Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

বয়াতি গানের সাধক ঠেটা মালেক

বয়াতি গানের সাধক ঠেটা মালেক

ফিচার

মানুষের মুখ

বয়াতি গানের সাধক ঠেটা মালেক

Icon

ইমরান উজ-জামান

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

আমার গুরু কি জাদু জানে গো,

আপনার জন্য কান্দে ভক্তের প্রাণ…

গুরু-শিষ্যের এমন দরদি টান বোধহয় বাউল-সাধকদের জীবনেই সবচেয়ে গভীরভাবে ধরা পড়ে। অনাদিকালের পরম্পরায় গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক লোকসংগীতের জগতে এক অনন্য ঐতিহ্য। পালা কিংবা বিচ্ছেদ গানে সেই টান বারবার ফিরে আসে।

বাংলার লোকসংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো বয়াতি গান। ‘বয়াতি’ শব্দটি এসেছে ‘বয়ান’ বা কাহিনি বলার ধারণা থেকে। মূলত যেসব লোকশিল্পী গান, কাব্য, পালা কিংবা আখ্যানের মাধ্যমে মানুষের জীবন, প্রেম, ধর্ম, সমাজ, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার কথা তুলে ধরেন, তাদের বলা হয় বয়াতি।

বয়াতি গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি গ্রামীণ সমাজের জীবনবোধ, দর্শন ও সংস্কৃতিরও এক জীবন্ত দলিল। এসব গানে উঠে আসে প্রেম-বিরহ, মানবতা, ধর্মীয় ভাবনা, সামাজিক অসঙ্গতি, লোককথা ও আধ্যাত্মিক সাধনার নানা দিক। বিশেষ করে বিচ্ছেদ গান, পালাগান ও সাধনভিত্তিক সংগীতে বয়াতিদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে বয়াতি গানের বিশেষ চর্চা রয়েছে। হারমোনিয়াম, ঢোল, খঞ্জনি, করতাল কিংবা দোতারার সুরে পরিবেশিত এই গান শ্রোতাদের আবেগ ও চিন্তার গভীরে স্পর্শ করে।

লোকসংস্কৃতির এই ধারার শিল্পীরা সাধারণত গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বেড়ে ওঠেন। তাদের গান কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়; গ্রামীণ মেলা, ওরস, আখড়া ও সাধুসঙ্গেও বয়াতি গানের আসর বসে। আধুনিক সময়েও বয়াতি গান বাংলার মাটির ঘ্রাণ আর মানুষের অন্তর্গত বেদনার এক অনন্য প্রকাশ হিসেবে টিকে আছে।

লোকসংস্কৃতি নিয়ে যারা চর্চা করেন তারা জানেন, ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে বিচ্ছেদ গানের জগতে মালেক সরকারের নাম উচ্চারিত হয় বিশেষ সম্মানের সঙ্গে। তবে তাকে শুধু ‘মালেক’ বললে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ এই সময়ে আরও কয়েকজন মালেক বায়াতি গান করেন। তাই তার নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে এক আলাদা পরিচয়— ‘ঠেটা মালেক’। মা-বাবার দেওয়া নাম মালেক সরকার সেটাও হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে।

ঠেটা মালেক মূলত তার গুরু জহু বয়াতি তথা কালাই বয়াতির গান গাইতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। গুরুর লেখা গানেই যেন তিনি খুঁজে পান সাধনার আসল রস।

ঝি নষ্ট ঘাটে আর পুরুষ নষ্ট হাটে,

অসৎ লোকের সঙ্গ করা ভালো নয়।

ছোটবেলা থেকেই মালেক সরকার সঙ্গত করতেন কালাই বয়াতির সঙ্গে। জহুরুল হক বয়াতি, যিনি ‘কালাই বয়াতি’ নামেই বেশি পরিচিত; ছিলেন ভারতের ফুলতলার আব্দুস শুক্কুর মালঙ্গ বাবার মুরিদ। একসময় তিনি সংসার ও সংগীতজগত— দুটো থেকেই অনেকটা বিবাগী হয়ে পড়েন। সেই কালাই বয়াতিরই ‘ঠেটা’ উপাধি আজও বহন করে চলেছেন তার শিষ্য মালেক সরকার।

 কালাই বয়াতি 

সারাদেশে ঠেটা মালেক বয়াতির পরিচিতি রয়েছে বিচ্ছেদ গানের শিল্পী হিসেবে। এখনো তিনি গান করেন। আস্তানা রাজধানী ঢাকার মিরপুরের, শাহ আলী মাজারের কাছেই। সেখানে রয়েছে গুরু-শিষ্যের দরবার। হারমোনিয়াম হাতে তিনি শিষ্যদের তালিম দেন বিচ্ছেদ গানের। ডাক পড়লে ছুটে যান দেশের নানা প্রান্তে, কখনো দেশের বাইরেও।

তাদের আধ্যাত্মিক ধারার অন্যতম পূজনীয় ব্যক্তি সোলেমান শাহ। ভারতের ফুলতলা, গাজীপুর, কুষ্টিয়া ও মুন্সীগঞ্জের ফুলতলা গ্রামে রয়েছে তার বন্দনাখানা।

ঠেটা মালেক নামের পেছনের গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। মুন্সীগঞ্জের পূর্বাঞ্চলের গায়ক জহুরুল হক বয়াতির গায়ের রং ছিল অত্যন্ত কালো। সেই কারণে মানুষ তাকে ডাকতে শুরু করে “কালাই” নামে। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন কালাই বয়াতি। সংসারবিমুখ এই গায়ক কখনো নিজ বাড়িতে, কখনো ভারতের ফুলতলায়, আবার কখনো কুষ্টিয়ায়— ঘুরে বেড়াতেন গানের টানে।

একবার কিংবদন্তি লোকসাধক আলাউদ্দিন বয়াতির সঙ্গে পালাগানের বাহাসে বসেন কালাই বয়াতি। একদিকে প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তি, অন্যদিকে প্রায় অচেনা এক পাগলাটে গায়ক। সেই পালা শুনতে জড়ো হয়েছিলেন দেশের নানা প্রান্তের বাউল, পালাকার ও লোকসংগীতপ্রেমীরা। সারারাত গান চললেও কেউ কাউকে হারাতে পারেননি।

ফজরের আজান হলে দর্শকেরা মসজিদের পথে হাঁটতে হাঁটতে বলতে থাকেন—‘কি ঠেটারে বাবা! সারাটা রাত এমন বাঘা গায়ক আলাউদ্দিন বয়াতিকে আটকে রাখলো!’

সেই থেকেই জহু বয়াতি বা কালাই বয়াতির নামের আগে যুক্ত হয় ‘ঠেটা’ শব্দটি। আর তারই উত্তরাধিকার বহন করছেন শিষ্য মালেক সরকার—ঠেটা মালেক বয়াতির শিষ্য ঠেটা মালেক।

পালাকার ঠেটা মালেক বিশেষভাবে পরিচিত তার বিচ্ছেদ গানের জন্য। তার কণ্ঠে বিচ্ছেদের বেদনা যেন হয়ে ওঠে লোকজ জীবনের গভীর আর্তি—

আজ কেনো বারে বার

মনে চায় দেখিবার।

মন চায় দেখি চাহিয়া,

ও প্রিয়া সাধ মিটে না দেখিয়া…

ঠেটা মালেকের কণ্ঠে বিচ্ছেদ গানের এই আর্তি এখনও গ্রাম বাংলার হাজার মানুষের প্রাণ আকুল করে, ভক্তকে ভাসিয়ে নেয় ভাবের জগতে। আমাদের শহুরে জীবনে যার দেখা মিলে না। 

মন্তব্য করুন

Logo