পুন্ড্রনগরের রাজার মেলা, যাকে স্থানীয়ভাবে মহাস্থান মেলাও বলা হয়
পুন্ড্রনগরের রাজার মেলা
ইমরান উজ-জামান
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১২:৪২ এএম
কয়েকজন প্রবীণের মুখে শুনলাম—চলেন, রাজার মেলায় যাই। সেই সূত্র ধরেই মনে হলো, একসময় এ মেলার পরিচিতি ছিল ‘রাজার মেলা’হিসেবে। কেউ কেউ আবার একে বলেন ‘শেষ বৈশাখের মেলা’। তবে মূলত এটি মহাস্থান মেলা নামেই বেশি পরিচিত। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বগুড়ার মহাস্থানে সুফি সাধক শাহ সুলতান বলখী (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা।
আজকের গল্প সেই মেলাকে ঘিরেই। যদিও বর্তমানের এই মেলাকে সরাসরি ‘রাজার মেলা’ বলা যায় না, তবু ইতিহাসবিদদের সূত্রে জানা যায়, মহাস্থানে একসময় রাজাকে ঘিরে মেলার প্রচলন ছিল। এখন অবশ্য অধিকাংশ মানুষ একে ‘শেষ বৈশাখ মেলা’ বলেই চেনে।
পুণ্ড্র প্রাচীর, ছবি: লেখকএই মেলাকে ‘কটকটির মেলা’ বললেও ভুল হবে না। মূল রাস্তা থেকে মাজারের সিঁড়ি পর্যন্ত সারি সারি দোকানে নানা রঙ আর স্বাদের কটকটির সমাহার। আশ্চর্যের বিষয়, চালের গুঁড়ায় তৈরি ঘিয়ে ভাজা কটকটির দাম মাত্র ১২০ টাকা কেজি।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানগড়ে, উঁচু টিলার মতো জায়গায় শাহ সুলতানের আস্তানাকে কেন্দ্র করে মেলা বসলেও এর বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়ে গড়ের বিভিন্ন অংশে—পাথরপট্টি, জিয়তকুন্ড, বুরহানের মাজার এলাকা, মানকালীর কুন্ড পর্যন্ত। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ পলিথিনের ছাউনি গেঁথে অস্থায়ী আস্তানা গড়ে তোলে।
পুরো এলাকাজুড়েই ছড়িয়ে আছে প্রত্নসম্পদের ছাপ। স্থানীয়ভাবে যাকে ‘রাজা পরশুরামের প্রাসাদ’ বলা হয়। লোককথা আছে, আফগানিস্তান থেকে আগত শাহ সুলতান বলখী (রহ.) এই পরশুরামকে পরাজিত করে মহাস্থানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। কাছেই রয়েছে গোকুল মেধ, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘বেহুলার বাসরঘর’ নামে পরিচিত।

মহাস্থান গড়ের গোকুল মেধ, ছবি: লেখক
রাজকীয় ইতিহাসের আবহ যেমন আছে, তেমনি মেলার জৌলুসও কম নয়। মাজারের বাইরে ভক্তদের জন্য বসা অস্থায়ী থান, দোকানপাট আর লোকসমাগমে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। মেলায় হুক্কার জমজমাট বেচাকেনা চোখে পড়ে। বগুড়ার মানুষ এখনো হুক্কা ব্যবহার করেন—পলাশবাড়ির আফসার আলীর অস্থায়ী দোকানের ভিড়ই তার প্রমাণ। হুক্কার সঙ্গে তামাকও বিক্রি করছেন তিনি। আরেক পাশে আবেদ আলীর কাঠের হেলিকপ্টার আর গরুর গাড়ির দোকানে শিশুদের ভিড়।
পাথরপট্টিতে বসেছে ভাবের আসর। সেখান থেকে ভেসে আসছিল গান—
জ্বলছে আগুন রে—
ও আমার,
জ্বলছে আগুন বুকের ভিতর
নিভাই আগুন কী দিয়া।
প্রাণের বান্ধব গিয়াছে হারাইয়া,
কেমন জানি লাগে রে—
মনরে আমার বান্ধবরে হারাইয়া…
ভাবের গান শুরুর আগে চলে ধূম্রসাধনা। তারপর শুরু হয় বৈঠকি আড্ডা আর গান। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ যেন মিলিত হয় এক ভিন্নতর লোকজ সংস্কৃতির আসরে।
মাজারসংলগ্ন দোকান থেকে ইতিহাস জানার আগ্রহে তিনটি বই কিনলাম। এর একটি— মহাস্থান গড়ের ইতিহাস ও সুলতান সাহেবের জীবনী, লেখক এম তবিবুর রহমান। বইটি পড়ে মনে হলো ইতিহাসের চেয়ে রূপকথার আবহই বেশি। পরে জানতে পারলাম, লেখক আর বেঁচে নেই। থাকলে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত। তিনি দাবি করেছেন, এখানে যে পরশুরামের কথা বলা হয়েছে, তিনিই মহাভারতের সেই পরশুরাম।

মেলায় মহাস্থান গড়ের নানা কাহিনি নিয়ে বই, ছবি: লেখক
কিন্তু এখানেই আমার মনে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, মহাভারতের সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব, আর শাহ সুলতান বলখী বাংলায় আসেন আনুমানিক একাদশ শতকে। ইতিহাসবিদ প্রভাষ চন্দ্র সেন তাঁর বগুড়ার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ১০৪৩ সালে (হিজরি ৪৩৯) আফগানিস্তান থেকে আগত সুফি শাহ সুলতান বলখী মহাস্থানের রাজা নরসিংহ বা পরশুরামকে যুদ্ধে পরাজিত করেন। কাজেই মহাস্থানের পরশুরাম আর মহাভারতের পরশুরাম একই ব্যক্তি নন বলেই মনে হয়।
দ্বিতীয়ত, গোকুল মেধকে “বেহুলার বাসরঘর” বলারও ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল। মধ্যযুগীয় পদ্মপুরাণ-এর পৌরাণিক চরিত্র বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনিতে বাসরঘর ছিল লোহার তৈরি। অথচ গোকুল মেধ স্পষ্টতই একটি বৌদ্ধ স্থাপত্য নিদর্শন। ধারণা করা হয়, এটি পাল আমলের নির্মাণ এবং একসময় গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ জ্ঞানকেন্দ্র ছিল।
ছবি: প্রাচীন ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ অঞ্চলে একসময় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও অভিযান পরিচালনা করেছিলেনতৃতীয়ত, ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়—প্রাচীন ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ অঞ্চলে একসময় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সেই সূত্র থেকেও এ অঞ্চলকে প্রাচীন পুন্ড্রনগর নির্দেশ করে।
মহাস্থানের মেলা তাই শুধু লোকজ উৎসব নয়; এটি ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর রহস্যের এক অনন্য মিলনমেলা।
ইমরান উজ-জামান, লোকসংস্কৃতি সংগ্রাহক, গবেষক
মন্তব্য করুন

