Logo

১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

×

Follow Us

লালমনিরহাটের এক তরুণের হাত ধরে গ্রামের পাঠাগার এখন সংস্কৃতি আর স্বপ্নের ঠিকানা

জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতিবিকাশের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’।

ফিচার

১০টি বই থেকে ১৫ হাজারের সংগ্রহ

লালমনিরহাটের এক তরুণের হাত ধরে গ্রামের পাঠাগার এখন সংস্কৃতি আর স্বপ্নের ঠিকানা

Icon

এস দিলীপ রায়, লালমনিরহাট

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার প্রত্যন্ত টিপার বাজার গ্রামে একসময় সন্ধ্যা মানেই ছিল নিস্তব্ধতা। দিনের কাজ শেষে মানুষ ঘরে ফিরত, চারপাশ ডুবে যেত অন্ধকারে। গ্রামের তরুণদের আড্ডা বলতে ছিল চায়ের দোকান কিংবা অলস সময় কাটানো। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের এক কোণে ভেসে আসে কবিতা আবৃত্তির শব্দ, কোথাও চলছে গানের চর্চা, আবার কোথাও তরুণদের বিতর্ক বা বই নিয়ে আলোচনা।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’। ছোট্ট একটি পাঠকক্ষ থেকে গড়ে ওঠা এই পাঠাগার এখন পুরো এলাকার সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জাগরণের প্রতীক। এই স্বপ্নযাত্রার নেপথ্যে রয়েছেন ২৩ বছর বয়সী তরুণ জামাল হোসেন। বর্তমানে ঢাকায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন তিনি। তবে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আর গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই ২০১৪ সালে, স্কুলজীবনেই তিনি গড়ে তোলেন পাঠাগারটি।

শুরুর গল্পটা ছিল খুব সাধারণ, অথচ স্বপ্নে ভরা। একটি টিনের ঘর, কয়েকটি পুরোনো চেয়ার-টেবিল আর মাত্র ১০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন জামাল ও তার কয়েকজন বন্ধু। তখন হয়তো কেউ ভাবতেও পারেনি, সেই ছোট্ট উদ্যোগ একদিন হাজারো মানুষের আশ্রয় হয়ে উঠবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আজ সেই সংগ্রহ ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে।



তবে জামালের স্বপ্ন শুধু পাঠাগারের চার দেয়ালে আটকে থাকেনি। ২০২০ সালে তিনি চালু করেন দেশের প্রথম ‘সেলুন লাইব্রেরি’ উদ্যোগ। গ্রামের নাপিতের দোকানে বই রেখে মানুষকে পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তোলার এই ব্যতিক্রমী ধারণা দ্রুতই সাড়া ফেলে। পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এই উদ্যোগ। জামালের বিশ্বাস, বই শুধু জ্ঞান দেয় না, মানুষকেও বদলে দেয়। তিনি বলেন, ‘বই মানুষকে অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়। আমি চাই, এই গ্রামের প্রতিটি ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় বই পড়ুক।’ তিনি জানান, সেলুন লাইব্রেরি নিয়ে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। নতুন বইয়ের চাহিদাও তৈরি হয়েছে ব্যাপকভাবে।

গ্রামে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততায় বিশেষ অবদান রাখায় গত বছর জামাল জাতীয় যুব পুরস্কার লাভ করেন। পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক সুনীল কুমার সূত্রধরের চোখে জামাল শুধু একজন তরুণ নন, তিনি একটি পরিবর্তনের নাম। তার ভাষায়, “জামাল এই প্রত্যন্ত গ্রামে জ্ঞানের আলো জ্বালানোর কাজ করছে। সে দেখিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছা থাকলে বই দিয়েও সমাজ বদলানো যায়।” সময়ের সঙ্গে পাঠাগারটির চেহারাও বদলে গেছে। একসময়কার ছোট টিনের ঘরের জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি সুসজ্জিত পাকা ভবন। সেখানে রয়েছে সারি সারি বইয়ের তাক, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা জায়গা।
এই ভবন নির্মাণে বড় অবদান রেখেছেন ঢাকার রবিন প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজ লিমিটেডের পরিচালক শাহীন হোসেন। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পড়ে তিনি এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের নির্মাণকাজের ৯০ শতাংশ অর্থ সহায়তা দেন। স্থানীয় প্রশাসনও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। শাহীন হোসেন বলেন, “আমরা চেয়েছি গ্রামের শিশুরাও শহরের শিশুদের মতো সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ পাক। কারণ, পড়াশোনা কুসংস্কার আর সামাজিক সংকীর্ণতা দূর করতে সাহায্য করে। প্রতিটি গ্রামেই একটি গণপাঠাগার থাকা উচিত।”

এখন পাঠাগারটি শুধু বই পড়ার জায়গা নয়; এটি হয়ে উঠেছে গ্রামের তরুণদের সৃজনশীল চর্চার কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক, পাঠচক্র ও সংগীতচর্চার আয়োজন হয়। পাশাপাশি তরুণদের কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কন ও সংগীতের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। কলেজ শিক্ষার্থী নিরাময় কুমার রায়ের মতে, পাঠাগারটি এখন শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, “এখানে আমরা শুধু বই পড়ি না, নিজেদের চিন্তা ও সৃজনশীলতাকেও বিকশিত করার সুযোগ পাই। বিতর্ক করি, গান শিখি, কম্পিউটার শিখি—সব মিলিয়ে এটি আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখাচ্ছে।” স্কুলছাত্রী আশা আক্তারও মনে করেন, পাঠাগারটি তরুণদের সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলছে। তার ভাষায়, “এই পাঠাগার আমাদের শুধু বই পড়তে শেখায় না, মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলছে।”



পাঠাগারটির সদস্য এখন কয়েকশ’। এখানে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কৃষক, গৃহিণী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আনাগোনা।
কৃষক আবদুল কাদের নিয়মিত কৃষিবিষয়ক বই পড়েন। তিনি বলেন, “বই পড়ে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারছি। এগুলো আমার কাজে অনেক উপকার করছে।” গৃহিণী সুলতানা বেগমও নিয়মিত বই বাসায় নিয়ে যান। তিনি বলেন, “শুরুর দিকে মনে হয়েছিল এসব করে কিছু হবে না। এখন বুঝতে পারছি, জামাল গ্রামের জন্য কত বড় কাজ করছে।”

এত স্বীকৃতি আর সাফল্যের পরও জামালের স্বপ্ন খুব সাধারণ—গ্রামের মানুষের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ছড়িয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, “শুরুর দিকে কেউ বিশ্বাস করেনি পাঠাগারটি টিকবে। এখন মানুষ আমাকে ‘বইপাগল জামাল’ বলে ডাকে।”
হেসে হেসেই তিনি জানান, এ নামেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। কারণ, তার স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি চান, টিপার বাজার ও আশপাশের গ্রামগুলো একদিন ‘পাঠক গ্রাম’-এ পরিণত হোক—যেখানে প্রতিটি বাড়িতে থাকবে বইয়ের তাক, আর প্রতিটি শিশুর হাতে থাকবে একটি বই।

মন্তব্য করুন

Logo