশীয় মহামারি আকারে ইবোলা দেখা দিলেও কোভিড-১৯ এর মতো সহজে বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। কারণ এটি বাতাসে সহজে ছড়ায় না এবং আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, ফলে দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
তবুও এটি ভয়ংকর। কারণ একবার কোনো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে খুব দ্রুত বহু মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। আর বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে হলে তো কথাই নেই। তবে, আমাদের জন্য কিছুটা ভালো অবস্থান এই জন্য যে, বাংলাদেশ এবং মধ্য-পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি ও নিয়মিত বড় কোনো ফ্লাইট বা যোগাযোগ নেই। ফলে রোগটি বাহক মারফত খুব সহজে এ দেশে প্রবেশ করার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু তারপরও বর্তমান কঙ্গো প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে নতুন করে সতর্ক করেছে। ভাইরাসটি যদি আরও বেশি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বা নতুন কোনো রূপ নেয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ
ইবোলা মোকাবিলায় বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত শনাক্তকরণ, গবেষণা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা। আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে পর্যাপ্ত হাসপাতাল, পরীক্ষাগার বা প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নেই।
নতুন ভ্যাকসিন ও ওষুধ উদ্ভাবনও জরুরি। কারণ ইবোলার সব প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং মানুষের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে প্রবেশ ভবিষ্যতে নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর দূরত্ব কমে যাওয়ায় নতুন নতুন ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। তাই ইবোলাকে শুধু একটি দেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই পারে ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় ঠেকাতে।
মন্তব্য করুন

