কী আছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভাগ্যে?
সাঈদ আহমেদ
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১২:২৮ এএম
ঝালকাঠির রাজাপুর গ্রামের ১৬ বছরের কিশোর লিমনের কথা মনে থাকার কথা অনেকেরই। ২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে র্যাবের একটি টহল দল লিমনের পথ আটকায়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে র্যাব সদস্য লুৎফর রহমান লিমনের পায়ে গুলি করে। পরে র্যাব লিমনকে আহত অবস্থায় আটক করে। সময়মতো চিকিৎসা না হওয়ায় লিমনের গুলিবিদ্ধ পা পরে কেটে ফেলতে হয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন লিমনের পক্ষে দাঁড়ায়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও লিমনের পাশে দাঁড়ায়। মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান লিমনের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তার পাশে থাকার ঘোষণা দেন।
র্যাবের গুলিতে পা হারানো লিমনএরপর শুরু হয় লিমন হোসেনের এক ক্লান্তিকর দীর্ঘ লড়াই। লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। র্যাবও পাল্টা একটি মামলা করে লিমন ও অন্য সাতজনের বিরুদ্ধে। তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে চিহ্নিত করে মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, তারা অস্ত্র নিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা করেছিল। এদিকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য লিমনের মাকে বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া হয়। র্যাবের এক সোর্স ইব্রাহিম হাওলাদার তার ওপর হামলাও করে।
ঘটনার প্রায় দু’বছর পর লিমনের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা মামলার বিচার শুরু হয়। সেটাও ছিল যেন লিমনের মা র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করেন, তার জন্য চাপ সৃষ্টির কৌশল। এদিকে র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে লিমনের মায়ের করা অভিযোগের তদন্তের নামে চলে টালবাহানা। র্যাবের তৎকালীন ডিজি বলেন, ‘লিমন’ নামের আরেক সন্ত্রাসী ভেবে ভুলবশত লিমনকে গুলি করা হয়েছে। অন্যদিকে একই সময় পুলিশের তদন্তে র্যাব সদস্যদের পুরোপুরি দায়মুক্তি দেওয়া হয়। র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে করা মামলাও থেমে যায়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন লিমনের লড়াইয়ে সবসময় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও র্যাব সদস্যদের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা কিছুই করতে পারেনি। একটা পর্যায়ে ড. মিজানুর রহমান লিমনের পরিবারকে আপস করার পরামর্শ দেন এবং তিনি এ বিষয়ে সহযোগিতারও আশ্বাস দেন। অবশেষে ঘটনার প্রায় আড়াই বছর পর, ২০১৪ সালের অক্টোবরে আদালত লিমন হোসেনের বিরুদ্ধে করা মামলা খারিজ করে দেয়।
ড. মিজান এটাকেই মানবাধিকার কমিশনের বড় সাফল্য হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন, যেহেতু আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষমতা মানবাধিকার কমিশনকে দেওয়া হয়নি, তাই এর বেশি কিছু তারা করতে পারেননি। তিনি এক্ষেত্রে যে আইনের কথা বলেন, সেটি হচ্ছে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন; যার ১৮ ধারা অনুযায়ী, শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশনের ম্যান্ডেট সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ায় সীমাবদ্ধ।
২০০৯ সালের আইন বাতিল করে অন্তবর্তী সরকারের অধ্যাদেশ
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার তাদের মেয়াদের প্রায় শেষ দিকে এসে ২০০৯ সালের আইনটি বাতিল করে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে সেটি সংসদে পাশ করেনি। ফলে ২০০৯ সালের আইনটির প্রত্যাবর্তণ ঘটে। আইনমন্ত্রী বলেন, এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ, যেন কোনো শূন্যতা তৈরি না হয়। তারা আরও ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা করে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করবেন। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজ ১৭ মে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি অংশীজন সভা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কমিশন সদস্যদের পদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রহিত হয়ে যায়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ইতিহাস
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডায় কখনোই ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সঙ্গে ছিল কিছু উন্নয়ন সহযোগীর সমর্থন। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে এবং একটি মানবাধিকার কমিশন গঠনও করে। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার আগের অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের অধীনে মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয় ২০১০ সালে। এতে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। তার ব্যক্তিগত পরিচিতি, মিডিয়ায় উপস্থিতি ও সরকারের আনুকূল্য—সব মিলিয়ে এর আগের স্বল্পকালীন মানবাধিকার কমিশন মানুষের স্মৃতি থেকে বিলীন হয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ মানুষের মনে মানবাধিকার কমিশনের সূচনার যে স্মৃতি, তা ২০০৯ সালের আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত ড. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ঘিরেই।
অধ্যাপক মিজানুর রহমান দুই দফায় মোট ছয় বছর চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর তার কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য, সাবেক আমলা রিয়াজুল হক চেয়ারম্যান হন। তারপর থেকে চেয়ারম্যানের পদটি স্থায়ীভাবে আমলাদের দখলে চলে যায়। মানবাধিকার কমিশন হয়ে পড়ে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের অবসরকালীন ঠিকানা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সর্বশেষ চেয়ারম্যান কামালউদ্দিন আহমেদ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব। মানবাধিকার কমিশনের চিঠির জবাব না দেওয়া, তাদের সুপারিশের তোয়াক্কা না করার ক্ষেত্রে শীর্ষে ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিবকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার কেমন মানবাধিকার কমিশন দেখতে চায়, সেটার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
২০০৯ সালের আইনের সীমাবদ্ধতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ
২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে অনেক মৌলিক ও গুরুতর সীমাবদ্ধতা আছে। এ নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং জাতিসংঘের তরফ থেকে আপত্তি জানানো হয়; সুপারিশও প্রদান করা হয়। প্রধান কয়েকটি দুর্বলতা হলো—
প্রথমত, বাছাই কমিটি। ২০০৯ সালের আইনে স্পিকারের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন— আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইন কমিশনের চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সদস্য। অর্থাৎ সাত সদস্যের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অন্যরাও সরকারের পছন্দে নিযুক্ত।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাছাই কমিটিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমিয়ে আনে। আট সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয় প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারককে। সদস্য করা হয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি ও বিরোধী দল থেকে একজন করে সংসদ সদস্য, একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি, একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং একজন আদিবাসী প্রতিনিধি। নাগরিক প্রতিনিধি ও আদিবাসী প্রতিনিধি মনোনয়নের এখতিয়ার দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রচলিত কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি নিজেই যখন দলীয় ব্যক্তি, তখন কতটা দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিকে তিনি মনোনয়ন দেবেন বা দিতে পারবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহ থেকেই যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে যখন এই অধ্যাদেশের প্রথম গেজেট প্রকাশ করে, তখন মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বাছাই কমিটিতে রাখা হয়নি। এক মাসের কম সময়ের মধ্যে আরেকটি সংশোধনী এনে তাকে বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
২০০৯ সালের আইনের দ্বিতীয় দুর্বলতা ছিল কমিশনের ক্ষমতা। শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা কমিশনের ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে এ ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং বলা হয়, অনুসন্ধান বা তদন্ত শেষে কমিশন শাস্তির পরিমাণ, ক্ষতিপূরণ বা প্রশাসনিক আদেশ এবং দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারবে।
২০০৯ সালের আইনের তৃতীয় বড় সীমাবদ্ধতা ছিল কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা। কমিশনের বাজেট ছিল আইন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এবং তা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাদের পূর্বানুমতির প্রয়োজন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়ানো হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সমস্যা
২০০৯ সালের আইনের এমন দুর্বলতার কারণেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ফোরাম— গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস (GANHRI) বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কখনোই ‘A’ স্ট্যাটাস দেয়নি। কমিশন প্রথম ২০১১ সালে আবেদন করে ‘B’ স্ট্যাটাস পায়। পরে ২০২১ সালে ‘A’ স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য পুনরায় আবেদন করলেও তাদেরকে ‘B’ স্ট্যাটাসেই রাখা হয়। ‘A’ স্ট্যাটাস না থাকলে জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে।
২০০৯ সালের আইনের দুর্বলতা বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে এসব সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর করে। কিন্তু একটি স্বাধীন, শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠনের ব্যাপারে তাদের সদিচ্ছাও প্রশ্নাতীত ছিল না। ২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ওই বছরের ৭ নভেম্বর পূর্ববর্তী কমিশনের সব সদস্য পদত্যাগ করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সুযোগ ছিল ব্যাপকভিত্তিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ২০০৯ সালের আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার। কিন্তু সেটা না করে তারা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সামান্য একটি সংশোধনী আনে, যার মাধ্যমে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে বাছাই কমিটির অন্য কোনো সদস্যের সভাপতিত্ব করার সুযোগ তৈরি করা হয়। এটা দেখে মনে হচ্ছিল— অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৯ সালের আইন রেখেই নতুন কমিশনারদের নিয়োগ দিতে চায়। এরপর প্রায় এক বছর এ বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ক্ষমতা ছাড়ার অল্প কিছুদিন আগে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং এর পরের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে তাতে সংশোধনী এনে বাছাই কমিটিতে আমলাতন্ত্রের প্রভাব জোরদার করা হয়। কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতাও সংকুচিত করা হয়। পরের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নতুন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়। যে পাঁচজন কমিশনারকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাদের সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো না কোনো সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন। চেয়ারম্যানসহ তিনজন ছিলেন গুম কমিশনের সদস্য। দীর্ঘদিন চুপচাপ থেকে ক্ষমতা ছাড়ার অল্প কিছুদিন আগে কমিশন সদস্যদের নিয়োগ দেওয়াটা ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত।
একটি শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে রাজনৈতিক সরকারগুলো তো বটেই, অন্তর্বর্তী সরকারও তাদের সন্দেহাতীত সদিচ্ছা দেখাতে পারেনি। এখন দেখার বিষয় বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের আইনের দুর্বলতাগুলো দূর করতে সত্যিই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা!
মন্তব্য করুন

